‘আমার চাকরানিদের পোশাকের জন্য সব সময় আমি নিজে শস্তা ছিট কিনে দিই’, যে প্রসঙ্গটা শুরু হয়েছিল তার জের টেনে বলছিলেন তিনি… ‘ফেনা তুলে ফেলার সময় হয়নি কি এখনো?’ আগাফিয়া মিখাইলোভনার উদ্দেশে বললেন তিনি, ‘নিজে তোর এ কাজ করা একেবারে বারণ, খুব গরম’, বললেন কিটিকে।
‘আমি করছি’, বলে ডল্লি উঠে দাঁড়ালেন এবং চিনির ফেনিল ভিয়ানে সাবধানে চামচ নাড়তে লাগলেন, চামচেতে লেগে যাওয়া গাদ ঝাড়ার জন্য ইতিমধ্যেই লাল রঙের সিরাপ চোয়ানো হলুদ-গোলাপি ফেনায় জমে-ওঠা একটা ডিশে চামচটা ঠুকছিলেন। নিজের ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে ভাবছিলেন, ‘চায়ের সাথে কি আহ্লাদেই না এটা ওরা খাবে!’ মনে পড়ল তিনি নিজে যখন শিশু ছিলেন তখন সবচেয়ে যেটা ভালো, সেই ফেনাটা বড়রা খায় না দেখে ভারি অবাক লাগল তাঁর।
সেইসাথে লোককে কিভাবে উপহার দেওয়া ভালো, এই চিত্তাকর্ষক প্রসঙ্গটা চালিয়ে ডল্লি বললেন, ‘স্তিভা বলে, টাকা দেওয়া অনেক ভালো, কিন্তু…’
‘টাকা কেন?’ সমস্বরে বলে উঠলেন প্রিন্স-মহিষী ও কিটি, ‘উপহারের কদর করে ওরা।’
‘যেমন আমি গত বছর আমাদের মাত্রেনা সেমিওনোভনার জন্য ঠিক পপলিনের নয়, তবে ঐ ধাঁচের কাপড় কিনে দিয়েছিলাম’, বললেন প্রিন্স-মহিষী।
‘মনে আছে, পোশাকটা সে পরেছিল আপনার জন্মদিনে।’
‘সুন্দর প্যাটার্ন; কি সহজ, অথচ সম্ভ্রান্ত। ওর না হলে আমি নিজেই নিজের জন্য একটা বানাতাম। ভারেঙ্কার ফ্রকের মত কিছু। দেখতে সুন্দর অথচ শস্তা।’
‘এখন মনে হচ্ছে তৈরি’, চামচ থেকে সিরাপ ফেলতে ফেলতে ডল্লি বললেন।
‘যখন গুটি বেঁধে যাবে, তখন। আরো একটা জ্বালে রাখুনে আগাফিয়া মিখাইলোভনা।’
‘জ্বালালে এই মাছিগুলো!’ রেগে বললেন আগফিয়া মিখাইলোভনা। ‘দাঁড়াবে ঐ একই’, যোগ দিলেন তিনি। ‘আহ্, কি সুন্দর, তাড়া দেবেন না ওকে’, রেলিঙের ওপর বসে বোঁটা উলটে র্যাম্পবেরি ঠোকরাচ্ছিল একটা চড়াই, সেটা দেখে হঠাৎ বলে উঠল কিটি।
‘হ্যাঁ, তবে তুই সরে আয় চুলার কাছ থেকে’, মা বললেন।
‘ভালো কথা ভারেঙ্কার ব্যাপারে’, কিটি ফরাসি ভাষায় বলল যা তাঁরা অনবরত বলছিলেন যাতে আগাফিয়া মিখাইলোভনা বুঝতে না পারেন। ‘জানেন মা, কেন জানি আজ একটা সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে বলে আমি আশা করছি। আপনি বুঝতে পারছেন কি। কি ভালোই না হয় তাহলে!’
‘ওস্তাদ ঘটকী বটে!’ ডল্লি বললেন, ‘কি সাবধানে আর কায়দা করে ও মেলাচ্ছে ওঁদের…
‘না, আপনি বলুন মা, আপনি কি ভাবছেন?’
