স্ত্রীর উল্লেখে কেঁপে উঠলেন কারেনিন কিন্তু সাথে সাথেই তাঁর মুখ ফুটে উঠল মড়ার মত আড়ষ্টতা যাতে এ ব্যাপারে প্রকাশ পাচ্ছিল তাঁর সম্পূর্ণ অসহায়ত্ব।
বললেন, আমি তাই আশা করেছিলাম।’
কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা তাঁর দিকে চাইলেন তুরীয় দৃষ্টিতে, তাঁর প্রাণের মহিমা দেখে উচ্ছ্বাসে তাঁর চোখ ভরে উঠল পানিতে।
আন্না কারেনিনা – ৫.২৫
পঁচিশ
আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন যখন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার পুরানো সব চিনেমাটির পাত্র সাজানো, দেয়ালে পোর্ট্রেট টাঙ্গানো আরামপ্রদ স্টাডিটায় ঢুকলেন, গৃহকর্ত্রী তখন সেখানে ছিলেন না। তিনি পোশাক বদলাচ্ছিলেন।
গোল একটা টেবিলের ওপর টেবিলক্লথ পাতা, তার ওপর চীনা টী-সেট আর স্পিরিটে গরম করার একটা রূপালী কেটলি। স্টাডির শোভাবর্ধক পরিচিতদের অসংখ্য পোর্ট্রেটগুলোর দিকে কারেনিন চাইলেন অন্যমনস্কের মত, তারপর একটা টেবিলের কাছে সেখানে রাখা একটা বাইবেল খুললেন। কাউন্টেসের সিল্ক গাউনের মর্মরে তিনি সজাগ হলেন।
‘এখন আমরা শান্তিতে বসতে পারি’, কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা বললেন বিচলিত হাসিমুখে, তাড়াতাড়ি করে সেঁধলেন টেবিল আর সোফার মাঝখানে, ‘চা খেতে খেতে কথা বলা যাবে।’
উপক্রমণিকাস্বরূপ গোটাকত কথার পর কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাল হয়ে তাঁর পাওয়া চিঠিটা দিলেন কারেনিনের হাতে।
চিঠি পড়ে তিনি চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ।
‘আমি মনে মরি না যে আপত্তি করার অধিকার আছে আমার’, চোখ তুলে ভীরু ভীরু গলায় বললেন তিনি।
‘বন্ধু আমার! কারোর মধ্যেই কু কিছু আপনি দেখেন না!’
‘উল্টে বরং, আমি দেখি সবকিছুই কু। কিন্তু ওটা কি ন্যায্য হবে?’
মুখে তাঁর অনিশ্চিতি এবং তাঁর কাছে দুর্বোধ্য একটা ব্যাপারে পরামর্শ, অবলম্বন এবং নির্দেশ ভিক্ষা।
‘না’, ওঁকে বাধা দিলেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা, ‘সবকিছুরই একটা সীমা আছে। দুর্নীতিটা আমি বুঝি, কথাটা বললেন সম্পূর্ণ অকপটে নয়, কেননা নারীকে দুর্নীতিতে ঠেলে দেয় কিসে সেটা তিনি কখনো বুঝতে পারেননি, ‘কিন্তু নিষ্ঠুরতাটা আমি বুঝি না—আর সেটা কার প্রতি? আপনার প্রতি! যে শহরে আপনি রয়েছেন সেখানে থাকা যায় কিভাবে? যতদিন বাঁচা, ততদিন শেখা। আমিও আপনার মহত্ত্ব আর ওর নীচতা বুঝতে শিখছি।’
‘কিন্তু ঢিলটা ছুড়বে কে? কারেনিন বললেন স্পষ্টতই নিজের ভূমিকায় প্রীতিলাভ করে, ‘আমি সবকিছু ক্ষমা করেছি, তাই যেটা ওর কাছে ভালোবাসার দাবি—পুত্রস্নেহ… তা থেকে ওকে বঞ্চিত করতে পারি না।’
‘কিন্তু এটা কি ভালোবাসা, বন্ধু আমার? এটা কি আন্তরিক? ধরে নিচ্ছি আপনি ক্ষমা করেছেন, করছেন… কিন্তু ওই দেবশিশুটির অন্তর আলোড়িত করার অধিকার আছে কি আমাদের? ওর ধারণা মা মারা গেছে। ওর জন্য সে প্রার্থনা করে, তার পাপ ক্ষমা করতে বলে সৃষ্টিকর্তাকে… আর সেটাই ভালো। কিন্তু এখন কি সে ভাববে?’
