‘আরে, কনস্তান্তিন দৃমিত্রিচ যে! আবার এলেন আমাদের ব্যভিচারী ব্যাবিলনে’, ওঁর দিকে তাঁর ছোট্ট হলদেটে হাত বাড়িয়ে তিনি বললেন, তাঁর মনে পড়ে গিয়েছিল যে শীতের গোড়ায় লেভিন একবার বলেছিলেন যে মস্কো হল ব্যাবিলন। তা ব্যাবিলনেরই চরিত্র শোধরাল নাকি আপনার চরিত্রই নষ্ট হল?’ মুচকি হেসে কিটির দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি যোগ দিলেন।
‘আমার কথা আপনি এত মনে রাখেন দেখে কৃতার্থ বোধ করছি কাউন্টেস’, ইতিমধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে তখনই অভ্যাসবশত কাউন্টেস নর্ডস্টনের সাথে রসিকতা-শত্রুতার সম্পর্ক পাতলেন, ‘নিশ্চয় কথাগুলো আপনার মনে খুব ছাপ ফেলেছিল।’
বাঃ, তা নয়ত কি? আমি সব টুকে রাখি। কি কিটি, আবার স্কেটিং করেছিস বুঝি?…’ ।
কিটির সাথে কথা বলতে শুরু করলেন তিনি। এখন চলে যাওয়া যতই অস্বস্তিকর হোক, সারা সন্ধে এখানে বসে থেকে কিটিকে দেখার চেয়ে সে অস্বস্তিকরতা মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে সহজ। কিটি মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল তাঁর দিকে এবং তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছিল। উনি উঠতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু উনি চুপ করে আছেন দেখে প্রিন্স-মহিষী তাকে জিজ্ঞেস করলেন?
মস্কোয় আপনি এসেছেন অনেক দিনের জন্য? আপনি তো মনে হয় জেমস্তৃতোর কর্মকর্তা, বেশি দিন থাকা তো আপনার চলে না।
লেভিনের কঠোর গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে কাউন্টেস নর্ডস্টন ভাবলেন, কিছু একটা হয়েছে ওঁর, কেন জানি তর্কে নামছেন না। কিন্তু আমি ওঁকে টেনেবোর করব। ভারি মজা লাগে কিটির সামনে ওঁকে অপদস্থ করতে এবং তা করব।’
কাউন্টেস বললেন, ‘কনস্তান্তিন দৃমিত্রিচ, আমাকে একটু বুঝিয়ে দিন তো-আপনি তো এ ব্যাপারগুলো সবই জানেন–আমাদের কালুগা গ্রামে সব চাষী আর সব মাগীগুলো তাদের যা কিছু ছিল মদ খেয়ে উড়িয়েছে, এখন আমাদের আর খাজনা-পত্র কিছু দিচ্ছে না। কি এর মানে? আপনি তো সব সময়ই চাষীদের খুব প্রশংসা করেন।
এই সময় ঘরে এলেন আরেকজন মহিলা, লেভিন উঠে দাঁড়ালেন।
মাপ করবেন কাউন্টেস, আমি সত্যিই এ সব ব্যাপার কিছু জানি না, আপনাকে কিছু বলতেও পারব না, এই বলে তিনি তাকালেন মহিলার পিছু পিছু আসা জনৈক সামরিক অফিসারের দিকে।
ইনিই নিশ্চয় ভ্রনস্কি’, ভাবলেন লেভিন এবং সেটা যাচাই করার জন্য তাকালেন কিটির দিকে। ইতিমধ্যে কিটি ভ্রনস্কিকে দেখে চকিত দৃষ্টিপাত করল লেভিনের দিকে। অজান্তে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা চোখের সেই একটা দৃষ্টিপাত থেকেই লেভিন বুঝলেন যে কিটি এই লোকটিকে ভালোবাসে, নিজে মুখে কিটি সে কথা বলল যা দাঁড়াতো, বুঝলেন তেমনি সুনিশ্চিত হয়ে। কিন্তু কি ধরনের লোক ইনি?
