ভ্রন্স্কি যখন আবার সেদিকে তাঁর অপেরা-গ্লাস নিবদ্ধ করলেন, দেখলেন প্রিন্সেস ভারভারা অস্বাভাবিক হাসিতে লাল হয়ে ঘন ঘন তাকাচ্ছেন পাশের বক্সের দিকে; আন্না তাঁর পাখা গুটিয়ে লাল মখমলের ওপর তা ঠুকতে ঠুকতে কোথায় যেন তাকিয়ে আছেন, কিন্তু পাশের বক্সে কি হচ্ছে সেটা তিনি দেখছেন না, স্পষ্টতই চাইছেন না দেখতে। ইয়াভিনের মুখে তেমন একটা ভাব যা ফুটে উঠতো জুয়ায় হেরে গেলে। মুখ গোমড়া করে বাঁয়ের মোচটা মুখের মধ্যে ক্রমাগত গিলতে গিলতে তিনি কটাক্ষে চাইছিলেন পাশের বক্সটায়।
বাঁ পাশের ওই বক্সটায় ছিলেন কার্তাসোভরা। ভ্রন্স্কি তাঁদের চিনতেন এবং এও জানতেন যে আন্না তাঁদের পরিচিত। কার্তাসোভ পত্নী ছোটখাটো শীর্ণা এক নারী, আন্নার দিকে পিছন ফিরে নিজের বক্সে দাঁড়িয়ে স্বামী তাঁকে যে কেপটা এগিয়ে দিচ্ছিলেন সেটা পরছিলেন। মুখ তাঁর বিবর্ণ ও ক্রুদ্ধ। উত্তেজিত হয়ে কি যেন বলছিলেন তিনি। টেকোমাথা মুটকো কার্তাসোভ স্ত্রীকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে অবিরাম তাকাচ্ছিলেন আন্নার দিকে। স্ত্রী বেরিয়ে গেলে স্বামী অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন আন্নার চোখে পড়া এবং স্পষ্টতই তাঁকে লক্ষ্য করছেন না, ইয়াভিনের নিচু হয়ে আসা চুল-ছাঁটা মাথার উদ্দেশে কি যেন বলছিলেন। অভিবাদন না করেই বেরিয়ে যেতে হল কার্তাসোভকে, ফাঁকা হয়ে গেল বক্সটা।
কার্তাসোভ দম্পতি আর আন্নার মধ্যে ঠিক কি ঘটেছে সেটা ভ্রন্স্কি না জানলেও এটা বুঝলেন যে আন্নার পক্ষে কিছু-একটা ঘটেছে যা অপমানকর। এটা তিনি বুঝলেন যা দেখলেন তা থেকে এবং আরও বেশি বুঝলেন আন্নার মুখে দেখে, যিনি গৃহীত ভূমিকা চালিয়ে যাবার জন্য শেষ শক্তি সংগ্রহ করছেন বলে তিনি জানতেন। বাহ্যিক প্রশান্তির এই ভূমিকাটা তাঁর বেশ উত্তাল। যারা তাঁকে আর তাঁর মহলকে জানে না, সমাজে দর্শন দিতে এবং নিজের লেস-ভূষণ আর রূপে এমন লক্ষণীয়রূপে দর্শন দিতে পারছেন বলে নারী সমাজের সমবেদনা, ক্রোধ ও বিস্ময়ের কথাগুলো যারা শোনেনি, তারা এই মহিলার প্রশান্তি ও রূপে মুগ্ধ হত, ভাবতেই পারত না যে উনি লাঞ্ছনা-মঞ্চে চাপানো এক ব্যক্তির মর্মপীড়া বোধ করছেন।
কিছু-একটা ঘটেছে তা জানায়, কিন্তু ঠিক কি ঘটেছে তা না জানায় যন্ত্রণাকর উদ্বেগ হচ্ছিল ভ্রন্স্কির, তাই কোন কিছু জানার জন্য গেলেন বড় ভাইয়ের বক্সে। আন্নার বক্সের বিপরীত ধাপ দিয়ে উঠে বেরোতে গিয়ে তাঁর দেখা হয়ে গেল রেজিমেন্টের ভূতপূর্ব কমান্ডারের সাথে। দুজন পরিচিতের সাথে কথা বলছিলেন তিনি। আলাপে কারেনিনদের নামোল্লেখ কানে এল ভ্রন্স্কির এবং লক্ষ করলেন কিভাবে উচ্চৈস্বরে তাঁকে ডেকে আলাপীদের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিপাত করলেন কমান্ডার।
