ইতিমধ্যেই তাঁর দু’দিন কেটেছে পিটার্সবুর্গে। ছেলের ভাবনা তাঁর মুহূর্তের জন্যও থামেনি, অথচ এখনো দেখা হল না তার সাথে। সরাসরি বাড়ি যাওয়া যেখানে কারেনিনের সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে, তার কোন অধিকার নেই বলে তাঁর মনে হচ্ছিল। তাঁকে ঢুকতে না দিতে পারে, অপমান করতে পারে। স্বামীর কাছে চিঠি লিখে একটা যোগাযোগ করা—এ চিন্তা ছিল কষ্টকর, শান্তিতে তিনি থাকতে পারতেন কেবল যখন স্বামীর কথা না ভাবতে হত। ছেলে কখন, কোথায় বেড়াতে যায় জেনে নিয়ে সেই সময় তাকে দেখার কথায় মন উঠছিল না তাঁর; এই সাক্ষাৎটার জন্য মনে মনে কত তৈরি হয়েছে তিনি, কত কথা তাকে বলার আছে, কি ইচ্ছেই না করছে তাকে আলিঙ্গন করতে, চুম্বন করতে। সেরিওজার পুরনো ধাই-মা তাঁকে সাহায্য করতে, পরামর্শ দিতে পারত। কিন্তু কারেনিনের বাড়িতে সে আর ছিল না তখন। এই সমস্ত দোদুল্যমানতা আর ধাই-মাকে খুঁজে বার করার চেষ্টায় কেটে গেল দুই দিন।
কারেনিনের সাথে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার ঘনিষ্ঠতার কথা জানতে পেরে তৃতীয় দিন বহু কষ্টে আন্না স্থির করলেন ওঁকেই চিঠি লিখবেন, যাতে ইচ্ছে করেই তিনি বলেন যে ছেলেকে দেখবার জন্য অনুমতি নির্ভর করছে স্বামীর মহানুভবতার ওপর। তিনি জানতেন যে চিঠিটা তাঁকে দেখানো হলে নিজের মহানুভবতার ভূমিকা চালিয়ে যাবার জন্য তিনি অনুমতিদানে আপত্তি করবেন না।
হোটেলের যে লোকটি চিঠি নিয়ে গিয়েছিল, সে আন্নার কাছে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও অপ্রত্যাশিত এই উত্তর আনল যে উত্তর দেওয়া হবে না। লোকটিকে ডেকে তার কাছ থেকে আন্না যখন শুনছিলেন কিভাবে সে অপেক্ষা করেছে তার বিশদ বৃত্তান্ত এবং তাকে কিভাবে বলা হল : ‘কোনো উত্তর দেওয়া হবে না’, সে মুহূর্তের মত অত অপমানিত আন্না বোধ করেননি কখনো। নিজেকে অপমানিত, লাঞ্ছিত বোধ করছিলেন আন্না কিন্তু এও বুঝতে পারছিলেন যে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা ঠিকই করেছেন। দুঃখটা তাঁর আরো বেশি হল এই জন্য যে তিনি একাকী। ভ্রন্স্কিকে তিনি এ কথা বলতে পারেন না, বলতে চানও না। তিনি জানতেন যে ভ্রন্স্কি তাঁর দুঃখের প্রধান কারণ হলেও ছেলের সাথে আন্নার দেখা করাটা তাঁর কাছে অতি গুরুত্বহীন বলে মনে হবে। তিনি জানতেন যে তাঁর কষ্টের সমস্ত গভীরতা হৃদয়ঙ্গম করতে তিনি অক্ষম। তিনি জানতেন, ব্যাপারটা বলল যে নিরুত্তাপ সুরে তিনি কথা কইবেন, তাতে তাঁর সম্পর্কে ঘৃণা হবে আন্নার। আর দুনিয়ায় এটাই তিনি ভয় করতেন সবচেয়ে বেশি, তাই যে ব্যাপারগুলো ছেলেকে নিয়ে, তা সব চেপে রাখতেন তাঁর কাছ থেকে
