ওর কথাগুলো আন্নার কানে যায়নি, কোন জবাব দিলেন না তিনি।
অপরিচিতার বিব্রত অবস্থা দেখে কাপিতোনিচ নিজেই তাঁর কাছে এসে দরজা খুলে ঢুকতে দিয়ে জিজ্ঞেস করল কি তাঁর চাই।
আন্না বললেন, ‘প্রিন্স স্করোদুমোভের কাছ থেকে আসছি সের্গেই আলেকসেইচের কাছে।’
‘উনি এখনো ওঠেননি’, মনোযোগ দিয়ে আন্নাকে লক্ষ করে পোর্টার বলল।
আন্না একেবারেই ভাবেননি যে নয় বছর যে বাড়িটায় তিনি বাস করে গেছেন তার একেবারেই অপরিবর্তিত প্রবেশ-কক্ষ তাঁকে বিচলিত করবে এতখানি। আনন্দের আর কষ্টের একের পর এক স্মৃতি জেগে উঠল মনে, মুহূর্তের জন্য তাঁর স্মরণ হল না কেন তিনি এখানে।
তাঁর ওভারকোট খুলতে খুলতে কাপিতোনিচ বলল, ‘অপেক্ষা করবেন কি?’
আর ওভারকোট খোলার সময় তাঁর মুখের দিকে চেয়ে কাপিতোনিচ চিনতে পারল তাঁকে, নীরবে সে কুর্নিশ করল নিচু হয়ে
বলল, ‘আজ্ঞা হয় হুজুরানি।’
কি-একটা যেন বলতে চেয়েছিলেন আন্না, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। বৃদ্ধের দিকে দোষী-দোষী অনুরোধে একটা দৃষ্টিতে চেয়ে তিনি লঘু পদক্ষেপে দ্রুত উঠতে লাগলেন সিঁড়ি দিয়ে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে সিঁড়ির পৈঠায় জুতা লটকিয়ে কাপিতোনিচ ছুটল তাঁর পাল্লা ধরতে।
‘মাস্টার সাহেব আছেন ওখানে, হয়ত পোশাক পরা হয়নি এখনো। আমি খবর দিচ্ছি।’
বৃদ্ধ কি বলল সেটা বুঝতে না পেরে পরিচিত সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই থাকলেন আন্না।
‘এদিকে, বাঁয়ে আজ্ঞা। মাপ করবেন যে অপরিষ্কার। উনি আছেন আগে যেটা ছিল বৈঠকখানা, সেখানে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল পোর্টার; ‘একটু সবুর করুন হুজুরানি, আমি দেখে আসি’, এই বলে সে পেল্লায় দরজাটা খুলে অন্তর্ধান করলে তার পেছনে। থেমে গিয়ে আন্না অপেক্ষা করতে লাগলেন। ‘এইমাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন’, ফিরে এসে পোর্টার বলল।
পোর্টার যখন এই কথা বলল, সেই মুহূর্তে আন্নার কানে এল শিশুর হাই তোলার শব্দ। এই হাইটা থেকেই আন্না চিনতে পারলেন তাঁর ছেলেকে, তাকে যেন জীবন্ত দেখতে পেলেন তাঁর সামনে।
‘যেতে দাও, যেতে দাও, বাপু!’ বলে আন্না ঢুকে গেলেন পেল্লায় দরজাটার ভেতর দিয়ে। দরজার ডান দিকে একটা খাট, সেখানে শুধু একটা বোতাম খোলা কামিজ পরে বসে আছে একটি খোকা, শরীর বাঁকিয়ে সে হাই তোলাটা শেষ করছে। ঠোঁট দুটো বুজে আসতেই তাতে ফুটে উঠল পরমানন্দের ঘুম-ঘুম হাসি, আর হাসি নিয়েই ধীরে ধীরে সে মাধুর্যভরে ফের শুয়ে পড়ল।
নিঃশব্দে তার কাছে গিয়ে ফিসফিস করলেন আন্না, ‘সেরিওজা!’