‘আরে, ভ্রন্স্কি যে! রেজিমেন্টে আসছ কবে? একটা ভোজ ছাড়া তোমাকে তো যেতে দিতে পারি না আমরা। তুমি আমাদের যে মূল শিকড়’, বললেন রেজিমেন্ট কমান্ডার।
‘সময় পাচ্ছি না, খুব দুঃখের কথা, পরের বার’, বলে ভ্রন্স্কি উঠলেন বড় ভাইয়ের বক্সের দিককার সিঁড়ি বেয়ে। বক্সে বড় ভাইয়ের সাথে ছিলেন ইস্পাতের মত কুণ্ডলী করা চুল নিয়ে ভ্র।কর মা, বৃদ্ধা কাউন্টেস। ভারিয়া আর প্রিন্সেস সরোকিনার সাথে তাঁর দেখা হল একতলায় করিডোরে।
প্রিন্সেস সরোকিনাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে এসে দেবরের করমর্দন করে ভারিয়া তৎক্ষণাৎ বলতে লাগলেন যে বিষয়ে তাঁর আগ্রহ সেই কথা। এত উত্তেজিত তাঁকে ভ্রন্স্কি আগে কখনো দেখেননি।
‘আমি মনে করি, এটা অতি হীন ও জঘন্য কাজ, মাদাম কার্তাসোভার কোন অধিকার নেই। মাদাম কারেনিনাকে…’ বলতে শুরু করেছিলেন তিনি।
‘কিন্তু কি হয়েছিল? আমি কিছু জানি না।’
‘সে কি! তুমি কিছু শোননি?
‘তুমি জানো তো, এ ব্যাপারটা আমি শুনছি সবার শেষে।’
‘এই কার্তাসোভার মত বিছুটি জীব আর আছে কি?’
‘কিন্তু কি সে করেছে?’
‘আমি স্বামীর কাছে শুনলাম… কারেনিনাকে অপমান করেছে সে। ওর স্বামী পাশের বক্স থেকে কারেনিনার সাথে কথা বলতে শুরু করেছিলেন আর কার্তাসোভা এক নাটক বাধায়। লোকে বলছে, সে নাকি অপমানকর কিছু-একটা বলে বেরিয়ে যায়।’
‘কাউন্ট, আপনার মা আপনাকে ডাকছেন’, বক্সের দরজায় মুখ বাড়িয়ে বললেন প্রিন্সেস সরোকিনা। ‘এদিকে আমি তোর অপেক্ষায় বসে আছি’, মা বললেন ঈষৎ বিদ্রূপের হাসি হেসে, ‘তোর যে দেখা পাওয়াই ভার।’
ছেলে দেখলেন যে আন্দের হাসি তিনি চাপতে পারছেন না।
‘প্রণাম মা। যে আনন্দের হাসি তিনি চাপতে পারছেন না।
‘প্রণাম মা। আমি এলাম আপনার কাছে’, নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন ভ্রন্স্কি।
‘কেন তুই গেলি না মাদাম কারেনিনার পরিতোষণে?’ প্রিন্সেস সরোকিনা করে তিনি ফরাসি ভাষায় যোগ করলেন
‘চমক লাগিয়েছে সে! তার জন্য লোকে ভুলে যাচ্ছে পাত্তিকেও!’
‘মা, আমি আপনাকে অনুরোধ করেছিলাম আমার সামনে এ সব কথা না বলতে’, ভুরু কুঁচকে ভ্রন্স্কি বললেন। ‘আমি তাই বলছি যা লোকে বলছে।’
কোন জবাব দিলেন না ভ্রন্স্কি, প্রিন্সেস সরোকিনার সাথে কয়েকটা বাক্য বিনিময় করে বেরিয়ে এলেন। দোরগোড়ায় দেখা হল বড় ভাইয়ের সাথে।
তিনি বললেন, ‘আ, আলেক্সেই! কি জঘন্যতা! মহিলাটি একটি গর্দভ, তার বেশ কিছু নয়… আমি এক্ষুণি ভাবছিলাম আন্নার কাছে যাব। চল যাই একসাথে।
