হাতের সে ভঙ্গিটা গিয়ে ঠেকল ছোট টেবিলটায় যেখানে ছিল সেলৎজার পানি আর কনিয়াকের পানপাত্র। প্রায় সেটা উলটে পড়ছিল, ধরতে গেলেন তিনি কিন্তু ফসকে গেল, বিরক্তিতে টেবিলে লাথি মেরে ঘণ্টি বাজালেন।
সাজ-ভৃত্য ঘরে ঢুকতে তাকে বললেন, ‘যদি তুমি আমার এখানে কাজ করতে চাও, তাহলে নিজের কর্তব্য মনে রেখো। এমনটা যেন না হয়। পরিষ্কার করো এগুলো।’
নিজেকে নির্দোষ জ্ঞান করে সাজ-ভৃত্য আত্মসমর্থন করতে যাচ্ছিল, কিন্তু হুজুরের মুখ দেখে বুঝল যে কেবল চুপ করে থাকা দরকার, তাড়াতাড়ি গালিচার ওপর ঝুঁকে যা ভেঙেছে এবং ভাঙেনি, তেমন সব পানপাত্র আর বোতল কুড়োতে লাগল।
‘এটা তোমার কাজ নয়, সাফ করতে বলো চাপরাশিকে আর আমাদের সান্ধ্য পোশাকের ব্যবস্থা করো।’
ভ্রন্স্কি থিয়েটার হলে ঢুকলেন সাড়ে আটটায়। অপেরা চলছে পুরোদমে। ওভারকোট রাখার তদারকিতে যে বৃদ্ধটি ছিল সে ভ্রন্স্কির কোট খুলতে গিয়ে তাঁকে চিনতে পেরে ‘হুজুর’ বলে সম্বোধন করলে এবং বলল, ট্যাগ নম্বর নেবার দরকার নেই, ফিওদর বলে হাঁক দিলেই হবে। আলোকিত করিডরে এই বৃদ্ধটি এবং ফার কোট হাতে দুজন চাপরাশি ছাড়া আর কেউ ছিল না, দরজায় কান পেতে তারা গান শুনছিল। দরজা দিয়ে শোনা যাচ্ছিল অর্কেস্ট্রার স্ট্যাকাটোর সন্তর্পণে সঙ্গত এবং একটি নারীকণ্ঠ যা চমৎকার তান ধরছিল। দরজা খুলে একজন পরিচারক চুপি চুপি বেরিয়ে আসতেই যে তানটা শেষ হতে যাচ্ছিল তা অভিভূত করল ভ্রন্স্কির কর্ণকুহর। কিন্তু সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে গেল দরজা, গানের শেষটা ও তার মূর্ছনা তাঁর শোনা হল না, কিন্তু দরজার ওপাশে প্রচণ্ড করতালিধ্বনি থেকে বুঝলেন যে মূর্ছনা শেষ হয়েছে। ঝাড়লণ্ঠন আর ব্রোঞ্জের গ্যাস দীপাধারে অত্যুজ্জ্বল প্রেক্ষাগৃহে যখন তিনি প্রবেশ করলেন, করতালি তখনো চলছিল। মঞ্চে নগ্নস্কন্ধে ও হীরকে দেদীপ্যমানা গায়িকা নত হয়ে হেসে পাদপ্রদীপের ওপর দিয়ে বিদঘুটে রকমে ছুড়ে দেওয়া ফুলের তোড়া কুড়িয়ে নিচ্ছিলেন তাঁর হাত ধরে থাকা ‘টেনরের সাহায্যে; পাদপ্রদীপের ওপর দিয়ে লম্বা হাত বাড়িয়ে কি-একটা উপহার নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন মাথার মাঝখানে টেরি কাটা পমেড মাখা চমচকে চুলের এক ভদ্রলোক, তাঁর কাছে এলেন গায়িকা, অমনি স্টল আর বক্সের সমস্ত শ্রোতা চঞ্চল হয়ে উঠল, ঝুঁকি পড়ল সামনে, চিৎকার করে উঠল, হাততালি দিল। বেদীতে দণ্ডায়মান কন্ডাক্টর সাহায্য করলেন উপহারটা পৌঁছে দিতে এবং ঠিকঠাক করে নিলেন তাঁর সাদা টাই। স্টলের মাঝামাঝি পর্যন্ত গিয়ে ভ্রুনস্কি চেয়ে দেখতে লাগলেন চারিদিক। পরিচিত অভ্যস্ত পরিস্থিতি, মঞ্চ, কোলাহল, ঠেসে ভরে তোলা প্রেক্ষাগৃহের এসব চেনা, অনাকর্ষণীয়, বিচিত্র দর্শকদলের দিকে তিনি আজ নজর দিলেন সবচেয়ে কম।