সারা দিন ঘরে বসে থেকে তিনি শুধু ভাবলেন কি করে দেখা করা যায় ছেলের সাথে। শেষ পর্যন্ত স্থির করলেন স্বামীকে চিঠি লিখবেন। চিঠির বয়ান তিনি ঠিক করে এনেছেন এমন সময় তিনি পেলেন লিদিয়া ইভানোভনার চিঠি। কাউন্টেসের নিরুত্তরতা তিনি মেনে নিয়েছিলেন, সামলে উঠেছিলেন, কিন্তু এই চিঠিটা, চিঠির ছত্রগুলোর মধ্যে তিনি যা পড়লেন তাতে তাঁর পিত্তি এত জ্বলে গেল, তাঁর ন্যায্য, প্রবল পুত্রস্নেহের বিপরীতে এই আক্রোশটা তাঁর কাছে এত জঘন্য লাগল যে তিনি নিজেকে আর দোষী জ্ঞান না করে ক্ষেপে উঠলেন অন্যদের বিরুদ্ধে।
মনে মনে তিনি বললেন, ‘এই অনুভূতিহীনতা অনুভূতির ভান মাত্র। ওদের দরকার কেবল আমাকে অপমান করা আর ছেলেটাকে কষ্ট দেওয়া, আমি তা মেনে নেব! কিছুতেই নয়! ও আমার চেয়ে খারাপ। আমি অন্তত মিথ্যে কথা বলি না।’ এবং তৎক্ষণাৎ তিনি স্থির করলেন যে কাল, সেরিওজার জন্মদিনে তিনি সোজাসুজি চলে যাবেন স্বামীর বাড়িতে, চাকরবাকরদের ঘুষ দেবেন, প্রতারণা করবেন, যে করেই হোক ছেলেকে দেখবেন, আর যে বিকট মিথ্যে দিয়ে ওঁরা তাকে ঘিরেছেন চূর্ণ করবেন সেটা।
খেলনার দোকানে গেলেন তিনি, কয়েকটা খেলনা কিনলেন, ভাবতে লাগলেন কর্মপদ্ধতি। খুব ভোরে যাবেন তিনি, সকাল আটটায়, যখন কারেনিন নিশ্চিতই শয্যা ত্যাগ করেননি। হাতে তাঁর টাকা থাকবে, যা দেবেন পোর্টার ও চাপরাশিকে, যাতে তারা ঢুকতে দেয় তাঁকে, মুখাবগুণ্ঠন না তুলে বলবেন যে তিনি আসছেন সেরিওজার ধর্মপিতার কাছ থেকে অভিনন্দন জানাতে, ছেলের বিছানার কাছে কিছু খেলনা রেখে আসার ভার দেওয়া হয়েছে তাঁকে। শুধু ছেলেকে কি বলবেন সে কথাগুলো তিনি ভেবে উঠতে পারেননি। যতই ভাবুন, কিছুই দাঁড়াচ্ছিল না।
পরের দিন সকাল আটটায় তিনি ছ্যাকড়া গাড়ি থেকে নামলেন একা, তাঁর ভূতপূর্ব বাড়ির সদর দরজায় ঘন্টি দিলেন।
‘দেখ তো কি দরকার। মনে হচ্ছে কে একজন মহিলা’, বলল কাপিতোনিচ, তখনো পোশাক পরা হয়নি, তার, গায়ে একটা ওভারকোট আর পায়ে জুতা চাপিয়ে সে জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখল অবগুণ্ঠন নামিয়ে এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে।
পোর্টারের সহকারী আন্নার অপরিচিত এক ছোকরা দরজা খুলতেই আন্না ভেতরে ঢুকে গেলেন, মাফ থেকে তিন রুলের একটা নোট বার করে তাড়াতাড়ি গুঁজে দিলেন তার হাতে।
‘সেরিওজা… সের্গেই আলেক্সেইচ…’ বলে তিনি এগিয়ে যাবার উপক্রম করলেন। নোটটা তাকিয়ে দেখে পোর্টারের সহকারী তাঁকে থামাল কাঁচের দ্বিতীয় দরজাটার কাছে।
জিজ্ঞেস করল, ‘কাকে চাই আপনার?’
