তাঁর দিকে তাকাবার চেষ্টা না করে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘সত্যিই আপনি থিয়েটারে যাবেন?’
‘অমন ভীত হয়ে জিজ্ঞেস করছেন যে?’ ভ্রন্স্কি তাঁর দিকে তাকাচ্ছেন না বলে পুনরায় আহত বোধ করে আন্না বললেন, ‘না যাবার কি আছে?’
আন্না যেন বুঝতে পারছিলেন না তাঁর কথার গুরুত্ব।
বলাই বাহুল্য, না যাবার কোন কারণ নেই’, ভুরু কুঁচকে বললেন ভ্রন্স্কি।
‘সেই কথাই তো আমি বলছি’, আন্না বললেন, ভ্রন্স্কির কথার সুরে যে ব্যঙ্গ ছিল সেটা বুঝতে চাইলেন না ইচ্ছে করেই, দীর্ঘ, সুরভিত দস্তানাটা পরতে লাগলেন শান্তভাবে।
‘আন্না, দোহাই সৃষ্টিকর্তা! কি হল আপনার?’ উনি বললেন তাঁর চৈতন্য উদ্রেকের জন্য ঠিক যেভাবে একদা বলেছিলেন আন্নার স্বামী।
‘বুঝতে পারছি না কি আপনি বলতে চাইছেন। ‘
‘আপনি জানেন যে যাওয়া চলে না।’
‘কেন? আমি একা যাচ্ছি না। প্রিন্সেস ভারভারা পোশাক বদলাতে গেছেন। তিনি যাবেন আমার সাথে।’
বোধের অক্ষমতা ও হতাশার ভঙ্গি ফুটিয়ে কাঁধ কোঁচকালেন ভ্রন্স্কি। বলতে শুরু করেছিলেন, ‘কিন্তু আপনি কি জানেন না…’
‘জানতে চাই না আমি!’ প্রায় চিৎকার করে উঠলেন আন্না। ‘চাই না। যা করেছি তার জন্য অনুশোচনা করব কি? না, না, না। প্রথম থেকে যদি শুরু করতে হয়, তাহলে যা ঘটেছে, তাই-ই ঘটবে। আমাদের কাছে, আমার আর আপনার কাছে গুরুত্ব ধরে শুরু একটা জিনিস : দুজন দুজনকে আমরা ভালোবাসি কিনা। অন্য কথা ধর্তব্য নয়। কেন এখানে আমরা আলাদা আলাদা থাকছি, দেখা সাক্ষাৎ হচ্ছে না? কেন আমি যেতে পারি না? তোমাকে ভালোবাসি আমি, আর সবে আমার বয়ে গেল’, বললেন তিনি রুশীতে, চোখে ভ্রন্স্কির কাছে দুর্বোধ্য একটা ঝিলিক তুলে তাঁর দিকে তাকিয়ে; ‘যদি তুমি বদলে না গিয়ে থাকো। কেন তুমি তাকাচ্ছ না আমার দিকে?’
আন্নার দিকে ভ্রন্স্কি চাইলেন। দেখলেন তাঁর মুখ আর সব সময় মানানসই সাজগোজের সমস্ত সৌন্দর্য। কিন্তু এখন তাঁর এই সৌন্দর্য আর সৌষ্ঠবেই পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল তাঁর।
‘আমার হৃদয়াবেগ যে বদলাতে পারে না, তা আপনি জানেন, কিন্তু অনুরোধ করছি, মিনতি করছি যাবেন না’, কণ্ঠস্বরে কোমল একটা মিনতি কিন্তু দৃষ্টিতে শীতলতা নিয়ে আবার তিনি বললেন ফরাসিতে।
কথাগুলো শুনছিলেন না আন্না, কিন্তু দৃষ্টির শীতলতা দেখতে পাচ্ছিলেন, ক্ষিপ্র কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘আর আমার অনুরোধ কেন আমার যাওয়া চলে না, সেটা বলুন। ‘
‘কারণ এতে আপনার…আপনার…’ থতমত খেলেন ভ্রন্স্কি।
‘কিছুই বুঝতে পারছি না। ইয়াভিনসুনাম নষ্ট করতে পারেন না, প্রিন্সেস ভারভারাও অন্যদের চাইতে খারাপ কিছু নন। আ, এই তো উনি এসে গেছেন।’
তেত্রিশ
