ভারেঙ্কার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমাকেও সাথে নাও। ব্যাঙের ছাতা খুঁজতে বড় ভালোবাসি আমি। ওটা আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় একটা কাজ বলে মনে হয়।’
‘বেশ তো, খুব আনন্দের কথা’, ভারেঙ্কা বলল লাল হয়ে। কিটি আর ডল্লি অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করলেন। ইদানীং কিটি যে অনুমান নিয়ে খুব মেতে উঠেছিল, ভারেঙ্কার সাথে ব্যাঙের ছাতা তুলতে যাবার জন্য বিদ্বান বুদ্ধিমান কজ্নিশেভের প্রস্তাবে সমর্থিত হল সেটা। মায়ের সাথে সে তাড়াতাড়ি কথা শুরু করলে যাতে তার চাউনি চোখে না পড়ে। খাবার পর তাঁর কফির কাপ নিয়ে কজ্নিশেভ বসলেন ড্রয়িং-রুমের জানলার কাছে, ভাইয়ের সাথে যে আলাপটা শুরু করেছিলেন সেটা চালিয়ে যেতে যেতে তাকাচ্ছিলেন দরজার দিকে, যেখান দিয়ে ব্যাঙের ছাতা সংগ্রহে বেরোবে ছেলেমেয়েরা। ভাইয়ের কাছে জানালায় বসলেন লেভিন।
স্বামীর কাছে দাঁড়িয়ে ছিল কিটি, যে আলাপটা তার কাছে আকর্ষণহীন, স্পষ্টতই শেষ হবার পর স্বামীকে কিছু- একটা বলবার জন্য।
‘বিয়ের পর তুই অনেক বদলে গেছিস আর সেটা ভালোই’, কিটির দিকে চেয়ে হেসে এবং স্পষ্টতই শুরু করা কথাবার্তাটায় বিশেষ আগ্রহ না রেখে বললেন কজ্নিশেভ, ‘তবে অতি কিম্ভুত সব মতামত আঁকড়ে থাকার নেশা তোর যায়নি।’
‘কাতিয়া, দাঁড়িয়ে থাকা তোমার পক্ষে ভালো নয়’, তার দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে বললেন লেভিন।
‘তবে সময় হয়ে গেছে’, ছুটন্ত ছেলেমেয়েদের দেখে বললেন কজ্নিশেভ।
সবচেয়ে আগে তাঁর কাছে ছুটে এল টান-টান মোজা পায়ে পাশকে ভঙ্গিতে লাফাতে লাফাতে তানিয়া, ব্যাঙের ছাতা তোলার ঝুড়ি আর কজ্নিশেভের টুপি দোলাতে, দোলাতে।
অসংকোচে তাঁর কাছে গিয়ে, পিতার চমৎকার চোখজোড়ার মত তার দুটো চোখ জ্বলজ্বল করে সে সের্গেই ইভানোভিচকে তাঁর টুপি দিয়ে ভীরু ভীরু কোমল হাসিতে তার ঔদ্ধত্য নরম করে এনে বেশ বুঝিয়ে দিলে যে টুপিটা সে তাঁকে পরাতে চায়।
সের্গেই ইভানোভিচের হাসি দেখে সে বুঝলে যে ওটা সম্ভব। সন্তর্পণে টুপিটা পরিয়ে দিয়ে সে বলল, ‘ভারেঙ্কা অপেক্ষা করছে।’
মাথায় সাদা রুমাল বেঁধে হলুদ একটি সুতি ফ্রকে ভারেঙ্কা দাঁড়িয়ে ছিল দরজার কাছে।
‘আসছি, আসছি ভারভারা আন্দ্রেয়েভনা’, কফি শেষ করে ভিন্ন ভিন্ন পকেটে রুমাল আর সিগারেট কেস রেখে বললেন কজ্নিশেভ।
‘কি ভালো আমাদের ভারেঙ্কা, তাই না?’ কজ্নিশেভ উঠে দাঁড়াতেই কিটি বলল স্বামীকে। বলল এমনভাবে যাতে কজ্নিশেভ কথাটা শুনতে পান এবং বোঝাই যায় যে সেটাই চাইছিল কিটি। ‘আর কি সুন্দরী, মর্যাদাময় সৌন্দর্য! ভারেঙ্কা!’ চেঁচিয়ে ডাকলে কিটি, ‘তোমরা কলের বনে যাবে? আমরা সঙ্গ ধরব তোমাদের।’
