‘খুব ভালো বাবা’, সেরিওজা বলল চেয়ারে পাশকে ভাবে বসে এবং সেটা দোলাতে দোলাতে, এটা বারণ। ‘নাদেঙ্কার সাথে দেখা হয়েছিল’, (নাদেঙ্কা হল লিদিয়া ইভানোভনার পালিতা তাঁর বোনঝি)। ‘সে বলল, আপনি নতুন তারকা পেয়েছেন। আপনি খুশি হয়েছেন বাবা?’
‘প্রথমত দোলন বন্ধ কর বাপু’, কারেনিন বললেন, ‘দ্বিতীয়ত, পুরস্কারটা নয়, শ্রমই মূল্যবান। আমি চাই যে তুমিও যেন সেটা বোঝো। আর তুমি যদি খাটো, পড়াশুনা কর পুরস্কার পাবার জন্য, তাহলে সে খাটুনিটা মনে হবে একটা বোঝা; কিন্তু তুমি যদি খাটুনিকে ভালোবেসে খাটো’, আজ সকালে একশ আশিখানা কাগজ সই করার বিরক্তিকর খাটুনিতে তিনি বুক বেঁধে ছিলেন নিজের কর্তব্যবোধে, সে কথা মনে হতে বললেন কারেনিন, তাহলে ওই খাটুনিতেই তুমি পুরস্কার পাবে নিজের।’
কোমলতা আর আনন্দে উজ্জ্বল সেরিওজার চোখ ম্লান হয়ে গেল, বাপের দৃষ্টির সামনে সে চোখ নামিয়ে নিলে। এটা সেই পরিচিত সুর যাতে পিতা সব সময় কথা বলতেন তার সাথে, আর সেরিওজাও তা মেনে নিতে শিখে গিয়েছিল। সেরিওজার মনে হত পিতা তার সাথে কথা বলছেন যেন তাঁর কল্পিত এক বালকের উদ্দেশে, বইয়ে যাদের কথা থাকে তেমন একজন, কিন্তু মোটেই যে সেরিওজার মত নয়। আর পিতার কাছে সেরিওজাও সব সময় এই পুস্তকস্থ বালকের কৃত্রিম ভূমিকা নেবার চেষ্টা করত।
‘তুমি এটা বুঝতে পারছ আশা করি?’ বললেন পিতা
‘হ্যাঁ বাবা’, সেরিওজা বলল কল্পিত বালকটির ভূমিকা নিয়ে।
পাঠকটা ছিল বাইবেলের কয়েকটা শ্লোক মুখস্থ করা এবং প্রাচীন অনুশাসনের শুরুটার পুনরাবৃত্তি করা নিয়ে। বাইবেলের শ্লোক সেরিওজা ভালোই জানত, কিন্তু শ্লোক যখন সে বলছিল, তখন রগের দিকে খাড়া বেঁকে যাওয়া বাপের কপালের হাড়ের দিকে নজর পড়ে তার, ফলে তার গোলমাল হয়ে যায়, একটা শ্লোকের শেষ সে একই শব্দে জুড়ে দেয় অন্য শ্লোকের গোড়ায়। কারেনিনের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে সেরিওজা যা বলছে সেটা ও বোঝেনি, এতে বিরক্তি ধরল তাঁর।
মুখ গোমড়া করে তিনি সেরিওজাকে যা বোঝাতে শুরু করলেন সেটা সে শুনেছে বহুবার, কিন্তু কখনো মনে রাখতে পারেনি, কেননা তা বুঝতে পারত সে পরিষ্কার, ‘হঠাৎ’ যেমন করে হয় ক্রিয়া বিশেষণের ধরন, তেমনি। ভীত চোখে সে তাকাল পিতার দিকে, ভাবল শুধু একটা কথাই : আগে মাঝে মাঝে যা হয়েছে পিতা যা বললেন সেটা তাকে দিয়ে আবার পুনরাবৃত্তি করাবেন কিনা; সেটা ভেবে তার এত ভয় হল যে কিছু আর তার মাথায় ঢুকছিল না। কিন্তু পুনরাবৃত্তি করতে তিনি বললেন না, প্রাচীন অনুশাসনের পাঠে চলে এলেন। ঘটনাগুলো সেরিওজা বলল ভালোই, কিন্তু কিছু ঘটনা কিসের