‘গ্রাম আমি ভালোবাসি’, লেভিনের গলার সুর লক্ষ্য করে এবং লক্ষ্য করেননি এই ভাব করে কি বললেন।
কাউন্টেস নর্ডস্টন বললেন, কিন্তু আশা করি কাউন্ট সব সময় গ্রামে থাকতে রাজি হবেন না।
জানি না, গ্রামে আমি থাকিনি বেশিদিন’, ভ্রনস্কি বলে চললেন, তবে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল আমার। মায়ের সাথে নীস্-এ শীত কাটাবার সময় গায়ের জন্য, বাকলের জুতা আর চাষীগুলো নিয়ে রুশী গায়ের জন্য আমার যে মন কেমন করেছিল তেমন আর কোথাও হয়নি। জানেনই তো, নীস্ এমনিতেই একটা একঘেয়ে জায়গা। নেপলস, সরেন্তোও তাই, ভালো লাগে শুধু অল্প সময়ের জন্য। আর ঠিক সেখানেই বড় বেশি মনে পড়ে রাশিয়া, ঠিক তার গাঁয়ের কথাই… সেগুলো ঠিক যেন…’।
তিনি বলে যাচ্ছিলেন কিটি লেভিন, উভয়কেই লক্ষ্য করে ও একজনের ওপর থেকে আরেকজনের দিকে তাঁর শান্ত, অমায়িক দৃষ্টি ফিরিয়ে–বলে যাচ্ছিলেন স্পষ্টতই যা তার মাথায় আসছিল।
কাউন্টেস নর্ডস্টন কিছু একটা বলতে চাইছেন লক্ষ্য করে তিনি কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলেন, মন দিয়ে শুনতে লাগলেন তাকে আলাপ মুহূর্তের জন্যও থামছিল না, ফলে প্রসঙ্গের ঘাটতি পড়লে বৃদ্ধা প্রিন্স-মহিষীর সব সময়ই মজুদ থাকত যে দুটো ভারি কামান ও ক্লাসিক আর আধুনিক শিক্ষা এবং বাধ্যতামূলক সৈনিকবৃত্তি, তা আর ব্যবহার করতে হল না, আর কাউন্টেস নর্ডস্টনেরও লাগা হল না লেভিনের পেছনে।
সাধারণ আলাপে যোগ দেবার ইচ্ছে হচ্ছিল লেভিনের, কিন্তু পারছিলেন না; প্রতি মুহূর্তে তিনি নিজেকে বলছিলেনঃ ‘এবার যেতে হয়, কিন্তু চলে গেলেন না, কি যেন আশা করছিলেন।
আলাপ চলল প্ল্যানচেত টেবিল আর প্রেতাত্মা নিয়ে। কাউন্টেস নর্ডস্টন প্রেতবাদে বিশ্বাসী, কি কি অলৌকিক কাণ্ড তিনি দেখেছেন সে কথা বলতে লাগলেন তিনি।
‘আহ্ কাউন্টেস, সৃষ্টিকর্তার দোহাই! অবশ্য-অবশ্যই ওদের সাথে আমার যোগাযোগ করিয়ে দিন। অসাধারণ কিছু আমি দেখিনি, যদিও তার খোঁজে থেকেছি সর্বত্র’, হেসে বললেন ভ্রনস্কি।
‘বেশ, আগামী শনিবার, জবাব দিলেন কাউন্টেস নর্ডস্টন, আর কনস্তান্তিন দৃমিত্রিচ, এসবে বিশ্বাস করেন? লেভিনকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘কেন জিজ্ঞেস করছেন? জানেনই তো আমি কি বলব।’
কিন্তু আমি আপনার মত জানতে চাইছি।’
লেভিন বললেন, আমার মত শুধু এই যে, এসব প্ল্যানচেত টেবিলে প্রমাণ হয় যে, শিক্ষিত সমাজ কৃষকদের চেয়ে উন্নত নয়। তারা চোখ দেওয়ায়, মারণ, উচাটন বশীকরণে বিশ্বাস করে, আর আমরা…’
‘সে কী! আপনি বিশ্বাস করেন না?’
বিশ্বাস করা সম্ভব নয়।
কিন্তু আমি যদি স্বচক্ষে দেখে থাকি?’