তুই তোর অবস্থাটা একেবারে বুলে যাস কিটি’, তাড়াতাড়ি দরজা দিয়ে বেরিয়ে বললেন বৃদ্ধা প্রিন্স-মহিষী, ‘অমন চিৎকার করা উচিত নয়।’
কিটির ডাক আর মায়ের তিরস্কার শুনে ভারেঙ্কা দ্রুত লঘু পদক্ষেপে গেল কিটির কাছে। তার গতিভঙ্গির দ্রুততা, সজীব মুখমণ্ডলের রক্তিমা—সব থেকেই বোঝা যাচ্ছিল তার মধ্যে অসাধারণ কিছু এককটা ঘটছে। সে অসাধারণটা কি, কিটি তা জানতো এবং মনোযোগ দিয়ে তাকে সে লক্ষ করছিল। ভারেঙ্কাকে সে ডাকল কেবল কিটির ধারণায় আজ ডিনারের পরে বনে যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা ঘটার কথা, তার জন্য মনে মনে তাকে আশীর্বাদ জানাবার উদ্দেশ্য।
তাকে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে সে বলল, ‘ভারেঙ্কা, একটা ব্যাপার ঘটলে আমি খুবই সুখী হব।’
‘আর আপনি আমাদের সাথে আসছেন তো?’ যে কথাটা তাকে বলা হল, সেটা যেন তার কানে যায়নি এমনকি ভাব করে বিব্রত হয়ে ভারেঙ্কা জিজ্ঞেস করলে লেভিনকে।
‘আমি যাব, তবে মাড়াই তলা পর্যন্ত। সেখানেই থেকে যাব।’
‘কি তোমার এত গরজ পড়ল?’ বলল কিটি।
নতুন গাড়িগুলো দেখতে আর হিসাব করতে হবে’, লেভিন বলল, ‘আর তুমি থাকবে কোথায়?’
‘খোলা বারান্দায়।’
দুই
সমস্ত নারীই জুটেছিলেন বারান্দায়। সাধারণতই খাবার পর সেখানে বসে থাকতে তাঁরা ভালোবাসতেন, কিন্তু আজ আরো একটা ব্যাপার ছিল। বাচ্চার ফতুয়া সেলাই আর কম্বল বোনার যে কাজে সবাই ব্যস্ত থাকত, তা ছাড়াও আজ সেখানে জ্যাম বানানো হচ্ছিল আগাফিয়া মিখাইলোভনার কাছে নতুন এক পদ্ধতিতে, বিনা পানিতে। নতুন এই পদ্ধতিটা কিটি চালু করেছে, যা চলে তাঁদের বাড়িতে। এ ব্যাপারটার ভার আগে ছিল আগাফিয়া মিখাইলোভনার, যাঁর বিশ্বাস ছিল যে লেভিনদের সংসারে যা হবে তা কখনো খারাপ হতে পারে না; স্ট্রবেরি জ্যামে তিনি তাহলেও পানি দিয়েছিলেন এই দৃঢ় মত নিয়ে যে জিনিসটা অন্য কোন ভাবে হতে পারে না। তাতে তিনি ধরা পড়ে যান এবং এখন সবার সমক্ষে তৈরি হচ্ছে র্যাম্পিের জ্যাম, আগাফিয়া মিখাইলোভনাকে বোঝাতে হবে যে পানি ছাড়াও জ্যাম হতে পারে ভালো।
রাঙা আর রাগান্বিত মুখে, এলোমেলো চুলে, কনুই অবধি অনাবৃত হাতে চুলার ওপর বৃত্তাকারে গামলা ঘোরাচ্ছিলেন আগাফিয়া মিখাইলোভনা আর বিষণ্ণ দৃষ্টিতে র্যাম্পবেরিগুলোর দিকে তাকিয়ে সর্বান্তঃকরণে চাইছিলেন যেন তা সিদ্ধ না হয়ে জমে যায়। র্যাম্পবেরি জ্যাম বানানোয় নিজেকে প্রধান উপদেষ্টা গণ্য করে প্রিন্স-মহিষী আগাফিয়া মিখাইলোভনার ক্রোধ টের পেয়ে ভাব করেছিলেন যে তিনি অন্য ব্যাপারে ব্যস্ত, র্যাম্পবেরির দিকে তাঁর নজর নেই, কথা কইছিলেন অন্য বিষয়ে, কিন্তু আড়চোখে চাইছিলেন চুলার দিকে।
