‘আচ্ছা, আমাকে বলুন-না ভাসিলি লুকিচ’, হাতে বই নিয়ে পড়ার টেবিলে বসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল সেরিওজা, ‘আলেক্সান্দ নেভস্কি অর্ডারের চেয়ে বড় অর্ডার কি আছে? জানেন তো হবাবা আলেক্সান্দর নেভস্কি অর্ডার পেয়েছেন?’
ভাসিলি লুকিচ বলল যে নেভস্কির চেয়ে বড় হল ভ্লাদিমির।
‘আর তার চেয়ে বড়?’
‘সবার বড় আন্দ্রেই পের্ভোল্ভান্নি।’
‘আর আন্দ্রেইয়ের চেয়ে বড়?’
‘আমি জানি না।’
‘সে কি, আপনি জানেন না মানে?’ কনুইয়ে ভর দিয়ে সেরিওজা ভাবনায় ডুবে গেল।
ভাবনাগুলো তার অতি জটিল এবং রকমারি। সে কল্পনা করল যে বাবা তার হঠাৎ ভ্লাদিমির আর আন্দ্রেই দুই- ই পেয়ে গেছেন আর তার ফলে পাঠে আজ তিনি হবেন অনেক বেশি সদয় আর বড় হয়ে সে নিজেও পাবে সমস্ত অর্ডারই, সেটাও যা হবে আন্দ্রেইয়ের চেয়েও বড়। অর্ডার ভেবে বার করতেই সে হয়ে যাবে তা পাবার যোগ্য। আরো বড় একটা ভেবে বার করুক, অমনি সে তার যোগ্য।
এই ধরনের ভাবনাচিন্তায় সময় কেটে গেল। শিক্ষক যখন এলেন ‘ক্রিয়া বিশেষণের স্থান, কাল ও ধরন’ তখনো শেখা হয়নি। শিক্ষক শুধু অসন্তুষ্ট নন, দুঃখিতই হলেন। এই দুঃখটা সেরিওজাকে বিচলিত করল। তার মনে হচ্ছিল, পড়া যে করেনি তার জন্য তার দোষ কিছু নেই; যত চেষ্টাই সে করুক পড়া সে কিছুতেই করতে পারছিল না : শিক্ষক যতক্ষণ বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, ততক্ষণ তার মনে হচ্ছিল সে যেন বুঝতে পারছে, কিন্তু যেই সে একা একা ভাবতে যাচ্ছিল, তখন কিছুতেই মনে করতে আর বুঝতে পারছিল না কেন অমন ছোট্ট আর বোধগম্য একটা শব্দ ‘হঠাৎ’-কে হতে হল ক্রিয়া বিশেষণের ধরন। তাহলেও শিক্ষক দুঃখ পেয়েছেন তার জন্য কষ্ট হচ্ছিল তার, ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁকে সান্ত্বনা দিতে।
শিক্ষক যখন চুপ করে বইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেই মুহূর্তটার সুযোগ নিলে সে।
হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা মিখাইল ইভানিচ, আপনার জন্মদিন কবে?
