স্তন্যদাত্রীকে মেয়েটা ফেরত আর তাদের ছুটি দিয়ে তিনি বার করলেন একটা পদক, যাতে প্রায় এই মেয়েটার বয়সেরই একটা পোর্ট্রেট ছিল সেরিওজার। টুপি খুলে উনি অ্যালবাম মেলে ধরলেন টেবিলে যাতে সেরিওজার ফটোগ্রাফ ছিল অন্য নানা বয়সের। ছবিগুলি মিলিয়ে দেখার জন্য তিনি তাদের খুলে নিতে লাগলেন অ্যালবাম থেকে। খুলে নিলেন সব ক’টাই। রইল শুধু একটা সব শেষের সুন্দর ছবিটা। সাদা শার্ট পরে চেয়ারের দু’দিকে পা ঝুলিয়ে বসে চোখ কুঁচকে সে হাসছে। এটা হল সেরিওজার বিশেষ রকমের একটা সুন্দর মুখভাব। ক্ষিপ্র হাতের সরু সরু সাদা সাদা অতি উত্তেজিত আঙুলে তিনি ফটোটার কোণ ধরে খুঁটলেন বার কয়েক, কিন্তু ছবিটা খসে এল না, তিনি নিতে পারলেন না সেটা। টেবিলে কাগজ কাটার ছুরি ছিল না, তিনি নিতে পারলেন না সেটা। টেবিলে কাগজ কাটার ছুরি ছিল না, পাশের ছবিটা (এটা রোমে তোলা ভ্রন্স্কির ফটো, মাথায় গোল টুপি, লম্বা চুল) খসিয়ে তা দিয়ে ছেলের ছবিটা তুলে ফেললেন। ভ্রন্স্কির ছবিটার দিকে চেয়ে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, ও-ই!’ আর হঠাৎ মনে পড়ল যে সেই তাঁর বর্তমান দুঃখের কারণ। সারা সকালটা আন্না ওঁর কথা ভাবেননি একবারও। কিন্তু এখন পুরুষোচিত, সম্ভ্রান্ত, তাঁর অতি পরিচিত ও সুমিষ্ট এই মুখখানা দেখে হঠাৎ তাঁর প্রতি ভালোবাসার একটা জোয়ার অনুভব করলেন তিনি।
‘সত্যি, কোথায় সে? আমার দুঃখকষ্টের মধ্যে একলা আমাকে ফেলে রেখে সে থাকে কি করে?’ হঠাৎ একটা অভিযোগ নিয়ে আন্না ভাবলেন, মনে পড়ল না যে নিজেই তিনি তাঁর ছেলের ব্যাপারটা সব চেয়ে রেখেছিলেন তাঁর কাছ থেকে। এক্ষুণি তাঁর কাছে আসার জন্য তিনি লোক পাঠালেন তাঁকে ডাকতে। কি কথায় তিনি তাঁকে সবকিছু বলবেন এবং ভালোবাসার কি বাব নিয়ে তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দেবেন সে কথা ভাবতে ভাবতে তিনি আড়ষ্ট বুকে প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। যাকে পাঠিয়েছিলেন সে লোকটা এই জবাব নিয়ে ফিরল যে ওঁর ঘরে অতিথি, তবে শিগগিরই তিনি আসছেন এবং জিজ্ঞেস করেছেন পিটার্সবুর্গে আগত প্রিন্স ইয়াভিনকে সাথে নিয়ে তিনি আসতে পারেন কিনা। আন্নার মনে হল, ‘একা আসছে না তাহলে, অথচ গতকাল ডিনারের পর থেকে সে আমাকে দেখেনি, এমনভাবে আসছে না যাতে সব কথা বলতে পারি ওকে, আসছে ইয়াভিনের সাথে।’ হঠাৎ একটা ভয়াবহ চিন্তা এল তাঁর মনে : আন্নার প্রতি ভালোবাসা যদি তাঁর চলে গিয়ে থাকে?