কৃষক মেয়েরাও বলে যে, তারা বাস্তুভূতকে দেখেছে।
‘তার মানে আপনি ভাবছেন, আমি মিথ্যে বলছি?’ নিরানন্দ হাসি হেসে উঠলেন তিনি।
না-না, মাশা। কনস্তান্তিন দুমিত্রিচ বলছেন যে, উনি বিশ্বাস করতে পারেন না, লেভিনের পক্ষ নিয়ে লাল হয়ে বলল কিটি। সেটা লেভিন বুঝলেন এবং উত্যুক্তি তার আরো বেড়ে গেল। ভেবেছিলেন জবাব দেবেন, কিন্তু কথাবার্তা অপ্রীতিকর হয়ে উঠবে-এমন আশঙ্কা দেখা দিতেই তখনই তার খোলামেলা প্রসন্ন হাসি নিয়ে সাহায্যে এলেন ভ্রনস্কি। জিজ্ঞেস করলেন, ‘সম্ভব বলে আপনি একেবারে স্বীকার করেন না কেন, বলুন তো? বিদ্যুতের অস্তিত্ব আমরা মানি– যা কেউ দেখিনি; কেন আরো একটা নতুন শক্তি সম্ভব হবে না, যা আমাদের কাছে এখনো অজ্ঞাত, যা…’।
‘বিদ্যুৎ যখন আবিষ্কৃত হয়, ক্ষিপ্রগতিতে বাধা দিয়ে বললেন লেভিন, তখন দেখা গিয়েছিল শুধু ঘটনাটা, জানা ছিল না কোত্থেকে তা ঘটছে এবং কি তা করতে পারে তাকে কাজে লাগাবার আগে বহু যুগ কেটে যায়। প্রেতবাদীরা কিন্তু শুরু করেছেন প্ল্যানচেত টেবিলকে দিয়ে লিখিয়ে। প্রেতাত্মারা আসছে তাদের কাছে, তারপর বলতে লাগলেন যে অজ্ঞাত শক্তি আছে।
ভ্রনস্কি মন দিয়ে লেভিনের কথা শুনছিলেন, যা তিনি সব সময় শুনে থাকেন। স্পষ্টতই আকৃষ্ট বোধ করছিলেন। তাঁর কথায়।
‘তা ঠিক, কিন্তু প্রেতবাদীরা বলেন : এ শক্তিটা কি তা বর্তমানে আমরা জানি না। কিন্তু শক্তি আছেই, আর ঐ পরিস্থিতিতে তা সক্রিয় হচ্ছে। শক্তিটা কি তা বের করুন বিজ্ঞানীরা। কেন এটা নতুন কোন শক্তি হতে পারবে না, আমি তার কোন কারণ দেখছি না। যদি তা…’
কারণ, বাধা দিলেন লেভিন, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে যতবারই আপনি উল দিয়ে রজন ঘষবেন, ততবারই দেখা যাবে। নির্দিষ্ট একটা ঘটনা। আর এক্ষেত্রে ঘটছে প্রতিবার নয়, তার মানে প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়।’
সম্ভবত, কথাবার্তাটা ড্রয়িং-রুমের পক্ষে বড় বেশি ভারী হয়ে উঠছে অনুভব করে ভ্রনস্কি আর আপত্তি করলেন না। প্রসঙ্গ ফেরাবার চেষ্টায় ফুর্তিতে হেসে তিনি ফিরলেন মহিলাদের দিকে। বললেন, ‘আসুন কাউন্টেস, এখনই চেষ্টা করে দেখা যাক, কিন্তু লেভিনের ইচ্ছে, যা ভেবেছেন তা পুরো বলবেন।
তিনি বলে চললেন, আমি মনে করি যে কোন একটা নতুন শক্তি দিয়ে নিজেদের আজব কাণ্ডগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য প্রেতবাদীদের এই প্রচেষ্টা একেবারে অসার্থক। তারা সরাসরি আত্মিক শক্তির কথা বলছেন আর চাইছেন তার। একটা বস্তুগত পরীক্ষা চালাতে।’
সবাই অপেক্ষা করছিলেন কখন উনি শেষ করবেন, লেভিনও টের পাচ্ছিলেন সেটা।
