ভ্রন্স্কি তাঁর কথা শুনছিলেন না, দ্রুত পদক্ষেপে নিচে নামছিলেন তিনি, টের পাচ্ছিলেন কিছু-একটা করা দরকার, কিন্তু কি সেটা জানতেন না। আন্না নিজেকে এবং তাঁকে এমন একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছেন বলে তার জন্য একটা বিরক্তি এবং সেই সাথে তাঁর কষ্টের জন্য অনুকম্পায় দোলায়িত হচ্ছিলেন তিনি। নিচে স্টলে নেমে তিনি সোজা গেলেন আন্নার বক্সের কাছে। বক্সে স্ত্রেমভ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তাঁর সাথে : ‘টেনর আর নেই।উধাও হয়েছে।’
আন্নার উদ্দেশে মাথা নুইয়ে ভ্রন্স্কি থামলেন স্ত্রেমভকে অভিবাদনের জন্য।
‘আপনি সম্ভবত দেরিতে এসেছেন, সেরা আরিয়াটা আপনার শোনা হয়নি’, ভ্রন্স্কিকে আন্না বললেন যে দৃষ্টিপাতে সেটা তাঁর মনে হল বিদ্রূপাত্মক।
কঠোর দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আমি সঙ্গীতের তেমন সমঝদার নই।
‘যেমন প্রিন্স ইয়াভিন’, হেসে বললেন আন্না, ‘ওঁর ধারণা পাত্তি গাইছেন বড় চড়া গলায়।’
পড়ে যাওয়া বিজ্ঞাপনপত্রটা ভ্রন্স্কি তুলে দিলে দীর্ঘ দস্তানা পরা ছোট হাতে সেটা নিয়ে আন্না বললেন ‘ধন্যবাদ!’ এবং হঠাৎ সেই মুহূর্তেই সুন্দর মুখখানা তাঁর কেঁপে উঠল। উঠে চলে গেলেন বক্সের পেছন দিকে।
পরের অংকে তাঁর বক্স শুন্য দেখে কাভাতিনা’র ধ্বনিতে স্তিমিত হয়ে আসা থিয়েটার হলে ক্রুদ্ধ হিসহিসানি জাগিয়ে ভ্রনস্কি স্টল থেকে বেরিয়ে এলেন এবং ফিরলেন হোটেলে।
আন্না আগেই চলে এসেছিলেন। ভ্রন্স্কি যখন তাঁর ঘরে ঢুকলেন, তিনি তখন একা, যে সাজে থিয়েটারে গিয়েছিলেন সেই সাজেই। দেয়ালের কাছে প্রথম চেয়ারটায় বসে তিনি চেয়ে ছিলেন সামনের দিকে। ভ্রন্স্কির দিকে একবার দৃষ্টিপাত করেই তক্ষুণি তিনি ফিরে গেলেন আগের অবস্থায়।
‘আন্না’, ভ্রন্স্কি ডাকলেন।
‘তুমি, সব তোমার দোষ!’ উঠে দাঁড়িয়ে হতাশা ও বিদ্বেষের অশ্রুজলে রুদ্ধ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি।
‘আমি বলেছিলাম, মিনতি করেছিলাম না যেতে। জানতাম যে তোমার অমঙ্গল হবে…’
‘অমঙ্গল!’ চেঁচিয়ে উঠলেন আন্না, ‘সাঙ্ঘাতিক! যতদিন বাঁদি, এটা ভুলব না কখনো। ও বলল যে আমার পাশাপাশি বসে থাকা ওর পক্ষে লজ্জার কথা।’
‘হাঁদা মেয়েমানুষের কথা’, বললেন ভ্রন্স্কি, ‘কিন্তু কি দরকার ছিল ঝুঁকি নেওয়ার, চ্যালেঞ্জ করার…
‘তোমার ওই প্রশান্তিকে আমি ঘৃণা করি। আমাকে ওই অবস্থায় ঠেলে দেওয়া উচিত ছিল না তোমার। যদি আমাকে ভালোবাসতে…’
‘আন্না, ভালোবাসার কথা কেন…’
‘হ্যাঁ, আমি যেমন ভালোবাসি তেমন যদি ভালোবাসতে, আমার মত যদি যন্ত্রণায় ভুগতে…’ ভ্রন্স্কির দিকে চেয়ে সভয়ে বললেন আন্না।