নিজের অবস্থাটা ইচ্ছে করে বুঝতে না চাওয়ার জন্য আন্নার ওপর বিরক্তি, প্রায় আক্রোশ ভ্রন্স্কি বোধ করলেন এই প্রথম। জ্বালাটা আরো বেড়ে গিয়েছিল এই জন্য যে তাঁর বিরক্তির কারণটা তিনি মুখ ফুটে বলতে পারছিলেন না। কি তিনি ভাবছেন, সেটা সোজাসুজি বলতে হলে তিনি এই বলতেন : ‘সবার পরিচিত এক প্রিন্সেসের সাথে এই বেশভূষার থিয়েটারে যাওয়ার অর্থ শুধু পতিতা নারী হিসেবে নিজের অবস্থাটা মেনে নেওয়াই নয়, সমাজকে চ্যালেঞ্জ করাও, অর্থাৎ চিরকালের জন্য সমাজ থেকে বিতাড়িত হওয়া।’
এ কথাটা আন্নাকে তিনি বলতে পারেন না। ‘কিন্তু এ কথাটা সে বুঝতে পারছে না কেমন করে, কি ঘটছে ওর মধ্যে?’ নিজেকে বলছিলেন তিনি। টের পাচ্ছিলেন একই সময়ে আন্নার প্রতি শ্রদ্ধা তাঁর যেমন কমেছে, তেমনি বেড়েছে তাঁর রূপ সম্পর্কে চেতনা।
মুখ গোমড়া করে তিনি ফিরলেন নিজের কামরায়। লম্বা ঠ্যাঙ একটা চেয়ারের ওপর বাড়িয়ে দিয়ে ইয়াভিন সেলজার পানি দিয়ে কনিয়াক পান করছিলেন। তাঁর পাশে বসে বললেন তাঁকেও খানিকটা দিতে।
তুই বলছিলি লানকোস্কির ‘মগুচি’র কথা। ঘোড়াটা ভালো, কিনতে পরামর্শ দিচ্ছি তোকে’, বন্ধুর বিমর্ষ মুখের দিকে চেয়ে বললেন ইয়াভিন, ‘ওর গতরটা ভারী, কিন্তু পা আর মাথার তুলনা হয় না।’
‘তাই ভাবছি, কিনব’, বললেন ভ্রন্স্কি।
ঘোড়া নিয়ে কথাবার্তায় ব্যস্ত থাকলেও ভ্রন্স্কি মুহূর্তের জন্য আন্নার কথা ভুলতে পারছিলেন না, আপনা থেকেই কান পেতে থাকছিলেন করিডরে পদশব্দের জন্য, ফায়ার-প্লেসের ওপর ঘড়িটার দিকে চাইছিলেন বারে বারে।
‘আন্না আর্কাদিয়েভনা আপনাকে বলতে বলেছেন যে তিনি থিয়েটারে গেছেন।
ফেনিল পানিটায় আরো একপাত্র কনিয়াক ঢেলে এবং তা উদরস্থ করে উঠে দাঁড়িয়ে উর্দির বোতাম বন্ধ করলেন ইয়াভিন।
‘তাহলে? চল যাই’, বললেন তিনি মোচের তলে সামান্য হেসে আর সে হাসিতে এটা বুঝিয়ে দিয়ে যে ভ্রন্স্কির মনমরা হওয়ার কারণটা তিনি বোঝেন, কিন্তু তাতে কোন গুরুত্ব দিচ্ছেন না
‘আমি যাব না’, আঁধার মুখে বললেন ভ্রন্স্কি।
‘কিন্তু আমাকে যেতে হবে, কথা দিয়েছি। বেশ, তাহলে আসি। তুই বরং একটা সীট নে। ক্রাসিস্কির সীটটা’, যেতে যেতে যোগ করলেন ইয়াভিন।
‘না, আমার কাজ আছে।’
হোটেল থেকে বেরিয়ে ইয়াভিন ভাবলেন, ‘বৌ থাকলে ঝামেলা, প্রেমিকা থাকলে আরো খারাপ।’
চেয়ার থেকে উঠে ভ্রন্স্কি একা একা পায়চারি করতে লাগলেন ঘরে।
‘আচ্ছা কি চলছে আজকে? চতুর্থ দাতব্য কনসার্ট… সস্ত্রীক ইয়েগর থাকবে সেখানে, খুব সম্ভব মা-ও। তার মানে সেখানে গোটা পিটার্সবুর্গ। এখন আন্না ঢুকেছে, ওভারকোট ছেড়ে গেছে, ঢুকছে আলোয়, তুশকেভিচ, ইয়াভিন, প্রিন্সেস ভারভারা…’ ছবিটা তিনি কল্পনা করলেন মনে মনে, ‘আর আমি? আমি কি ভয় পাচ্ছি, নাকি তার ওপর তদারকির ভার ছেড়ে দিয়েছি তুশকেভিচের ওপর? যেদিক থেকেই দেখা যাক, আহাম্মকি, আহাম্মকি—কেন আমাকে সে এমন অবস্থায় ফেলছে?’ হাতের একটা হতাশ ভঙ্গি করে তিনি বললেন।
