পিটার্সবুর্গ সমাজের প্রথম যে মহিলাদের সাথে ভ্রন্স্কির সাক্ষাৎ হয়, তিনি হলেন তাঁর সম্পর্কিতা বোন বেত্সি। সানন্দে তিনি স্বাগত করলেন তাঁকে, ‘যাক বাবা! এলেন শেষ পর্যন্ত। আর আন্না? কি যে আনন্দ হচ্ছে! কোথায় উঠেছেন? আপনাদের রমণীয় ভ্রমণের পর আমাদের পিটার্সবুর্গ যে আপনাদের কাছে কি বিছ্ছিরি লাগছে তা বেশ কল্পনা করতে পারছি। কল্পনা করছি রোমে আপনাদের মধুমাস। বিবাহবিচ্ছেদের কি হল? সব ঠিকঠাক?’
ভ্রন্স্কি লক্ষ করলেন যে, বিবাহবিচ্ছেদ এখনো হয়নি জেনে কি-রকম হ্রাস পেল বেত্সির উচ্ছ্বাস।
বললেন, ‘লোকে আমাকে ঢিল ছুঁড়বে, কিন্তু আন্নার কাছে আমি যাব, অবশ্য-অবশ্যই যাব। আপনারা এখানে কত দিন আছেন?’
আর সত্যি, সেই দিনই তিনি যান আন্নার কাছে, কিন্তু গলার সুরটা ছিল না আগের মত। স্পষ্টতই নিজের সাহসিকতায় গর্ববোধ করছিলেন তিনি এবং চাইছিলেন যেন আন্না তাঁর বন্ধুত্বের কদর করেন। ছিলেন মিনিট দশেকের বেশি নয়, সমাজের খবরাখবর দিয়ে যাবার আগে বললেন, ‘বিবাহবিচ্ছেদটা কবে হচ্ছে বললেন না কিন্তু। আমি নয় পরোয়া করি না কিন্তু বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য কাঠখোট্টারা আপনাদের কাছে থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ওটা আজকাল খুব সহজ। সাধারণ ব্যাপার, আপনারা শুক্রবার চলে যাচ্ছেন? দুঃখের কথা যে আমাদের আর দেখা হচ্ছে না।’
বেত্সির কথার ধরন থেকে ভ্রন্স্কির বোঝা উচিত ছিল সমাজ কি মনোভাব নেবে তাঁর সম্পর্কে, কিন্তু নিজের পরিবারের মধ্যে আরেকবার চেষ্টা করে দেখলেন। মায়ের ওপর তাঁর কোন ভরসা ছিল না। তিনি জানতেন যে, প্রথম পরিচয়ের সময় মা আন্নাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও পুত্রের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার কারণ হওয়ায় এখন তিনি আন্নার উপর হবেন নির্মম। কিন্তু ভ্রাতৃবধূ ভারিয়ার ওপর খুবই ভরসা করেছিলেন তিনি। তাঁর মনে হয়েছিল যে ভারিয়া ঢিল ছুঁড়বেন না। সহজসরলভাবে দৃঢ়তার সাথে তিনি আন্নার কাছে যাবেন এবং স্বগৃহে বরণ করবেন তাঁকে।
আসার পরের দিনই ভ্রন্স্কি যান তাঁর কাছে এবং তাঁকে একা পেয়ে নিজের বাসনা প্রকাশ করেন।
ভ্রন্স্কির কথা সব শুনে তিনি বললেন, ‘তুমি জানো আলেকসেই তোমাকে কত ভালোবাসি আমি, তোমার জন্য সবকিছু করতে আমি রাজি, কিন্তু চুপ করে ছিলাম, কেননা জানতাম যে তোমার আর আন্না আর্কাদিয়েভনার কোন উপকারে লাগব না’, ‘আন্না আর্কাদিয়েভনা’ নামটা তিনি উচ্চারণ করলেন বিশেষ জোর দিয়ে। ‘ভেবো না আমি নিন্দে করছি। কখনো করিনি; ওঁর জায়গায় আমি হলে একই কাজ করতাম। খুঁটিনাটি কথায় আমি যাচ্ছি না, যেতে পারি না’, ভ্রন্স্কির বিমর্ষ মুখের দিকে ভীরু দৃষ্টিপাত করে তিনি বললেন, ‘কিন্তু যে জিনিসের যা নাম, সেটা স্পষ্ট বলা উচিত তুমি চাও যে আমি ওঁর কাছে যাই, বাড়িতে ডাকি, আর তাতে করে সমাজে সুনাম ফিরবে তাঁর। কিন্তু এটা আমি যে করতে পারি না তা বুঝতে পারছ? মেয়ে আমার বড় হচ্ছে, সমাজে আমাকে থাকতে হবে আমার স্বামীর জন্য। বেশ, আমি নয় গেলাম আন্না আর্কাদিয়েভনার কাছে; উনি বুঝবেন যে নিজের বাড়িতে আমি ডাকতে পারি না ওঁকে, কিংবা এমনভাবে ডাকব যাতে অন্যভাবে যারা ব্যাপারটা দেখে তাদের সাথে সাক্ষাৎ না হয় : তাতে অপমানিত হবেন উনি। আমি তো তাঁকে ওপরে তুলতে পারি না…’