‘ভাববার কি আছে? উনি’ (বলাই বাহুল্য উনি মানে সের্গেই ইভানোভিচ কজনিশেভ) সব সময়ই রাশিয়ায় সবচেয়ে কাম্য পাত্র হতে পারতেন; এখন অবশ্য বয়স হয়েছে, তাহলেও আমি জানি, এখনো অনেকেই ওকে বিয়ে করতে রাজি থাকবে… এ মেয়েটার দয়ামায়া আছে, কিন্তু উনি হয়ত,
‘না, আপনি বুঝে দেখুন মা, কেন ওঁদের দুজনের পক্ষেই এর চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না। প্রথমত, ভারেঙ্কা অপূর্ব মেয়ে! কিটি বলল তার একটা আঙুল গুটিয়ে
‘উনি যে ভারেঙ্কাকে খুবই পছন্দ করছেন, তা ঠিক’, সমর্থন করলেন ডল্লি।
‘তারপর, সমাজে ওঁর এমন প্রতিষ্ঠা যে বৌয়ের সম্পত্তি বা প্রতিষ্ঠা ওর কাছে একেবারে নিষ্প্রয়োজন। শুধু একটা জিনিস ওঁর দরকার—ভালো, শান্তশিষ্ট, মিষ্টি একটি স্ত্রী।
‘হ্যাঁ, ভারেঙ্কার সাথে উনি শান্তিতে থাকতে পারবেন’, সমর্থন করলেন ডল্লি
তৃতীয়ত দরকার স্ত্রী যেন তাকে ভালোবাসে। ভালো সে তো বাসে… বিয়েটা হলে কি ভালোই না হয়। …পথ চেয়ে আছি, ওঁরা যখন বন থেকে ফিরবেন, ঠিকঠাক হয়ে যাবে সব। ওঁদের চোখ দেখেই আমি বুঝে যাব। কি আনন্দই যে হত! তুমি কি মনে করো উল্লি
‘আরে, অস্থির হসনে। অস্থির হওয়া তোর এখন বারণ’, মা বললেন।
‘আমি অস্থির হচ্ছি না মা। আমার মনে হচ্ছে উনি আজ পাণিপ্রার্থনা করবেন।
‘কিভাবে আর কখন যে পুরুষেরা পাণিপ্রার্থনা করে সেটা ভারি অদ্ভুত… প্রথমে কেমন একটা বাধা থাকে, তারপর হঠাৎ তা ভেঙে পড়ে’, অব্লোন্স্কির সাথে তাঁর অতীতের সম্পর্ক স্মরণ করে চিন্তামগ্ন হাসি হেসে বললেন ডল্লি
হঠাৎ কিটি জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা মা, বাবা আপনার কাছে বিবাহ-প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিভাবে?’
‘বিশেষত্ব কিছু ছিল না, নিতান্ত সাধারণ ব্যাপার’, বললেন প্রিন্স-মহিষী, কিন্তু সে ব্যাপারটা মনে পড়ায় মুখ তাঁর জ্বলজ্বল করে উঠল।
‘ছিল না মানে? আপনার কাছে কথাটা পাড়তে দেওয়ার আগে ভালো তো বাসতেন?’
নারী জীবনের প্রধান এসব প্রশ্ন নিয়ে মায়ের সাথে সমানে কথা বলতে পারছে বলে খুবই একটা তৃপ্তি পাচ্ছিল কিটি।
‘ভালোবাসতাম বৈকি। ও এসেছিল আমাদের কাছে, গ্রামে।’
‘কিন্তু কি করে সব স্থির হয়ে গেল মা?’
‘তুই বুঝি ভাবিস তোরা নতুন কিছু-একটা ভেবে বার করেছিস? সবাই একই ব্যাপার : স্থির হয়ে গেল চো দিয়ে, হাসি দিয়ে।’
‘ভারি সত্যি কথা বলেছ মা! ঠিক ঐ চোখ আর হাসি দিয়েই’, সমর্থন কররেন ডল্লি।
‘কিন্তু কি কথা উনি বলেছিলেন?’
‘কস্তিয়া তোকে কি বলেছিল?’
‘সে লিখেছিল খড়ি দিয়ে। আশ্চর্য ব্যাপার!… আমার মনে হচ্ছে সে যেন কত দিন আগে!’ কিটি বলল। তিনজন নারী ভাবতে লাগলেন একই কথা। প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করল কিটি। তার মনে পড়ছিল বিয়ের আগের গোটা শীতকালটা আর ভ্রন্স্কির জন্য তার আকুলতা।