তাঁর জন্য ভ্রন্স্কির মায়া হলেও বিরক্তি ধরছিল। তিনি যে ভালোবাসেন এ আশ্বাস তাঁকে দিলেন, কেননা বুঝতে পারছিলেন যে কেবল এটাই শান্ত করতে পারবে তাঁকে, কথায় তাঁকে তিরস্কার করলেন না, কিন্তু তিরস্কার করলেন মনে মনে।
এবং ভালোবাসার যে আশ্বাসদান তাঁর কাছে এত ছেঁদো লাগছিল যে উচ্চারণ করতেও লজ্জা হচ্ছিল, সেটা কিন্তু আন্না আকণ্ঠ পান করে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে উঠলেন। এর পরের দিন দুজনের মিটমাট হয়ে গেল পুরোপুরি, যাত্রা করলেন গ্রামে।
আন্না কারেনিনা – ৬.১
এক
ছেলেমেয়েদের নিয়ে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা গ্রীষ্মটা কাটালেন বোন কিটি লেভিনার কাছে, পত্রোভ্স্কয়েতে। তাঁর নিজের মহালের বাড়িটা একেবারে ভেঙে পড়ছিল, লেভিন এবং তাঁর স্ত্রী তাঁকে বোঝান গ্রীষ্মটা তাঁদের ওখানেই কাটাতে। অব্লোন্স্কি খুবই অনুমোদন করেন ব্যবস্থাটা। বললেন যে, গরম কালটা সপরিবারে গ্রামে কাটাতে বাধা দিচ্ছে তাঁর কাজ, এটা তাঁর পক্ষে অতীব সুখের ব্যাপার হত। মস্কোয় থেকে তিনি মাঝে মধ্যে গ্রামে আসতেন দিন দুয়েকের জন্য। সমস্ত সন্তান ও গৃহশিক্ষিকাকে নিয়ে ডল্লি ছাড়াও লেভিনদের ওখানে আসেন বৃদ্ধা প্রিন্স-মহিষী, অনভিজ্ঞা গর্ভবতী কন্যার দেখাশুনা করা নিজের কর্তব্য বলে জ্ঞান করেছিলেন তিনি। তা ছাড়া বিদেশে কিটির সখ্য হয়েছিল ভারেঙ্কার সাথে, সে কথা দিয়েছিল যে কিটির বিয়ে হলে সে আসবে তার কাছে, সেটা সে পালন করে এল বান্ধবী সকাশে। সবাই এরা লেভিনের স্ত্রীর আত্মপরিজন। আর তাঁদের সবাইকে লেভিন পছন্দ করলেও লেভিনীয় জগৎ ও ব্যবস্থাটার জন্য তাঁর খানিকটা দুঃখ হত, যা তাঁর ভাষায় ‘শ্যেরবাৎস্কি’ উপাদানের এই প্লাবনে ভেসে গেছে। এ গ্রীষ্মে নিজের আত্মীয় বলতে এসেছিলেন সৎ-ভাই সের্গেই ইভানোভিচ, তবে তিনিও লেভিনীয় নয়, কজ্নিশেভ বংশের লোক, ফলে লেভিনীয় আমেজ উবে গিয়েছিল একেবারেই।
বহুদিন খালি পড়ে থাকা লেভিনের বাড়িটা লোকে এমন ভরে উঠল যে প্রায় কোনো ঘরই আর খালি রইল না। আর প্রায় প্রতিদিন খাবার টেবিলে বসে বৃদ্ধা প্রিন্স-মহিষীকে লোক গুণতে হত, আর যে নাতি বা নাতনিটি অশুভ তের নম্বরে পড়তো, তাকে বসাতেন আলাদা ছোট একটা টেবিলে। সংসার চালাবার খুবই চেষ্টা ছিল কিটির, কিন্তু অতিথি ও শিশুদের গ্রীষ্মকালীন খিদে মেটাবার জন্য হাঁস, মুরগি সংগ্রহে তারও ঝামেলা হত কম নয়।
সবাই খেতে বসেছিল। ডল্লির ছেলেমেয়ে, গৃহশিক্ষিকা এবং ভারেঙ্কা পরিকল্পনা ফাঁদছিল ব্যাঙের ছাতা তোলার জন্য কোথাও যাওয়া সবচেয়ে ভালো। বিদ্যা-বুদ্ধির জন্য সমস্ত অতিথিদের মধ্যে কজ্নিশেভের সম্মান ছিল প্রায় ভক্তির সমতুল্য, সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি যোগ দিলেন ব্যাঙের ছাতার আলোচনায়।