বক্সে বরাবরের মতই পেছনদিকে সেই একই কি-সব অফিসারের সাথে কি-সব মহিলা; সেই একই রংবেরঙের নারী, উর্দি, ফ্রক-কোট–সৃষ্টিকর্তা জানেন কারা; ওপর সার্কেলে সেই একই নোংরা ভিড় আর সে ভিড়ের মধ্যে, বক্সে আর সামনের সারিগুলোয় আসল পুরুষ আর নারী জন চল্লিশেক। এই মরূদ্যানগুলির দিকেই মনোনিবেশ করলেন ভ্রন্স্কি এবং তৎক্ষণাৎ তাদের যোগসূত্র খুঁজে পেলেন।
ভ্রন্স্কি যখন ভেতরে ঢোকেন, অংকটা তখন শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই বক্সে বড় ভাইয়ের কাছে না গিয়ে সোজাসুজি এলেন প্রথম সারিতে সেপুখোভঙ্কয়-এর দিকে। অর্কেস্ট্রা পিটের কাছে হাঁটু বেঁকিয়ে হিল ঠুকছিলেন তিনি, দূর থেকে ভ্রন্স্কিকে দেখতে পেয়ে হেসে কাছে ডাকেন।
আন্নাকে তখনো দেখেননি ভ্রন্স্কি, ইচ্ছে করেই তাকাননি তাঁর দিকে। কিন্তু লোকের দৃষ্টি যে দিকে তা থেকে তিনি জানতেন কোথায় আন্না। অলক্ষ্যে তিনি চাইছিলেন এদিক-ওদিক, কিন্তু আন্নাকে খুঁজছিলেন না; সবচেয়ে খারাপটার অপেক্ষায় তিনি দৃষ্টি দিয়ে সন্ধান করছিলেন কারেনিনের। সৌভাগ্যের কথা যে এবার তিনি থিয়েটারে ছিলেন না।
‘ফৌজী রকম-সকম তোর মধ্যে এখন টিকে আছে কত কম!’ ভ্রন্স্কিকে বললেন সেপুখোভস্কয়, ‘তুই এখন একজন কূটনীতিক, শিল্পী বা ঐ ধরনের কিছু-একটা।’
‘হ্যাঁ, বাড়ি ফেরা মাত্র আমি ড্রেস-স্যুট পরেছি’, হেসে জবাব দিয়ে ভ্রন্স্কি ধীরে ধীরে অপেরা-গ্লাস বার করতে লাগলেন।
‘হ্যাঁ, এই ব্যাপারটায় তোকে আমার ঈর্ষা হয় তা কবুল করছি। বিদেশ থেকে ফিরে আমি যখন এটা পারি’, নিজের কাঁধ-পট্টি দেখালেন তিনি, ‘তখন স্বাধীনতা খোয়ানোর জন্য কষ্ট হয়।’
ভ্রন্স্কির সামরিক ক্রিয়াকলাপের আশা সেপুখোভস্কয় জলাঞ্জলি দিয়েছেন অনেকদিন, কিন্তু তাঁকে ভালোবাসেন আগের মতই আর এখন তো তাঁর জন্য সবিশেষ প্রীতিবোধই করছেন।
‘দেরি করে তুই এলি, প্রথম অংকটা দেখতে পেলি না, আফশোষ হচ্ছে।’
এক কান দিয়ে শুনতে শুনতে ভ্রন্স্কি ওপর থেকে প্রথম তলা পর্যন্ত বক্সগুলোকে দেখছিলেন শিরপেচ পরা এক মহিলা আর বাড়িয়ে আনা অপেরা-গ্লাসে রেগে চোখ মিটমিট করা এক টেকো ভদ্রলোকের কাছাকাছি হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন আন্নার মুখ—গর্বিত, আশ্চর্য সুন্দর, লেসের বন্ধনীর মধ্যে হাস্যময়ী। ছিলেন তিনি পঞ্চম বক্সের নিচতলায়, ওঁর কাছে থেকে বিশ পা দূরে। সামনে বসে সামান্য মাথা হেলিয়ে কি যেন বলছিলেন ইয়াভিনকে। প্রশস্ত মনোহর স্কন্ধে মাথার ঠাট, চোখে সংযত-প্রবুদ্ধ দীপ্তির ছটা এবং তাঁর সমগ্র মুখমণ্ডলে ভ্রন্স্কির মনে হচ্ছিল মস্কোর বলনাচে তাঁকে যেমন দেখেছিলেন ঠিক তেমনি। কিন্তু এ রূপে এখন তাঁর মনোভাব হল একেবারে ভিন্ন। আন্নার প্রতি তাঁর অনুভবে এখন কুহকের মত কিছু আর ছিল না, তাই তাঁর রূপ তাঁকে আগের চেয়েও প্রখরভাবে টানলেও সেইসাথে এখন আহতও করছিল। আন্না তাঁর দিকে চাইছিলেন না, কিন্তু ভ্রন্স্কি টের পাচ্ছিলেন যে তাঁকে তিনি দেখেছেন।
