‘বিবাহিতরা জাগতিক ব্যাপার লইয়া ভাবিত, কিভাবে সন্তোষ বিধান করা যায় স্ত্রীর, ব্রহ্মচারীরা সৃষ্টিকর্তা লইয়া ভাবিতো, কি করিয়া সন্তোষ বিধান করা যায় সৃষ্টিকর্তার’, বলেছেন খ্রিস্টদূত পল আর এখন সর্বব্যাপারে পবিত্র গ্রন্থ অনুসারে চালিত হয়ে তিনি প্রায়ই স্মরণ করতে এই উক্তিটি। তাঁর মনে হত, স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর থেকে এসব প্রকল্প দিয়ে তিনি প্রভুর সেবা করেছেন আগের থেকে বেশি করে।
তাঁর কাছ থেকে চলে যাবার জন্য পরিষদ সদস্যের সুস্পষ্ট অধৈর্যে বিব্রত বোধ করছিলেন না কারেনিন; তিনি তাঁর বক্তব্য থামালেন শুধু তখন, যখন কাছ দিয়ে এক রাজবংশীয়কে যেতে দেকার সুযোগ নিয়ে পরিষদ সদস্য তাঁর হাত ছাড়ান।
একলা হয়ে পড়ে কারেনিন তাঁর ভাবনাগুলো ভেবে দেখলেন মাথা নুইয়ে, তারপর অন্যমনস্কের মত এদিক-ওদিক চেয়ে গেলেন দরজার দিকে, যেখানে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার দেখা পাবেন বলে আশা করছিলেন।
কামেরহেরের জুলপি আঁপড়ানো, সুরভিত, তাঁর দিকে এবং প্রিন্সের উর্দিতে আঁটো লাল গর্দানের দিকে তাকিয়ে (এঁদের কাছ দিয়ে যেতে হচ্ছিল তাঁকে) কারেনিন ভাবলেন, ‘কি-সব তাগড়াই দশাসই মানুষ। লোকে ঠিকই বলে যে দুনিয়ায় সবই বিদ্বেষে ভরা’, কামেরহেরের পায়ের ডিমের দিকে আরও একবার তীর্যক দৃষ্টিপাত করে ভাবলেন তিনি।
এই যে লোকগুলো তাঁকে নিয়েই আলোচনা করছিল, অলস পদক্ষেপে ক্লান্তি ও মর্যাদার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে কারেনিন তাদের উদ্দেশে মাথা নুইয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনাকে।
‘আরে, কারেনিন!’ কারেনিন যখন ওঁর কাছাকাছি এসে নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালেন, বৃদ্ধ তখন বলে উঠলেন বিদ্বেষে চোখ চকচক করে, ‘আপনাকে আমার অভিনন্দন জানানো হয়নি যে’, সদ্যপ্রাপ্ত ফিতেটা দেখিয়ে বললেন তিনি।
‘ধন্যবাদ আপনাকে’, জবাব দিলেন কারেনিন, ‘কি সুন্দর আজকের দিনটা’, ‘সুন্দর’ কথাটার ওপর তাঁর অভ্যস্ত ঢঙে ঝোঁক দিয়ে বললেন তিনি।
ওরা যে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে, সেটা তিনি জানতেন, কিন্তু ওদের কাছ থেকে বিরূপতা ছাড়া আর কিছু আশা করতেন না তিনি এবং এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
দরজার কাছে আসা কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার কর্সেট থেকে বেরিয়ে আসা হলুদ কাঁধ আর ডাক পাঠানো অপরূপ ভাবালু চোখ জোড়া দেখতে পেয়ে কারেনিন তাঁর অক্ষয় দাঁতের পাটি উদ্ঘাটিত করে গেলেন তাঁর কাছে।
