বয়স ওর নয় বছর, এখনো সে শিশু; কিন্তু নিজের প্রাণটাকে সে জানত, সেটা ছিল তার কাছে বড়, আঁখিপল্লব যেমন চোখকে আগলে রাখে, তেমনি নিজের প্রাণটাকে আড়াল করে রাখত সে, ভালোবাসার চাবি ছাড়া সেখানে প্রবেশ ছিল না কারো। শিক্ষক নালিশ করতেন যে শিখতে সে চায় না মোটেই, অথচ জ্ঞানের তৃষ্ণায় প্রাণ ছিল তার পরিপূর্ণ। শিক্ষক নয়, কাপিতোনিচ, ধাই-মা, নাদেঙ্কা, ভাসিলি লুকিচের কাছ থেকে সেই জ্ঞান সঞ্চয় করতো সে। যে জলস্রোতে পিতা আর শিক্ষক চাইছিলেন তাঁদের পানি কলের চাকা ঘোরাতে, সেটা অনেকদিন আগেই চুইয়ে গিয়ে কাজ করছে অন্য জায়গায়।
লিদিয়া ইভানোভনার বোনঝি নাদেঙ্কার কাছে যাবার অনুমতি না দিয়ে পিতা তাকে শাস্তি দিলেন। কিন্তু শাস্তিটা হল শাপে বর। ভাসিলি লুকিচের মেজাজ ভালো ছিল, হাওয়াই কল কি করে বানাতে হয় তা সে দেখাল তাকে। সারা সন্ধেটা এই নিয়ে কাজে আর হাত দিয়ে তার পাখনা ধরে অথবা পাখনার সাথে নিজেকে বেঁধে নিয়ে ঘুরপাক খাওয়া যাবে, তেমন হাওয়াই কল কি করে বানানো যায় তার স্বপ্নে। সারা সন্ধ্যে মায়ের কথা সেরিওজার মনে পড়েনি, কিন্তু বিছানায় শুতেই হঠাৎ মনে পড়ল আর নিজের ভাষায় সে প্রার্থনা করল, কাল, তার জন্ম দিনে মা যেন আর লুকিয়ে না থেকে আসে তার কাছে।
‘ভাসিলি লুচি, চলতি নয়, বাড়তি কি-একটা প্রার্থনা আমি করলাম, জানেন? ‘
‘ভালো পড়াশুনা যাতে হয়?’
‘উঁহু।’
‘খেলনা?’
‘না। আপনি ধরতে পারবেন না। চমৎকার প্রার্থনা, কিন্তু গোপন! যখন ফলে যাবে, তখন বলব আপনাকে ধরতে পারেননি তো?’
‘না, পারছি না, আপনি বলুন, হেসে বলল ভাসিলি লুচি, যেটা তার ক্ষেত্রে ঘটে কদাচিৎ, ‘নিন, শুয়ে পড় ন, আমি বাতি নিবিয়ে দিচ্ছি।’
‘যার জন্য প্রার্থনা করেছিলাম, যা আমি দেখতে পাচ্ছি, তা ভালো দেখতে পাব বাতি ছাড়াই। গোপন কথাটা প্রায় বলে ফেলছিলাম আর-কি!’ খুশিতে খিলখিল করে হেসে বলল সেরিওজা।
বাতি যখন নিয়ে যাওয়া হল, সেরিওজা তখন সাড়া পেল মায়ের। তার কাছে দাঁড়িয়ে স্নেহের দৃষ্টিতে তিনি চেয়ে ছিলেন তার দিকে। কিন্তু তারপর দেখা ছিল হাওয়াই কল, চুরি, সব জড়াজড়ি হয়ে গিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
আটাশ
ভ্রন্স্কি আর আন্না পিটার্সবুর্গ এসে একটি সেরা হোটেলে উঠেছিলেন। নিচের তলায় ভ্রন্স্কি রইলেন আলাদা একটি কামরায় আর শিশুটি, স্তন্যদাত্রী আর দাসীকে নিয়ে চার কামরার বড় একটি স্যুটে আন্না।
আসার প্রথম দিনেই ভ্রন্স্কি যান বড় ভাইয়ের কাছে। সেখানে দেখা হল মায়ের সাথে। মস্কো থেকে তিনি এসেছিলেন কি-একটা কাজে। মা এবং ভ্রাতৃবধূ তাঁকে নিলেন স্বাভাবিকভাবেই; জিজ্ঞেস করলেন বিদেশ ভ্রমণের কথা, চেনা-পরিচিতদের বৃত্তান্ত, কিন্তু আন্না সম্পর্কে চুঁ শব্দটি নয়। পরের দিন সকালে বড় ভাই নিজে ভ্রন্স্কির কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন আন্নার কথা, আলেকসেই ভ্রনস্কি খোলাখুলি তাঁকে বলেন যে কারেনিনার সাথে তাঁর সম্পর্কটা তিনি দেখছেন বিবাহবন্ধনের মত; বিবাহবিচ্ছেদের আশা করছেন উনি, তখন বিয়ে করবেন, আপাতত যে কোন স্ত্রীর মতই তাঁকে স্ত্রী বলে তিনি গণ্য করছেন এবং সে কথাটা যেন তিনি মা আর তাঁর গৃহিণীকে জানিয়ে দেন।
