আন্না ঝুঁকলেন তার দিকে।
বললেন, ‘মানিক আমার!’
বিদায় বলতে পারলেন না তিনি, কিন্তু মুখের ভাবে সেটা প্রকাশ পেল এবং সেরিওজাও তা বুঝল। ‘লক্ষ্মী আমার কুতিক’, ও যখন ছোট ছিল তখন আন্না তাকে যা বলে ডাকতো সেই নামটা বললেন তিনি, ‘আমাকে তুই ভুলে যাবি না তো? তুই…’ কিন্তু আর বলতে পারলেন না তিনি।
ওকে যা বলা যেত তেমন কত কথা তাঁর মনে হয়েছে পরে, কিন্তু এখন তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। কিন্তু কি বলতে চাইছিলেন সেটা বুঝল সেরিওজা। সে বুঝল যে মায়ের প্রাণে সুখ নেই আর ভালোবাসেন তাকে। এও সে বুঝতে পারল ধাই-মা কি বলেছেন ফিসফিসিয়ে। একটা কথা তার কানে গিয়েছিল : ‘সব সময় আটটার পরে।’ সে বুঝতে পেরেছিল যে কথাটা পিতাকে নিয়ে এবং মা-বাপের দেখা হওয়া চলে না। এটা সে বুঝেছিল, কিন্তু বুঝতে পারেনি কেন মায়ের মুখে ফুটে উঠল ভীতি আর লজ্জা?… মায়ের কোন দোষ নেই, অথচ ভয় পাচ্ছেন ওঁকে, কিনের জন্য যেন লজ্জা পাচ্ছেন। ভেবেছিল একটা প্রশ্ন করে খটকাটা পরিষ্কার করে নেবে; কিন্তু সাহস হল না : সে দেখতে পাচ্ছিল যে কষ্ট পাচ্ছেন মা, তাঁর জন্য মায়া হচ্ছিল তার। নীরবে সে মায়ের শরীর ঘেঁষে বলল, ‘এখনই যেও না। শিগগির আসবেন না উনি।’
ও যা ভাবছে, তাই বলছে কি, সেটা বোঝার জন্য মা তাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিলেন খানিকটা দূরে আর তার ভীত মুখভাব দেখে বুঝলেন যে শুধু বাপের কথাই বলল না, যেন শুধাচ্ছে বাপ সম্পর্কে কি তার ভাবা উচিত। বললেন, ‘সেরিওজা, সোনা আমার, ভালোবাসা ওঁকে, আমার চেয়ে উনি ভালো, দয়ামায়া আছে বেশি, তাঁর কাছে আমি দোষী। যখন বড় হবে, নিজেই তুমি তখন ভেবে দেখবে।’
‘তোমার চেয়ে ভালো কেউ নেই!…’ পানিভরা চোখে হতাশায় চিৎকার করে সে গলা জড়িয়ে ধরল মায়ের, আকুলতায় কাঁপা কাঁপা হাতে প্রাণপণে মাকে টানতে লাগল নিজের দিকে 1
‘ধন আমার, জাদু আমার!’ শক্তিহীন হয়ে সেরিওজার মতই ছেলেমানুষি কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।
এই সময় দরজা খুলে গেল, ভেতরে ঢুকল ভাসিলি লুকিচ। পদশব্দ শোনা গেল দ্বিতীয় দরজাটার কাছে। ত্রস্ত ফিসফিসানিতে আয়া বলল, ‘আসছেন’, এবং টুপিটা দেওয়া হল আন্নাকে।
বিছানায় লুটিয়ে পড়ল সেরিওজা, ঢুকরে উঠল হাত দিয়ে মুখ ঢেকে। আন্না তার হাত সরিয়ে চোখের পানিতে ভেজা মুখে চুমু খেলেন আরেক বার এবং দ্রুত পায়ে গেলেন দরজার দিকে। সেখানে মুখোমুখি হলেন কারেনিনের। আন্নাকে দেখে তিনি থেমে গিয়ে মাথা নোয়ালেন।
এমাত্র যদিও তিনি বলেছেন যে উনি তাঁর চেয়ে ভালো, দয়ামায়া আছে বেশি, তাহলেও চকিত দৃষ্টিপাতে সমস্ত খুঁটিনাটিতে তাঁর মূর্তিটা দেখে তাঁর প্রতি একটা ঘেন্না, বিদ্বেষ, আর ছেলের জন্য একটা ঈর্ষা আচ্ছন্ন করল আন্নাকে। ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে মুখাবগুণ্ঠন নামিয়ে, পদক্ষেপ বাড়িয়ে, প্রায় দৌড়ে বেরলেন ঘর থেকে।