এখন–ভালো হোক, মন্দ হোক–লেভিন থেকে না গিয়ে পারেন না; তাঁকে জানতে হবে, কিটি যাকে ভালোবেসেছে, কেমনধারা লোক সে।
কিছু কিছু লোক আছে যারা কোন-না-কোন দিক থেকে সৌভাগ্যবান প্রতিদ্বন্দ্বীর দেখা পেলে তার ভেতর ভালো যা কিছু সব বরবাদ করে শুধু খারাপটাই দেখতে উগ্রীব; উল্টো দিকে আবার কিছু লোক আছে যারা এই সৌভাগ্যবান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে দেখতে চায় কি কি গুণের জন্য সে তাদের পরাভূত করল, এবং বুক টনটন করলেও তার মধ্যে খোঁজে শুধু ভালোটাই। লেভিন ছিলেন এই ধরনের লোক। কিন্তু প্রনস্কির মধ্যে ভালো আর আকর্ষণয়ের খোঁজ পেতে তার বেগ পেতে হল না। সাথে সাথেই তা চোখে পড়ল। ভ্রনস্কি ছিলেন মধ্যম দৈর্ঘ্যের সুগঠিত দেহের মানুষ, কালো চুল, সহৃদয়, কান্তিমান মুখে অসাধারণ প্রশান্তি আর দৃঢ়তা। তার মুখে এবং মূর্তিতে, ছোট করে ছাঁটা কালো চুল আর সদ্য কামানো থুতনি থেকে শুরু করে চওড়া আনকোরা উর্দি পর্যন্ত সব কিছুই সাধারণ, অথচ সুচারু। মহিলাকে পথ ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রথম প্রিন্স-মহিষী, পরে কিটির কাছে গেলেন।
কিটির দিকে যখন তিনি যাচ্ছিলেন তাঁর সুন্দর চোখজোড়া বিশেষ একটা কমনীয়তায় ঝলমল করে উঠল; প্রায় অলক্ষ্য একটা সুখ আর নম্র বিজয়ের হাসি নিয়ে (লেভিনের তাই মনে হল), তিনি সাবধানে সম্মান দেখিয়ে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করলেন এবং বাড়িয়ে দিলেন তার ছোট তবে চওড়া হাত।
সবাইকে সম্ভাষণ জানিয়ে কয়েকটা করে কথা বলে উনি বসলেন লেভিনের দিকে না তাকিয়ে, ওঁর ওপর থেকে লেভিনের দৃষ্টি সরছিল না।
‘আসুন আলাপ করিয়ে দিই’, লেভিনকে দেখিয়ে প্রিন্স-মহিষী বললেন, কনস্তান্তিন দৃমিত্রি লেভিন, কাউন্ট আলেকসেই কিরিলোভিচ ভ্রনস্কি।
ভ্রনস্কি উঠে দাঁড়ালেন এবং বন্ধুর মত লেভিনের চোখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
তাঁর সহজ খোলামেলা হাসি হেসে বললেন, এই শীতে মনে হয় আমার সাথে আপনার আহারের কথা ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে আপনি চলে গেলেন।
কনস্তান্তিন দমিত্ৰিচ শহর, আর আমাদের শহুরেদের দেখতে পারেন না, ঘৃণা করেন, বললেন কাউন্টেস নর্ডস্টন।
‘আমার কথাগুলো যখন আপনি এত মনে রাখেন তখন আপনার ওপর তা নিশ্চয় খুব চাপ ফেলে’, লেভিন বললেন এবং এই কথাগুলো যে আগেই বলেছেন সেটা মনে পড়ে যাওয়ায় লাল হয়ে উঠলেন।
ভ্রনস্কি লেভিন আর কাউন্টেস নর্ডস্টনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আপনি সব সময়ই গ্রামে থাকেন? আমার মনে হয় শীতকালে একঘেয়ে লাগে, তাই না?
‘কোন কাজ থাকলে একঘেয়ে নয়, তা ছাড়া নিজেকে তো আর একঘেয়ে লাগে না’, তীক্ষ্ণ জবাব দিলেন লেভিন।