ওর সাথে বিচ্ছেদের সময়টায় এবং ইদানীং তাঁর যে স্নেহ উথলে উঠেছিল তখন আন্না তাকে কল্পনা করতেন চার বছরের খোকা হিসেবে, যে বয়সটায় তাকে সবচেয়ে ভালোবেসেছিলেন তিনি। ওকে তিনি যে চেহারায় রেখে গিয়েছিলেন, এখন সে আর তেমন নয়; চার বছর ছাড়িয়ে অনেক এগিয়ে গেছে সে, আরো বড় আর রোগা হয়েছে। কি ব্যাপার? কি রোগা ওর মুখখানা, কি ছোট ছোট চুল! কি লম্বা হাত! ওকে যখন তিনি রেখে যান তার পর থেকে কি বদলিয়ে গেছে সে! কিন্তু এ সে-ই, ওই তো তার মাথার গড়ন, তার ঠোঁট, তার নরম গলা, চওড়া কাঁধ।
‘সেরিওজা!’ একেবারে তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে আবার ডাকলেন আন্না।
কনুইয়ে ভর দিয়ে সে উঠে বসল, কি যেন খুঁজতে গিয়ে এলোচুল মাথাটা ফেরাল এদিক-ওদিক, চোখ মেলল। চুপচাপ সম্প্রশ্ন দৃষ্টিতে সে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তার সামনে দণ্ডায়মান নিশ্চল মায়ের দিকে, তারপর হঠাৎ পরম সুখের হাসি মুদে আসা চোখ বুজে সে লুটিয়ে পড়ল বিছানায় নয়, মায়ের কোলে।
‘সেরিওজা! মিষ্টি খোকা আমার!’ দম বন্ধ করে দুই হাতে তার নধর দেহটা জড়িয়ে ধরে আন্না বললেন।
‘মা!’ দেহের নানা জায়গায় তাঁর হাতের ছোঁয়া পাবার জন্য তাঁর বাহুবন্ধনের মধ্যে আঁকুপাঁকু করে বলল সেরিওজা। তখনো চোখ বুজে, ঘুম-ঘুম হাসি নিয়ে সে খাটের পেছন থেকে গোলগাল হাতে গলা জড়িয়ে ধরল তাঁর, ঘেঁষে এল তাঁর বুকে, শুধু শিশুদের ক্ষেত্রেই যা হয় তেমন একটা সুমধুর নিদ্রালু ঘ্রাণ আর উত্তাপে আন্নাকে আচ্ছন্ন করে মুখ ঘষতে লাগল তাঁর কাঁধে আর গলায়।
‘আমি জানতাম’, চোখ মেলে সে বলল, ‘আজ আমার জন্মদিন। জানতাম তুমি আসবে। এক্ষুণি আমি উঠছি।’
এই বলে সে ঘুমে ঢলে পড়ল।
তৃষিতের মত আন্না দেখছিলেন তাকে; দেখছিলেন তাঁর অনুপস্থিতিতে কত বড় হয়েছে সে, বদলিয়ে গেছে। লেপের তল থেকে বেরিয়ে আসা তার এখনকার দীর্ঘ নগ্ন পা তিনি চিনতে পারছিলেনও বটে, আবার পারছিলেনও না, চিনতে পারলেন ওই শীর্ণ গাল, চাঁদিতে ছোট করে ছাঁটা চুলের কুণ্ডলী, যেখানে প্রায়ই চুমু খেতেন তিনি। এ সবই তিনি হাত বুলিয়ে দেখলেন, কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না; কান্নার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল তাঁর।
‘মা, কাঁদছ কেন?’ সম্পূর্ণ জেগে উঠে সেরিওজা বলল, ‘কাঁদছ কেন মা?’ সে চেঁচিয়ে উঠল কান্না-মাখা গলায়। ‘আমি? না, কাঁদব না… কাঁদছি আনন্দে। কতদিন তোকে দেখিনি। না, কাঁদব না, কাঁদব না’, কান্নাটা গিলে ফেলে মুখ ফিরিয়ে বললেন আন্না, ‘তোর এখন পোশাক পরার সময়’, নিজেকে সামলে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে যোগ করলেন তিনি কিন্তু ছেলের হাত না ছেড়ে দিয়ে উনি বসলেন খাটের কাছে চেয়ারটায় যেখানে পাট করা ছিল সেরিওজার পোশাক।