যে খেলনাগুলি তিনি অত দরদে আর বেদনায় কাল বেছেছিলেন দোকানে, তা বার করার ফুরসৎ আর হল না, ফেরত নিয়ে গেলেন।
একত্রিশ
ছেলের সাথে দেখা করার বাসনাটা আন্নার যত প্রবলই হয়ে থাকুক, তার জন্য তিনি যত দীর্ঘ দিন ভেবেছেন আর তৈরি হয়েছেন, এ সাক্ষাৎ তাঁর মধ্যে এমন যে প্রবল প্রতিক্রিয়া ঘটাবে, তা মোটেই আশা করেননি তিনি। হোটেলে তাঁর নিঃসঙ্গ স্যুটে ফিরে বহুক্ষণ তিনি বুঝতে পারেননি কেন তিনি ওখানে। টুপি না খুলে ফায়ার-প্লেসের কাছে ইজি-চেয়ারে বসলেন তিনি, ভাবলেন, ‘সব চুকে গেল, আবার আমি একা।’ দুই জানলার মাঝখানে টেবিলের ওপর একটা ব্রোঞ্জ ঘড়ির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবনায় ডুবে গেলেন।
বিদেশ থেকে যে ফরাসি দাসীটিকে নিয়ে আসা হয়েছিল, সে এসে পোশাক বদলাতে ডাকল তাঁকে। অবাক হয়ে আন্না তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘পরে।’
চাপরাশি এসে বলল তাঁকে কফি দেবে কি?
‘পরে’, আন্না বললেন।
ইতালিয়ান স্তন্যদাত্রী মেয়েটাকে পোশাক পরিয়ে নিয়ে এল আন্নার কাছে। গোলগাল সুপুষ্ট মেয়েটা বরাবরের মত মাকে দেখে নিচের দিকে যেন সুতায় মোড়া হাত বাড়িয়ে দন্তহীন হাসি হেসে পাখনা মেলা মাছের মত মাড় দেওয়া, ফুল তোলা স্কার্টে ঝাপট মেরে খসখস শব্দ করতে লাগল। খুকির উদ্দেশে না হেসে, চুমু না খেয়ে পারা যায় না, তার দিকে আঙুল না বাড়িয়ে দিয়ে পারা যায় না, যা সে আঁকড়ে ধরতো চিল্লিয়ে, সমস্ত শরীর ঝাঁকিয়ে; নিজের ঠোঁট তার কাছে না ধরে পারা যায় না, যা সে চুমু খাওয়ার মত করে পুরে নিতো মুখের মধ্যে। এ সবই করলেন আন্না, কোলে তুলে নিলেন তাকে, নাচালেন, চুমু খেলেন তার তাজা গালে, অনাবৃত কনুইয়ে; কিন্তু এই শিশুটিকে দেখে তাঁর কাছে আরও পরিষ্কার হয়ে গেল যে সেরিওজার জন্য তাঁর যা টান, তার তুলনায় এই মেয়েটার প্রতি তাঁর স্নেহ স্নেহই নয়। মেয়েটার সবই মিষ্টি, কিন্তু কেন জানি আন্নার মন কাড়তে পারছিল না সে। প্রথম সন্তানটি যাঁর ঔরসজাত তাঁকে তিনি ভালো না বাসলেও সব ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলেন তার ওপর, যা পরিতৃপ্তির পথ পাচ্ছিল না; মেয়েটার জন্ম হয় অতি কঠিন অবস্থার মধ্যে, প্রথম সন্তানটির জন্য যে যত্ন হয়েছিল তার শতাংশও ঘটেনি তার ক্ষেত্রে। তা ছাড়া মেয়েটার সবকিছুই এখনো আশার গণ্ডিতে, অথচ সেরিওজা প্রায় মানুষ হয়ে উঠেছে, প্রিয়পাত্র মানুষ; তার ভেতর ইতিমধ্যে ভাবনা আর অনুভূতির ঢেউ উঠেছে, সে তাঁকে বোঝে, ভালোবাসে, বিচার করে দেখে—তার কথা আর দৃষ্টি স্মরণ করে আন্না ভাবলেন। আর তিনি চিরকালের জন্য তার কাছ থেকে শুধু দৈহিকভাবে নয়, আত্মিক দিক থেকেও বিচ্ছিন্ন আর তার সুরাহা করার উপায় নেই।