‘হ্যাঁ, শত শত যে নারীদের আপনি স্বাগত করেন তাদের চেয়ে আন্না নিচে নেমে গেছেন বলে আমি মনে করি না’, আরও বিমর্ষ মুখে কথায় বাধা দিলেন ভ্রন্স্কি এবং ভ্রাতৃবধূর সিদ্ধান্ত যে অটল সেটা বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ালেন নীরবে।
‘আলেক্সেই, রাগ করো না আমার ওপর। বুঝে দেখো ভাই যে আমার দোষ নেই’, ভীরু ভীরু হাসি নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন ভারিয়া।
‘তোমার ওপর রাগ আমি করছি না’, একইরকম বিমর্ষভাবে বললেন ভ্রন্স্কি, কিন্তু এতে আমার কষ্ট হচ্ছে দ্বিগুণ। কষ্ট হচ্ছে এজন্য যে আমাদের বন্ধুত্ব ঘুচে গেল। ঘুচে না গেলেও অন্তত ক্ষীণ হয়ে পড়ল। তুমি বুঝতে পারছ যে আমার পক্ষে এ ছাড়া হত্যন্তর নেই।’
এই বলে চলে গেলেন উনি।
ভ্রন্স্কি বুঝতে পেরেছিলেন যে আর চেষ্টা করে লাভ নেই। পিটার্সবুর্গে এ ক’টা দিন কাটিয়ে দিতে হবে যেন পরের শহরে, আগেকার জগৎটার সাথে সর্ববিধ যোগাযোগ এড়িয়ে, যাতে তাঁর পক্ষে যা অত্যন্ত মর্মান্তিক তেমন কষ্ট ও হীনতা সইতে না হয়। পিটার্সবুর্গের প্রধান একটা বিশ্রী ব্যাপার ছিল এই যে কারেনিন এবং তাঁর নাম যেন সর্ব বিরাজমান। যে কোন বিষয় নিয়ে কথা শুরু হোক না কেন, কারেনিনের প্রসঙ্গে না উঠে যেত না; এমন কোথাও যাবার জায়গা ছিল না, যেখানে তাঁর সাথে দেখা না হওয়া সম্ভব। অন্তত ভ্রন্স্কির তাই মনে হচ্ছিল, যেভাবে জখম আঙুল থাকলে লোকের মনে হয় যে সবকিছুই যেন ঐ জখম আঙুলটায় খোঁচা দিচ্ছে ইচ্ছে করেই।
পিটার্সবুর্গে দিন কাটানো ভ্রন্স্কির কাছে আরো দুঃসহ মনে হচ্ছিল, কারণ আন্নার মধ্যে এসময় নতুন কি-একটা দুর্বোধ্য মনোবৃত্তি দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। কখনো আন্না যেন তাঁকে ভালোবাসছে, কখনো আবার নিরুত্তাপ, তিতিবিরক্ত, দুর্বোধ্য। কিসে তিনি যেন কষ্ট পাচ্ছিলেন আর সেটা ঢেকে রাখছিলেন ভ্রন্স্কির কাছ থেকে, যে আঘাতগুলো ভ্রন্স্কির জীবন বিষিয়ে তুলছে, সূক্ষ্ম বোধের ফলে যা আন্নার পক্ষে আরো বেশি যন্ত্রণাদায়ক হবার কথা, তা যেন আন্না খেয়ালই করছিলেন না।
ঊনত্রিশ
আন্নার রাশিয়ায় আসার একটা উদ্দেশ্য ছিল ছেলেকে দেখা। ইতালি ছাড়ার দিনটা থেকে দেখা করার এই চিন্তাটা তাঁকে কেবলি অস্থির করেছে। আর যত কাছিয়ে এসেছেন পিটার্সবুর্গের দিকে, সাক্ষাতের এই আনন্দ আর তাৎপর্য হয়ে উঠেছে ততই বেশি। দেখা করা যায় কিভাবে নিজেকে সে প্রশ্ন তিনি আর করছিলেন না। তাঁর মনে হচ্ছিল ছেলের সাথে যখন একই শহরে থাকবেন তখন বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে হঠাৎ একটা পরিষ্কার ধারণা হল তাঁর এবং বুঝলেন যে দেখা করাটা হবে কঠিন 1