পূর্বসূচনা দিয়েছে এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে দেখল কিছুই সে জানে না, যদিও এর জন্য আগেও সে শাস্তি পেয়েছে। যে জায়গাটায় সে কিছুই বলতে না পেরে কাঁচুমাচু খাচ্ছিল, টেবিল চাচচ্ছিল, চেয়ারে দুলছিল, সেটা মহাপ্লাবনের আগেকার পয়গম্বরদের নিয়ে। তাঁদের মধ্যে এনখ ছাড়া আর কারো কথা সে জানত না, যিনি নাকি সশরীরে স্বর্গে গিয়েছিলেন। আগে নামগুলো তার মনে ছিল, কিন্তু এখন একেবারে সেগুলো মুছে গেল মন থেকে, বিশেষ করে এই জন্য যে গোটা প্রাচীন অনুশাসন গ্রন্থের মধ্যে এনখ ছিল তার প্রিয় চরিত্র, আর পিতার ঘড়ির চেন আর আধ-খোলা ওয়েস্ট-কোটের দিকে নিবদ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এখন এনখের সশরীরে স্বর্গারোহণ নিয়ে পুরো একসারি চিন্তাধারায় সে ভেসে গেল।
যে মৃত্যুর কথা সেরিওজা প্রায়ই শুনত, তাতে তার আদৌ বিশ্বাস ছিল না। সে বিশ্বাস করত না যে তার প্রিয়জন মরতে পারে, বিশেষ করে সে নিজে মরবে। এটা ছিল তার কাছে একেবারে অসম্ভাব্য ও অবোধ্য একটা ব্যাপার। কিন্তু লোকে তাকে বলত যে সবারই মরণ আছে; যাদের ওপর তার বিশ্বাস ছিল, জিজ্ঞেস করায় তারাও একই কথা বলেছে। ধাইমাও তাই বলেছে যদিও অনিচ্ছায়। কিন্তু এনখ তো মরেননি, তার মানে সবাই মারা যায় না। সে ভাবত, ‘কেন সবাই সৃষ্টিকর্তার চোখে অমনি পুণ্যবান হয়ে পারবে না সশরীরে স্বর্গে যেতে?’ খারাপ লোকেরা, অর্থাৎ সেরিওজা যাদের পছন্দ করত না, তারা মরতে পারে, কিন্তু ভালো লোকদের সবার পক্ষে এনখের মত হওয়া সম্ভব।
‘তা কোন্ কোন্ পয়গম্বর?’
‘এনখ, এনস।’
‘সে তো তুমি আগেই বলেছ। খুব খারাপ সেরিওজা, খারাপ। সমস্ত খ্রিস্টানের পক্ষে যা জানা সবচেয়ে বেশি দরকার তা জানার চেষ্টা যদি না কর’, উঠে দাঁড়িয়ে পিতা বললেন, ‘তাহলে কিসে তোমার আগ্রহ থাকতে পারে? তোমার আচরণে আমি খুশি নই, পিওতর ইগ্নাতিচও’ (ইনি প্রধান শিক্ষক) ‘অখুশি… তোমাকে শাস্তি দিতে হবে।’
পিতা এবং শিক্ষক উভয়েই সেরিওজার ওপর অপ্রসন্ন, এবং সত্যিই সে পড়াশুনায় ছিল খুবই খারাপ। অন্যদিকে তাকে গুণহীন বলা চলত না কোনক্রমেই। বরং শিক্ষক যাদের দৃষ্টান্তস্থল বলে তুলে ধরতেন তেমন অনেক বালকের চেয়ে তার গুণপনা ছিল বেশি। পিতার চোখে, তাকে যা শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তাও সে শিখতে চায় না। আসলে শেখা সম্ভব নয় তার পক্ষে। সম্ভব নয় কারণ পিতা ও শিক্ষক তার কাছে যে দাবি করতেন তার চেয়ে তার প্রাণে ছিল বেশি জরুরি একটা দাবি। এ দাবিটা ওঁদের বিপরীত এবং তার প্রতিপালকদের সাথে সোজাসুজি লড়াই বাধতো তার।
