‘আমাকে ছাড়া কেমন করে পোশাক পরিস তুই? কেমন করে…’ সহজভাবে আনন্দ করে বলতে চেয়েছিলেন তিনি কিন্তু পারলেন না, আবার তিনি মাথা ঘুরিয়ে নিলেন।
‘ঠাণ্ডা পানিতে আমি হাত-মুখ ধুই না, বাবা মানা করেছেন। আচ্ছা, ভাসিলি লুকিচকে তুমি দেখোনি? ও আসবে এখন। কিন্তু তুমি বসেছ আমার পোশাকের ওপর!’
বলে খিলখিল করে হেসে উঠল সেরিওজা। আন্না ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
‘মাগো, মা-মণি, লক্ষ্মীটি আমার!’ আবার তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল সেরিওজা। যেন আন্নার হাসি দেখে কেবল এখনই সে পরিষ্কার বুঝতে পারল কি ঘটেছে। ‘ওটা খুলে রাখো’, আন্নার মাথা থেকে টুপিটা খুলে নিল সে। তারপর বিনা টুপিতে তাঁকে যেন নতুন করে দেখতে পেয়ে আবার চুমু খেতে লাগল সে।
‘কিন্তু আমার সম্পর্কে কি ভেবেছিলি? ভাবিসনি যে আমি মারা গেছি।’
‘কখনো তা বিশ্বাসই করিনি।’
‘বিশ্বাস করিসনি, সোনা আমার?’
‘আমি জানতাম, আমি জানতাম!’ নিজের প্রিয় বুলিটির পুনরাবৃত্তি করতে লাগল সে, আর আন্নার যে হাতখানা তার মাথায় বুলিয়ে আদর করছিল, সেটা টেনে নিজের মুখে চেপে ধরে চুমু খেতে লাগল
আন্না কারেনিনা – ৫.৩০
ত্রিশ
ইতিমধ্যে ভাসিলি লুচি যে প্রথমটা বুঝতে পারেনি মহিলাটি কে এবং এখন কথাবার্তা থেকে জানতে পারল ইনিই সেই মা যিনি স্বামীকে ত্যাগ করে গেছেন, যাঁকে সে দেখেনি কারণ এ বাড়িতে সে কাজে ঢুকেছে উনি গৃহত্যাগ করার পর, এখন সে সন্দেহের মধ্যে পড়ল ঘরে ঢুকবে নাকি কারেনিনকে খবর দেবে। শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট একটা সময়ে সেরিওজাকে জাগিয়ে দেওয়া তার কর্তব্য, সুতরাং কে বসে আছেন মা না অন্য কেউ তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তার কর্তব্য পালন করে যাওয়া দরকার এটা বুঝে সে পোশাক পরে নিয়ে গেল দরজা খুলতে।
কিন্তু মা আর ছেলের সোহাগ, তাদের কণ্ঠস্বর আর যে কথা তারা বলছিল তাতে তার সংকল্প পরিবর্তন করতে হল। মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা ভেজিয়ে দিল সে। কেশে চোখের পানি মুছে মনে মনে সে ভাবল, ‘আরো দশ মিনিট অপেক্ষা করা যাক।’
এই সময় বাড়ির চাকরবাকরদের মধ্যে খুব একটা আলোড়ন চলছিল। সবাই জেনে গিয়েছিল যে কর্ত্রী এসেছেন, কাপিতোনিচ তাঁকে ঢুকতে দিয়েছে, এখন তিনি আছেন শিশুকক্ষে, অথচ কর্তা নিজে রোজ আটটার পরে আসেন সেখানে, এবং সবাই বুঝতে পারছিল যে স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাৎ হতে দেওয়া চলে না, বাধা দিতে হবে তাতে। পোশাক- বরদার কর্নেই পোর্টারদের ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে কে ওঁকে আসতে দিয়েছে এবং কিভাবে। কাপিতোনিচ তাঁকে আসতে দিয়েছে এবং ঘরেও পৌঁছে দিয়েছে জেনে বুড়োকে বকুনি দেয়। পোর্টার একগুঁয়ের মত চুপ করে রইল, কিন্তু কর্নেই যখন বলল যে এর জন্য তাকে তাড়িয়ে দেওয়া উচিত, কাপিতোনিচ তখন কর্নেইয়ের মুখের সামনে হাত নেড়ে বলে দিলে : ‘হ্যাঁ, তুমি হলে ঢুকতে দিতে না বৈকি! দশ বছর এখানে কাজ করছি, ভালো ছাড়া মন্দ কিছু দেখিনি আর এখন কিনা গিয়ে বলবে : ভাগুন দয়া করে! স্বার্থজ্ঞান তোমার টনটনে! বুঝলে? কর্তার রেকুন কোট কিভাবে হাতড়াও সেটা একটু মনে করে দেখলে পারতে!’