‘আপনি বরং নিজের কাজ নিয়ে ভাবলে পারতেন, বুদ্ধিমান জীবের কাছে কোনই মানে নেই জন্মাদনের। অন্যান্য যে সব দিনে কাজ করতে হয়, ওটা তারই মত একটা দিন।’
তাঁর দিকে, তাঁর পাতলা দাড়ি, যে চশমাটা নাকের খাঁজ থেকে খসে এসেছে ডগায়, তার দিকে মন দিয়ে তাকিয়ে দেখে সেরিওজা ডুবে গেল ভাবনায়, ফলে শিক্ষক যা বোঝাচ্ছিলেন, কিছুই তার কানে ঢুকল না। সে বুঝতে পারছিল যে শিক্ষক যা বলছেন, ভাবছেন না তা নিয়ে, যে সুরে কথাগুলো বলা হচ্ছিল, তা থেকে সে টের পাচ্ছিল এটা। ‘কিন্তু সবাই কেন ঠিক করে নিয়েছে ওরা কথা কইবে একই ঢঙে, সবকিছু বিষয়ে, যা ভারি একঘেয়ে, বেদরকারি? কেন উনি ঠেলে সরিয়ে দেন আমাকে, ভালোবাসেন না?’ সখেদে সে জিজ্ঞেস করলে নিজেকে আর ভেবে পেল না উত্তর।
সাতাশ
শিক্ষকের পর পিতার নিকট পাঠ। তিনি না আসা পর্যন্ত সেরিওজা একটা ছুরি নিয়ে খেলা করতে করতে ভাবতে থাকল। তার মনের মত একটা কাজ ছিল বেড়াতে গিয়ে মাকে খোঁজা। সাধারণভাবেই মরণে তার বিশ্বাস ছিল না, বিশেষ করে মায়ের মরণে, যদিও লিদিয়া ইভানোভনা তাকে সেই কথাই বলেছেন এবং বাবা তা সমর্থনও করেছেন কিন্তু মা মারা গেছেন তাকে এ কথা বলার পর এবং বলেছেন বলেই সে বেড়াবার সময় খুঁজে বেড়াত তাঁকে। পুষ্টদেহী, লাবণ্যময়ী, কৃষ্ণকেশী প্রতিটি নারীই ছিল তার মা। এমন নারী দেখতে পেলে মন তার কোমলতায় এত ভরে উঠত যে দম বন্ধ হয়ে আসত, পানি উথলে উঠত চোখে। এই বুঝি উনি তার কাছে এসে মুখাবগুণ্ঠন তুলবেন বলে অপেক্ষা করত সে। দেখা যাবে তাঁর গোটা মুখখানা, হাসছেন তিনি, জড়িত ধরছেন তাকে, তাঁর সুরভি পাচ্ছে সে, অনুভব করছে তাঁর বাহুর কোমলতা, সুখে কেঁদে ফেলবে সে, যেমন একবার ছিল সে তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে, সুড়সুড়ি দিচ্ছিলেন তিনি, আর হিহি করে হেসে সে কামড় দিচ্ছিল তাঁর আংটি পরা সাদা হাতে। পরে যখন সে ধাই-মার কাছে দৈবাৎ শুনল যে মা তার মরেননি, তার কাছে উনি মরা বলে পিতা আর লিদিয়া ইভানোভনা বুঝিয়েছেন, কারণ মা খারাপ লোক (এটা সে কখনো বুঝতে পারত না, কারণ ভালোবাসত তাঁকে), তখনো তো একইভাবে খুঁজত তাঁকে, প্রতীক্ষা করত তাঁর। আজ গ্রীষ্মোদ্যানে বেগুনি মুখাবগুণ্ঠন ঝোলানো একটি নারীকে সে দেখেছিল, উনিই মা, দুরুদুরু বুকে এই আশা করে তাঁকে লক্ষ করছিল যে, যখন মহিলাটি হাঁটা পথ ধরে আসছিলেন তার দিকে। তবে তিনি সেরিওজার কাছ পর্যন্ত না এসে কোথায় যেন চলে গেলেন। মায়ের প্রতি ভালোবাসার যে জোয়ার সেরিওজা আজ অনুভব করেছিল তা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রবল। আর এখন পিতার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আত্মভোলা হয়ে ছুরি দিয়ে কাটছিল টেবিলের কিনারা আর জ্বলজ্বলে চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল মায়ের কথা।
‘বাবা আসছেন!’ তাকে সচেতন করে দিলেন ভাসিলি লুচি।
লাফিয়ে উঠল সেরিওজা, পিতার কাছে গিয়ে তাঁর হস্তচুম্বন করলে, মন দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আলেক্সান্দর নেভস্কি অর্ডার পাওয়ায় তাঁর মধ্যে আনন্দের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কিনা খুঁজলে।
‘ভালো বেড়িয়েছিলে তো?’ নিজের ইজি-চেয়ারে বসে বললেন কারেনিন, প্রাচীন অনুশাসন বইখানা টেনে নিয়ে খুললেন। পবিত্র ইতিবৃত্ত প্রতিটি খ্রিস্টানের ভালো জানা থাকা উচিত, সেরিওজাকে কারেনিন এ কথা বারম্বার বললেও নিজে তিনি প্রাচীন অনুশাসন বিষয়ে বলতে গিয়ে বই দেখতেন প্রায়ই আর সেটা নজরে পড়েছিল সেরিওজার।
