ওর সমস্ত আগের সম্পর্কটা এখন মনে মনে নাড়াচাড়া করে এবং বহু দ্বিধার পর যেরকম আনাড়ি কথায় তিনি ওর পাণিপ্রার্থনা করেছিলেন সেটা মনে হতে একই রকম লজ্জা ও অনুশোচনা হচ্ছিল তাঁর।
‘কিন্তু আমার কি দোষ?’ নিজেকে বলছিলেন তিনি, আর এই প্রশ্নটার সাথে সাথে সব সময় আরেকটা প্রশ্নের উদয় হত, যথা : এসব ভ্রন্স্কি, অব্লোন্স্কিয়া… পায়ের মোটা ডিমওয়ালা এসব কামেরহেররা কি বোধ করে অন্যভাবে, ভালোবাসে অন্যভাবে, বিয়ে করে অন্যভাবে? তাঁর মনে ভেসে উঠল পুরো একসারি এসব সুপুষ্ট সবল, অসন্দিগ্ধ লোকদের ছবি যারা সব সময় ও সর্বত্র অজ্ঞাতসারে তাঁর কৌতূহলী মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। মন থেকে এসব ভাবনা তাড়াতে চাইলেন তিনি, নিজেকে বোঝাতে চাইলেন যে তিনি বেঁচে আছেন ইহলোকের সাময়িক জীবনের জন্য নয়, শাশ্বতের জন্য, অন্তরে তাঁর শান্তি ও প্রেম বিরাজমান। কিন্তু এই সাময়িক, অকিঞ্চিৎকর জীবনে তিনি যে কতকগুলি, তাঁর যা মনে হচ্ছিল, অকিঞ্চিৎকর ভুল করেছেন, সেটা তাঁকে এমন দগ্ধাচ্ছিল যেন যে শাশ্বত মোক্ষে তাঁর বিশ্বাস সেটা বুঝি নেই। কিন্তু এই প্রলোভনটা দীর্ঘস্থায়ী হল না, অচিরেই কারেনিনের অন্তরে আবার ফিরে এল সেই প্রশান্তি ও উত্তুঙ্গতাবোধ যার কল্যাণে তিনি যা স্মরণ করতে চান না তা ভুলতে পারেন।
ছাব্বিশ
‘কেমন, কাপিতোনিচ?’ জিজ্ঞেস করল সেরিওজা, জন্মদিনের আগে সে বেরিয়ে ফিরল ফুর্তিতে, গাল রাঙা করে। নিজের ওভারকোট দিচ্ছিল সে পুরনো, ঢ্যাঙা হল-পোর্টারকে যে হাসছিল তার উচ্চতা থেকে ছোট্ট মানুষটার উদ্দেশে। ‘ব্যান্ডেজ-বাঁধা কেরানিটা এসেছিল আজ? বাবা দেখা করেন?’
‘করেন’, আমোদে চোখ মটকে বলল পোর্টার, ‘সেক্রেটারি সাহেব বেরিয়ে যেতেই আমিই খবর দিই। দিন গো, আমি খুলে দিচ্ছি।’
‘সেরিওজা!’ ভেতরকার কামরায় যাবার দরজায় থেমে গিয়ে বলল স্লাভ দেশীয় গৃহশিক্ষকটি, ‘নিজেই কোট খোলো।’
শিক্ষকের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর সেরিওজার কানে গেলেও সে তাতে ভ্রূক্ষেপ করল না। পোর্টারের কোমরবন্ধ ধরে তার মুখের দিকে সে চেয়ে রইল।
‘যা দরকার বাবা সেটা করলেন ওর জন্য?’
সায় দিয়ে মাথা নাড়লে পোর্টার।
ব্যান্ডেজ-বাঁধা যে কেরানিটি কারেনিনের কাছে কিসের যেন প্রার্থী হয়ে আসছে এই সাত বার, তার সম্পর্কে সেরিওজা আর পোর্টার দুজনেই উৎসুক হয়ে উঠেছিল। একবার সেরিওজা তাকে দেখে প্রবেশমুখে, পোর্টারের কাছে করুণভাবে মিনতি করছিল যেন তার খবর দেওয়া হয়, ছেলেমেয়ে নিয়ে মরতে বসেছে।
সেই থেকে তাকে আরো একবার দেখে সেরিওজা আগ্রহী হয়ে ওঠে তার সম্পর্কে
জিজ্ঞেস করল, ‘তা খুশি হয়েছিল তো?’
