‘আমার এখানে খেতে আসুন’, নিজের বিব্রত ভাবটার জন্য যেন নিজের ওপরেই রাগ করে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন আন্না, তবে নতুন লোকের সামনে নিজের অবস্থাটা প্রকাশ পেলে যেমন হয় বরাবরের মত তেমনি লাল হয়ে। ‘খাবার এখানে ভালো নয়, তবে ওর সাথে অন্তত থাকতে পারবেন। আলেকসেই তার রেজিমেন্টের বন্ধুদের মধ্যে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে আপনাকে।’
‘খুব আনন্দ হচ্ছে’, যেরকম হেসে ইয়াভিন কথাটা বললেন তা থেকে ভ্রন্স্কি বুঝলেন যে আন্নাকে তাঁর বেশ ভালো লেগেছে।
ইয়াভিন মাথা নুইয়ে বেরিয়ে গেলেন, ভ্রন্স্কি রয়ে গেলেন কিছুক্ষণের জন্য আন্না জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমিও যাচ্ছ?’
‘এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে’, ভ্রন্স্কি বললেন, ‘যা! আমি এক্ষুণি আসছি’, চেঁচিয়ে তিনি বললেন ইয়াভিনকে। ভ্রন্স্কির হাত ধরে আন্না অপলকে চেয়ে রইলেন তাঁর দিকে, মনে মনে ভাবতে লাগলেন কি বললে তাঁকে আটকে রাখা যায়।
‘দাঁড়াও, তোমাকে কিছু বলার আছে’, তার বেঁটে হাতখানা নিয়ে আন্না চেপে ধরলেন নিজের গলায়, ‘হ্যাঁ, খেতে নেমন্তন্ন করায় খারাপ কিছু হয়নি তো?’
‘ভালোই করেছ’, প্রশান্ত হাসি নিয়ে ভ্রন্স্কি বললেন, যাতে দেখা গেল তাঁর সুবিন্যস্ত দাঁত। আন্নার হাতে চুমু খেলেন তিনি 1
নিজের দুই হাতে ওঁর হাতটায় চাপ দিয়ে আন্না বললেন, ‘আলেকসেই, আমার প্রতি তোমার মনোভাব বদলায়নি? আমার বড় বিছছিরি লাগছে এখানে। কবে আমার যাব?’
‘শিগগিরই, শিগগিরই। তোমার বিশ্বাস হবে না আমার পক্ষেও এখানে দিন কাটানো কি কষ্টকর’, এই বলে নিজের হাত টেনে নিলেন তিনি।
‘তা যাও, যাও!’ আহত বোধ করে আন্না বললেন এবং দ্রুত চলে গেলেন তাঁর কাছ থেকে।
বত্রিশ
ভ্রন্স্কি যখন ফিরলেন, আন্না ঘরে ছিলেন না। শুনলেন উনি চলে যাবার কিছু পরেই কে একজন মহিলা আসেন তাঁর কাছে এবং দুজনে একসাথে বেরিয়ে যান। কোথায় যাচ্ছেন তা না বলে আন্না যে বেরিয়ে গেছেন, এখনো পর্যন্ত তাঁর যে দেখা নেই, সকালেও আন্না যে কিছু না বলে গিয়েছিলেন কোথায় যেন—সেই সাথে আজ সকালে তাঁর মুখের উদ্দীপিত ভাবটা এবং ইয়াভিনের সামনে যে ক্রুদ্ধ স্বরে ছেলের ফটোগুলো তাঁর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নেন, এ সব ভ্রন্স্কিকে ভাবাল। তিনি স্থির করলেন যে আন্নার সাথে একটা বোঝাবুঝি হয়ে যাওয়া দরকার। ড্রয়িং-রুমে তিনি বসে রইলেন। কিন্তু আন্না ফিরলেন একা নয়, নিজের ফুফু, বৃদ্ধা কুমারী প্রিন্সেস অবলোস্কায়াকে সাথে করে। ইনি সেই মহিলা সকালে যিনি এসেছিলেন এবং যাঁকে নিয়ে আন্না বাজার করতে যান। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও সপ্রশ্ন ভ্রন্স্কির মুখের ভাব যেন লক্ষ করছিলেন না আন্না, ফুর্তি করে তাকে বললেন কি তিনি কিনেছেন আজ সকালে। ভ্রন্স্কি দেখতে পাচ্ছিলেন যে বিশেষ কিছু-একটা ব্যাপার ঘটেছে ওঁর : যে জ্বলজ্বলে চোখে তিনি ভ্রন্স্কির দিকে চকিত দৃষ্টিপাত করছিলেন তাতে ফুটছিল একটা টান-টান মনোযোগ এবং তাঁর ভাবভঙ্গি ও কথাবার্তায় ছিল সেই দ্রুততা আর লাবণ্য যা তাঁদের অন্তরঙ্গতার প্রথম দিকটায় অত মুগ্ধ করেছিল তাঁকে আর এখন শংকিত ও ভীত করে তুলছে।
চার জনের জন্য খাবার ব্যবস্থা হয়েছিল। ছোট ডাইনিং-রুমটায় যাবার জন্য সবাই তৈরি হচ্ছে এমন সময় আন্নার কাছে তুশকেভিচ এলেন প্রিন্সেস বেত্সির কাছে থেকে। বিদায় জানাতে আসতে পারছেন না বলে প্রিন্সেস বেত্সি ক্ষমা চেয়েছেন; তিনি অসুস্থ, কিন্তু আন্নাকে অনুরোধ করেছেন সাড়ে ছ’টা থেকে ন’টার মধ্যে তাঁর কাছে আসতে। এভাবে সময় বেঁধে দেওয়ায় ভ্রন্স্কি তাকালেন আন্নার দিকে, তার মানে কারও সাথে যাতে তাঁর দেখা না হয়, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে; কিন্তু আন্না যেন খেয়াল করলেন না সেটা।
মৃদু হেসে তিনি বললেন, ‘খুব দুঃখিত যে ঠিক ওই সাড়ে ছ’টা থেকে ন’টার মধ্যেই যেতে পারছি না।’
‘প্রিন্সেস খুব দুঃখিত হবেন।’
‘আমিও।’
‘আপনি তাহলে পাত্তি শুনতে যাচ্ছেন নিশ্চয়’, বললেন তুশকেভিচ।
‘পাত্তি? ভালো কথা বলেছেন তো। যেতাম যদি বক্সের টিকিট পেতাম।’
‘আমি জোগাড় করে দিতে পারি’, বললেন তুশকেভিচ।
‘অনেক, অনেক ধন্যবাদ’, আন্না বললেন, ‘আমাদের সাথে খেতে বসবেন না?’
সামান্য কাঁধ কোঁচকালেন ভ্রন্স্কি। আন্না কি করছেন তা একেবারেই বুঝতে পারছিলেন না তিনি। কেন উনি নিয়ে এসেছেন এই বৃদ্ধা প্রিন্সেসকে, কেন তুশকেভিচকে ধরে রাখলেন খাবার জন্য, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, কেন তাকে পাঠানো হচ্ছে বক্সের টিকিট কাটতে? তাঁর অবস্থায় পাত্তির দাতব্য কনসার্টে যাওয়ার কথা ভাবা যায় কি, যেখানে থাকবে তাঁর পরিচিত গোটা সমাজটা? গুরুতর দৃষ্টিতে তিনি চাইলেন তাঁর দিকে, কিন্তু আন্না জবাব দিলেন হয় আমুদে, নয় মরিয়া সেই একই চ্যালেঞ্জের দৃষ্টিপাতে যার অর্থ তিনি ধরতে পারছিলেন না। খাবার সময়টায় আন্না হয়ে উঠলেন উদ্ধত ফুর্তিবাজ : তিনি যেন রঙ্গলীলা করছিলেন তুশকেভিচ আর ইয়াভিন দুজনের সাথেই। যখন খাওয়ার টেবিল ছেড়ে ওঠা হল এবং তুশকেভিচ গেলেন বক্সের ধান্ধায় আর ইয়াভিন ধুমপান করতে, ভ্রন্স্কি তাঁর সাথেই চলে গেলেন নিজের ঘরে। সেখানে কিছুক্ষণ বসে থেকে তিনি উঠলেন ওপরে। আন্না ততক্ষণে হালকা রঙের সিল্ক আর মখমলের বুক খোলা গাউনে তৈরি, এটি তিনি বানিয়েছিলেন প্যারিসে। মাথায় তাঁর দামী সাদা লেস, মুখখানাকে বেড় দিয়ে তা তাঁর ঝলমলে রূপ ফুটিয়ে তুলেছে বিশেষভাবে।