‘আরে আমার ধর্মপুত্র!’ তাচ্ছিল্যভরে বলল কর্নেই; আয়া ভেতরে ঢুকতে তার দিকে ফিরল সে। ‘আপনিই বলুন মারিয়া এফিমোভনা : ঢুকতে দিয়েছে, কাউকে কিছু বলেনি’, ধাইকে বলল কর্নেই, ‘এক্ষুণি বেরোবেন কারেনিন, খোকার ঘরে যাবেন।
‘কি কাণ্ড!’ আয়া বলল, ‘আপনি বরং ওঁকে, কর্তাকে কোনরকমে আটকে রাখুন কর্নেই ভাসিলিয়েভিচ, আমি যাচ্ছি কর্ত্রীর কাছে, কোনরকমে ওঁকে সরিয়ে দেব। কি কাণ্ড! মাগো!’
আয়া যখন শিশুকক্ষে ঢুকল, সেরিওজা তখন মাকে বলছিল কিভাবে সে আর নাদেঙ্কা ঢিপি থেকে পিছলে নামতে গিয়ে তিনবার ডিগবাজি খেয়েছে। আন্না শুনছিলেন তার কণ্ঠস্বর, দেখছিলেন তার মুখ, মুখভাবের চাঞ্চল্য, স্পর্শ করছিলেন তার হাত, কিন্তু কি সে বলছে বুঝতে পারছিলেন না। চলে যাওয়া দরকার, ওকে ছেড়ে যাওয়া দরকার— শুধু এই একটা কথাই তিনি ভাবছিলেন ও অনুভব করছিলেন। দরজার দিকে এগিয়ে আসা ভাসিলি লুকিচের পদশব্দ আর কাশির আওয়াজ কানে গিয়েছিল তাঁর, আয়ার পায়ের শব্দও শুনতে পাচ্ছিলেন তিনি; কিন্তু শিলীভূতের মত তিনি বসে রইলেন, কথা বলার, উঠে দাঁড়াবার শক্তি তাঁর ছিল না।
আন্নার কাছে গিয়ে তাঁর হস্ত ও স্কন্ধ চুম্বন করে আয়া বলল, ‘লক্ষ্মীটি আমার, আমাদের খোকার জন্মদিনে কি যে আনন্দ পাঠালেন সৃষ্টিকর্তা। আপনার চেহারা তো একইরকম আছে দেখছি।
‘ওহ্ ধাই-মা, লক্ষ্মীটি আমার, আমি জানতাম না যে আপনি এ বাড়িতে’, এক মুহূর্তের জন্য সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললেন আন্না।
‘এখানে থাকি না, আছি মেয়ের সাথে। এসেছি অভিনন্দন জানাতে, আন্না আর্কাদিয়েভনা!’
হঠাৎ কেঁদে ফেলল আয়া, আবার হস্তচুম্বন করতে থাকল তাঁর।
হেসে চোখ জ্বলজ্বল করে সেরিওজা এক হাতে মা, অন্য হাতে ধাইমাকে ধরে গালিচার ওপর দাপাদাপি করতে লাগল পুরুষ্টু পায়ে। মায়ের প্রতি ধাই-মায়ের কোমলতায় উল্লসিত হয়েছিল সে।
‘মা, উনি প্রায়ই আমার কাছে আসেন, আর যখন আসেন…’ সেরিওজা বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু মাকে ধাই- মা ফিসফিসিয়ে কি যেন বলল আর মায়ের মুখে ফুটে উঠল ভীতি আর কেমন একটা লজ্জার ভাব, যা তাঁকে মানায় না, এই দেখে থেমে গেল।