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘সমাজ যদি অনুমোদন না করে, আমি তার পরোয়া করি না। কিন্তু আত্মীয়রা যদি আমার সাথে আত্মীয়তা বজায় রাখতে চায়, তাহলে আমার স্ত্রীর সাথেও সমান সম্পর্ক রাখতে হবে।’
বড় ভাই সব সময় ছোট ভাইয়ের যুক্তি মান্য করতেন, সমাজ প্রশ্নটার মীমাংসা না করা পর্যন্ত তিনি জানতেন না তিনি ঠিক নাকি ভুল; নিজের দিক থেকে তিনি এর বিরুদ্ধে খারাপ কিছু দেখেননি, আলেক্সেইয়ের সাথে তিনি দেখা করতে গেলেন আন্নার সাথে।
অন্য সবার সমক্ষে যেমন, তেমনি বড় ভাইয়ের উপস্থিতিতেও ভ্রন্স্কি আন্নাকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করে দেখালেন যে, উনি নিকট-পরিচিতাদের একজন। তবে তাঁদের সম্পর্ক যে বড় ভাই জানেন, সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। আন্না যে ভ্রন্স্কির মহাল-বাড়িতে থাকবেন, কথা হল তাই নিয়ে।
নিজের জাগতিক সমস্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও নিজের নতুন পরিস্থিতির দরুন অদ্ভুত একটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিলেন ভ্রন্স্কি। সমাজ যে তাঁর আর আন্নার জন্য দরজা বন্ধ করে দেবে, এটা তাঁর বোঝার কথা; কিন্তু তাঁর ঝাপসা একটা ধারণা জন্মাল যে সেটা অতীতের ব্যাপার; এখন দ্রুত প্রগতির ফলে (নিজের অজান্তেই তিনি এখন যে কোন প্রগতির পক্ষপাতী হয়ে উঠেছেন) সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে, সমাজ তাঁদের গ্রহণ করবে কিনা সে প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। ভাবলেন, ‘বলাই বাহুল্য, দরবারের যে সমাজ তা আন্নাকে গ্রহণ করবে না, কিন্তু ঘনিষ্ঠরা ব্যাপারটাকে যেমন উচিত সেভাবে নিতে পারে ও নেওয়া দরকার।’
যদি জানা থাকে যে, অবস্থান্তরে কোন বাধা নেই, তাহলে পা গুটিয়ে একই জায়গায় বসে থাকা যায় কয়েক ঘণ্টা; কিন্তু পা গুটিয়ে তাকে বসে থাকতেই হবে, এটা জানা থাকলে লোকের খিঁচ ধরে, পা দমকা মেরে টান হতে চাইবে যে দিকে তার টান হবার ইচ্ছে। সমাজ সম্পর্কে ঠিক এরকম একটা অনুভূতি হচ্ছিল ভ্রন্স্কির। সমাজের দরজা তাঁদের জন্য রুদ্ধ, এটা মর্মে মর্মে টের পেলেও তিনি দেখতে চেষ্টা করলেন সমাজ হয়ত বদলেছে, তাঁদেরকে গ্রহণ করবে। কিন্তু অচিরেই তিনি আবিষ্কার করলেন যে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জন্য সমাজ উন্মুক্ত থাকলেও আন্নার জন্য তা রুদ্ধ। বেড়াল-ইঁদুর খেলার মত লোকে তাঁর জন্য হাত তুলেই হাত নামাচ্ছে আন্নার ক্ষেত্রে।