এবং ইদানীংকার ঘটনাগুলো ভেবে দেখে তাঁর মনে হল সবকিছুতেই এই ভয়াবহ চিন্তাটার সমর্থন দেখতে পাচ্ছেন তিনি : কাল তিনি বাড়িতে খায়নি, জিদ ধরেছিলেন যে পিটার্সবুর্গে তাঁরা থাকবেন আলাদা আলাদা, এমনকি এখনো তিনি আসছেন একা নয়, যেন চোখাচুখি হতে চাইছেন না।
কিন্তু সে কথা আমাকে ওর বলা উচিত। আমার সেটা জানা দরকার। সেটা যদি আমি জানতে পারি, তাহলে কি আমি করব সেটা আমার জানা আছে’, মনে মনে ভাবলেন তিনি, কিন্তু ভ্রন্স্কির ঔদাসীন্যে নিঃসন্দেহ হয়ে উঠলে কি অবস্থায় তিনি পড়বেন, সেটা অনুমান করার শক্তি তাঁর ছিল না। তিনি ভাবছিলেন যে ভ্রন্স্কির ভালোবাসা মরে গেছে, নিজেকে চরম হতাশার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন বলে মনে হচ্ছিল তাঁর এবং সেই কারণেই নিজে বিশেষ রকমের উদ্দীপিত বোধ করছিলেন। দাসীকে ডেকে গেলেন সাজ ঘরে। পোশাক পরতে গিয়ে নিজের প্রসাধন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সাম্প্রতিক দিনগুলোর চেয়ে বেশি, যেন ভালোবাসা চলে যাবার পর যে গাউন আর কেশসজ্জা তাঁকে মানায় ভালো তার জন্য ভ্রন্স্কি আবার প্রেমে পড়তে পারেন তাঁর।
তৈরি হয়ে উঠতে পারার আগেই তিনি ঘণ্টি শুনলেন। যখন ড্রয়িং-রুমে ঢুকলেন, তখন ভ্রন্স্কি নন, ইয়াভিন তাঁকে স্বাগত করলেন দৃষ্টি দিয়ে। টেবিলে ছেলের যে ছবিটা তিনি ফেলে গিয়েছিলেন সেটা দেখছিলেন ভ্রন্স্কি, আন্নার দিকে চাইবার তাড়া ছিল না তাঁর।
‘আমরা তো পরিচিত’, নিজের ছোট্ট হাতখানা অপ্রতিভ ইয়াভিনের (যেটা তাঁর বিশাল দৈর্ঘ্য ও রুক্ষ মুখের পক্ষে ভারি অদ্ভূত) বিরাট হাতটায় রেখে আন্না বললেন। ‘পরিচিত সেই গত বছরের ঘোড়দৌড়ের সময় থেকে। দিন তো আমাকে’, ছেলের যে ফটোগুলো ভ্রনস্কি দেখছিলেন, ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে তাঁর কাছ থেকে সেগুলো ছিনিয়ে নিয়ে আন্না বললেন এবং জ্বলজ্বলে চোখে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন তাঁর দিকে। ‘এ বছর ঘোড়দৌড় ভালো হয়েছিল? এর বদলে আমি ঘোড়দৌড় দেখি রোমের কর্সোতে। তবে আপনার তো বিদেশের জীবন ভালো লাগে না’, আন্না বললেন সস্নেহে হেসে, ‘আমি আপনার সব কথা জানি, জানি আপনার সমস্ত পছন্দ-অপছন্দ, যদিও আপনার সাথে দেখা হয়েছে সামান্যই।’
‘শুনে দুঃখ হল, কেননা আমার পছন্দগুলো বেশির ভাগই খারাপ’, বাঁ দিককার মোচ কামড়ে ইয়াভিন বললেন।
কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর ভ্রনস্কি ঘড়ি দেখছেন লক্ষ করে ইয়াভিন আন্নাকে জিজ্ঞেস করলেন পিটার্সবুর্গে কত দিন থাকবেন এবং বিশাল শরীরখানা টান করে টুপি নিলেন।
‘মনে হয় বেশি দিন নয়’, এই বলে বিব্রত দৃষ্টিতে তিনি তাকালেন ভ্রন্স্কির দিকে।
‘তাহলে আমাদের আর দেখা হচ্ছে না?’ উঠে দাঁড়িয়ে ইয়াভিন ভ্রন্স্কির দিকে ফিরলেন, ‘কোথায় খাবি তুই?’