লিদিয়া ইভানোভনার প্রসাধনে মেহনত লেগেছে অনেক, যেমন লাগছিল সাম্প্রতিক এই দিনগুলোয়। তিরিশ বছর আগে তাঁর যা লক্ষ্য ছিল, তাঁর এখনকার প্রসাধনের লক্ষ্য তার একেবারে বিপরীত। তখন তিনি নিজেকে সাজাতে চাইতেন যা-কিছু দিয়ে হোক, এবং সেটা যত বেশি হয় ততই ভালো। কিন্তু এখন তাঁর বয়স আর দেহরেখার সাথে বেমানান প্রসাধন অবশ্য-অবশ্যই এত বেশি চোখে পড়ে যে তাঁকে দেখতে হচ্ছে শুধু এই যাতে তাঁর চেহারার সাথে এসব প্রসাধনের বৈকট্য বড় বীভৎস না হয়ে পড়ে। কারেনিনের ক্ষেত্রে এটা তিনি করতে পেরেছিলেন, আর নিজেকে চিত্তাকর্ষকই মনে হত তাঁর কাছে। কাউন্টেস ছিলেন তাঁর কাছে শুধু তাঁর প্রতি প্রসন্নতার নয়, তাঁকে ঘিরে শত্রুতা ও উপহাসের যে সমুদ্র বিরাজ করছে সেখানে ভালোবাসার একটি দ্বীপ।
উপহাসের দৃষ্টির মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে তিনি স্বভাবতই কাউন্টেসের প্রেমাবিষ্ট দৃষ্টিতে আকৃষ্ট হলেন যেভাবে উদ্ভিদ আকৃষ্ট হয় আলোয়।
‘অভিনন্দন’, চোখ দিয়ে রিবনের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন কাউন্টেস।
পরিতৃপ্তির হাসিটা দমন করে উনি চোখ বুজে কাঁধ কোঁচকালেন, যেন তাতে করে বলতে চান যে আমাকে এটা খুশি করতে পারে না। কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা ভালোই জানতেন যে ওঁর প্রধান একটা আনন্দই হল এটা, যদিও তা তিনি স্বীকার করবেন না কখনো।
‘আমাদের পুরো সন্তুষ্ট এমন কথা বলতে পারব না’, চোখ মেলে ভুরু তুলে বললেন কারেনিন, ‘সিনিকভও খুশি নন।’ (সিৎনিকভ শিক্ষক, সেরিওজার ইহলৌকিক শিক্ষার ভার পেয়েছিলেন তিনি।) ‘আমি তো আগেও আপনাকে বলেছিলাম, প্রধান প্রধান যেসব প্রশ্নে প্রতিটি মানুষ ও প্রতিটি শিশুর মন দোলায়িত হবার কথা, তাতে ওর কেমন একটা অনীহা আছে’, এই বলে চাকুরি আর যে একটা প্রশ্নে তিনি আগ্রহী—ছেলের শিক্ষাদীক্ষা, তা নিয়ে নিজের মতামত পেশ করতে লাগলেন কারেনিন।
লিদিয়া ইভানোভনার সাহায্যে তিনি যখন জীবন ও কাজকর্মে ফেরেন, তখন তাঁর হাতে রেখে যাওয়া ছেলের শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারটা দেখা তাঁর কর্তব্য বলে মনে হয়েছিল। শিক্ষার প্রশ্ন নিয়ে কারেনিন আগে কখনো মাথা ঘামাননি, এখন ব্যাপারটার তাত্ত্বিক অধ্যয়নে সময় দিতে লাগলেন কিছুটা। এবং নরবিজ্ঞান, শিক্ষণবিদ্যা ও নীতিশাস্ত্রের খানকত বই পড়ে তিনি শিক্ষাদানের একটা পরিকল্পনা ছকলেন নিজের জন্য আর উপদেশের জন্য পিটার্সবুর্গের সেরা শিক্ষককে আমন্ত্রণ করে তিনি কাজে নামলেন। আর এই কাজেই ব্যস্ত রইলেন সব সময়।
‘কিন্তু মনটা? আমি দেখছি ও বাবার মনটা পেয়েছে আর এরকম মন থাকলে শিশু খারাপ হতে পারে কখনো’, সোচ্ছ্বাসে বললেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা।
‘হতে পারে… আমার কথা যদি ধরেন, তাহলে আমি আমার কর্তব্য করে যাচ্ছি। এটুকুই করতে পারি আমি।’ একটু চুপ করে থেকে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা বললেন, ‘আপনি আসুন আমার ওখানে। আপনার পক্ষে কষ্টকর একটা ব্যাপার নিয়ে কথা বলা দরকার। কতকগুলি স্মৃতি থেকে আমি আপনাকে নিষ্কৃতি দিতে চাই, সবাই তা ভাবে না। ওর কাছ থেকে চিঠি পেয়েছি আমি। ও এখানে, পিটার্সবুর্গে।’