‘খুশি আবার হবে না! প্রায় লাফাতে লাফাতে যায় এখান থেকে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সেরিওজা শুধাল, ‘কেউ কিছু এনেছে?
‘হ্যাঁ খোকাবাবু’, মাথা নেড়ে ফিসফিসিয়ে পোর্টার বলল, ‘এনেছে, কাউন্টেসের কাছ থেকে।’
সেরিওজা তক্ষুণি বুঝল কি বলতে চাইছে পোর্টার, তার জন্মদিন উপলক্ষে উপহার পাঠিয়েছেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা।
‘কি বলছ? কোথায় সেটা?’
‘কর্নেই নিয়ে গেছে বাবার কাছে। খাসা জিনিসই হওয়ার কথা!’
‘কত বড় জিনিস? এতটা?’
‘সামান্য ছোট। তবে ভালো জিনিস।’
‘বই?’
‘না, কোনো একটা জিনিস। যান, যান, ভাসিলি লুকিচ ডাকছেন’, গৃহশিক্ষকের পদশব্দ এগিয়ে আসতে শুনে তার কোমরবন্ধ ধরে থাকা দস্তানা থেকে আধ-খসা সেরিওজার হাতখানা সাবধানে খসিয়ে পোর্টার চোখ মটকে মাথা নেড়ে দেখাল ভুনিচের দিকে।
‘ভাসিলি লুচি, শুধু এক মিনিট বাদে!’ সেরিওজা বলল তার সেই ফুর্তিবাজ, ভালোবাসার হাসি হেসে যা সব সময় জয় করে নিয়েছে যত্নশীল ভাসিলি লুচিকে।
সেরিওজার এত ফুর্তি লাগছিল, সবকিছু এমন সুখময় মনে হচ্ছিল যে বন্ধু পোর্টারকে তাদের পারিবারিক আনন্দের খবরটা না দিয়ে সে পারছিল না, গ্রীষ্মোদ্যানে বেড়াবার সময় যা সে শুনেছে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার বোনঝির কাছ থেকে। এই কেরানির জন্য আনন্দ আর সে যে খেলনা পেতে যাচ্ছে তার আনন্দের সাথে ঐ পারিবারিক আনন্দটা মিলে যাওয়ায় সেটা তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেরিওজার মনে হচ্ছিল আজ এমন দিন যখন সকলেরই আনন্দ আর ফুর্তি হওয়ার কথা।
‘জানো, বাবা আলেক্সান্দর নেভস্কি অর্ডার পেয়েছে?’
‘জানব না কেন? লোকেরা এসেছিল অভিনন্দন জানাতে।’
‘কি, উনি খুশি হয়েছেন?’
‘জারের অনুগ্রহে খুশি আবার না হয়! তার মানে যোগ্যতা দেখিয়েছেন’, পোর্টার বলল কঠোর স্বরে, গুরুগম্ভীর ভাব করে।
সেরিওজা চিন্তামগ্ন হয়ে তাকাল সমস্ত খুঁটিনাটিতে তন্নতন্ন করে দেখা পোর্টারের মুখ, বিশেষ করে পেয়ে যাওয়া দুই জুলপির মাঝখানে ঝুলন্ত থুতনির দিকে যা আর কেউ দেখেনি সেরিওজা ছাড়া যে সব সময় নিচু থেকে ওটা লক্ষ করেছে।
‘তোমার মেয়ে তোমার কাছে অনেক দিন আসেনি?’
পোর্টারের মেয়ে ব্যালে নর্তকী।
‘নিত্য আসার সময় কোথায়? ওদেরও তো অনুশীলন থাকে। আপনারও অনুশীলন আছে খোকাবাবু, যান।’
ঘরে ঢুকে পড়তে বসার বদলে সেরিওজা শিক্ষককে তার এই অনুমানটা জানাল যে উপহারটা নিশ্চয়ই কোন যন্ত্র। ‘আপনি কি মনে করেন?’ জিজ্ঞেস করল সে।
কিন্তু ভাসিলি লুকিচ ভাবছিল কেবল এই যে ওর ব্যাকরণ পড়া দরকার, শিক্ষক আসবেন দুটোর সময়।