‘এটা আমি ভাবিনি’, কারেনিন বললেন স্পষ্টতই কথাটায় সায় দিয়ে।
কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চুপ করে রইলেন। প্রার্থনা করছিলেন তিনি।
প্রার্থনা শেষ করে মুখ থেকে হাত সরিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি যদি আমার পরামর্শ চান, তাহলে ওটা আমি আপনাকে করতে বলব না। আমি কি দেখতে পাচ্ছি না কি কষ্ট হচ্ছে আপনার, কিভাবে আপনার ক্ষতমুখ খুলে দিয়েছে এটা? কিন্তু ধরা যাক আপনি বরাবরের মতই নিজের কথা ভুলে যাচ্ছেন। কিন্তু তার ফল হবে কি? আপনার নতুন যন্ত্রণা, শিশুটির কষ্ট, তাই তো? ওর মধ্যে মানুষিক কিছু যদি থেকে থাকে, তাহলে নিজেই এটা ও চাইত না। না, আমি দ্বিধা করব না, ও পরামর্শ দেব না, আর যদি আপনি অনুমতি দেন, তাহলে ওকে চিঠি লিখব আমি।’ কারেনিন রাজি হলেন। এবং কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা ফরাসি ভাষায় লিখলেন নিচের এই চিঠি।
‘মহাশয়া,
আপনার কথা মনে করিয়ে দিলে আপনার ছেলের কাছ থেকে কিছু প্রশ্ন আসবে, শিশুটির কাছে যা পবিত্র থাকা উচিত তার প্রতি একটা ধিক্কারের মনোভাব তার প্রাণ বপন না করে সে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া চলে না, তাই আপনার স্বামীর প্রত্যাখ্যানকে খ্রিস্টীয় প্রেমের প্রেরণায় গ্রহণ করতে অনুরোধ করি। আপনার জন্য করুণা মাগছি পরমেশ্বরের কাছে।
কাউন্টেস লিদিয়া’
যে গোপন উদ্দেশ্য কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা নিজের কাছেই লুকিয়ে রেখেছিলেন তা সিদ্ধ হল চিঠিটায়। আন্নাকে তা মর্মান্তিক আঘাত দিয়েছিল।
কারেনিনের বেলায় ঘটল এই যে লিদিয়া ইভানোভনার ওখান থেকে বাড়ি ফিরে সেদিন তিনি তাঁর সচরাচর কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারলেন না, ধর্মপ্রাণ মোক্ষপ্রাপ্ত মানুষের যে চিত্তশান্তি তিনি আগে অনুভব করতেন, খুঁজে পেলেন না সেটা।
যে স্ত্রী তাঁর কাছে অত বেশি অপরাধী, এবং যার তুলনায় কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা তাঁকে ন্যায্যতই বলেন সাধুতুল্য, তার স্মরণোপলক্ষে তাঁর বিচলিত হবার কথা নয়; কিন্তু শান্তি পাচ্ছিলেন না তিনি : যে বইটা তিনি পড়ছিলেন তা বোধগম্য হচ্ছিল না তাঁর, স্ত্রীর সাথে তাঁর সম্পর্কের স্মৃতি, এখন তাঁর যা মনে হল, তার প্রসঙ্গে যে ভুলগুলো তিনি করেছেন তার যন্ত্রণাকর স্মৃতি তাড়াতে পারছিলেন না মন থেকে। বিশেষ করে ঘোড়দৌড় থেকে বাড়ি ফেরার পথে তার বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকৃতি তিনি কিভাবে নিয়েছিলেন (বিশেষত, তিনি যে ওর কাছ থেকে একটা বাহু শোভনতা দাবি করেছিলেন, ডুয়েল লড়তে চাননি), এই স্মৃতিটা অনুশোচনার মত দগ্ধাচ্ছিল তাঁকে। সমান দগ্ধাচ্ছিল ওকে যে চিঠিটা তিনি লিখেছিলেন সেটা মনে পড়ায়; বিশেষ করে তাঁর যে ক্ষমায় কারো প্রয়োজন নেই, অপরের সন্তানের জন্য তাঁর যে যত্ন, সে স্মৃতিটা লজ্জায় আর অনুশোচনায় পুড়িয়ে দিচ্ছিল তাঁর হৃদয়।
