‘বলে দাও জবাব মিলবে না’, এই বলে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা তৎক্ষণাৎ তাঁর লেখার কেস খুলে কারেনিনকে লিখে পাঠালেন যে প্রাসাদে অভিনন্দন অনুষ্ঠানে দ্বিপ্রহরে তাঁর দেখা পাবার আশা করছেন।
‘গুরুত্বপূর্ণ ও দুঃখজনক একটা ব্যাপার নিয়ে আপনার সাথে আমার কথা বলা প্রয়োজন। ওখানে আমরা ঠিক করব কোথায়। ভালো হয় আমার বাড়িতে, সেখানে আমি আপনার যা রুচি, তেমন চা করতে বলব। জরুরি প্রয়োজন। উনি ক্রস দেন, তা বহনের শক্তিও দেন তিনি’, ওঁকে খানিকটা অন্তত তৈরি করে রাখার জন্য যোগ করলেন তিনি।
দিনে সাধারণত দু’তিনটা চিরকুট ওঁকে লিখে পাঠাতেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা। ওঁর সাথে যোগাযোগের এই পদ্ধতিটা কাউন্টেসের ভালো লাগত, তাতে একটা চারুতা ও গোপন রহস্যময়তার ভাব থাকত যা পাওয়া যেত না তাঁর ব্যক্তিগত আলাপে।
চব্বিশ
শেষ হল অভিনন্দন অনুষ্ঠান। লোকে চলে যেতে গিয়ে পরস্পর দেখা হওয়ায় টাটকা খবরাখবর, সদ্যপ্রাপ্ত পারতোষিক আর বড় কর্তাদের অদল-বদল নিয়ে গল্প করতে লাগল।
অদল-বদল নিয়ে জিজ্ঞেস করায় সোনালি জরির কাজ করা উর্দি পরিহিত এক পক্ককেশ বৃদ্ধ বললেন জনৈক দীর্ঘাঙ্গী রাজ্ঞী-সহচরীকে : ‘কাউন্টেস মারিয়া বরিসভনা সমর মন্ত্রী আর প্রিন্সেস ভাৎকোভস্কায়া স্টাফ-প্রধান হলে বেশ হত।’
‘আর আমি অ্যাডজুট্যান্ট’, হেসে জবাব দিলে রাজ্ঞী-সহচরী।
‘আপনার পদ তো স্থির হয়ে আছে। আপনি যাবেন আধ্যাত্মিক বিভাগে আর কারেনিন হেবন আপনার সহকারী। ‘নমস্কার প্রিন্স’, যে লোকটি এগিয়ে এসেছিলেন তাঁর করমর্দন করে বৃদ্ধ বললেন।
‘কারেনিন সম্পর্কে কি যেন?’ জিজ্ঞেস করলেন প্রিন্স।
‘বলছিলাম যে উনি আর পুতিয়াতোভ ‘আলেক্সান্দর নেভস্কি’ অর্ডার পেয়েছেন।
‘আমার দারণা ছিল সেটা তিনি পেয়েছেন আগেই।’
উঁহু। দেখুন ওঁর দিকে চেয়ে’, কাঁধের ওপর দিয়ে নতুন লাল ফিতে ঝোলালো দরবারী উর্দিপরা কারেনিনের দিকে নকশী টুপি দিয়ে দেখিয়ে বৃদ্ধ বললেন। হলের দরজার কাছে কারেনিন দাঁড়িয়ে ছিলেন রাষ্ট্রীয় পরিষদের এক প্রভাবশালী সদস্যের সাথে। ‘তামার পয়সার মত সুখী আর তুষ্ট’, ব্যায়ামবীরের মত দেখতে এক সুপুরুষ কামেরহেরের সাথে করমর্দনের জন্য থেমে তিনি বললেন।
‘না, উনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন’, বললেন কামেরহের।
‘দুর্ভাবনার দরুন। প্রকল্প ছকা ছাড়া এখন তাঁর আর কি আছে? সমস্ত পয়েন্ট বুঝিয়ে না বলা পর্যন্ত উনি ছাড়বেন না বেচারিকে।’
বুড়িয়ে গেছে মানে? সাফল্য লাভ তো করছেন! আমার মনে হয় কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা এখন ঈর্ষা করছেন ওঁর স্ত্রীকে।’
‘কি বলছেন! কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা সম্পর্কে খারাপ কিছু বলবেন না দয়া করে।’
‘উনি যে কারেনিনের প্রেমে পড়েছেন, সেটা কি খারাপ হল?’
‘আচ্ছা, কারেনিনা এখানে, সত্যি নাকি?’
’মানে এখানে, প্রাসাদে নয়, তবে পিটার্সবুর্গে। কাল আলেক্সেই ভ্রন্স্কি আর ওঁর সাথে দেখা হয়েছিল আমার- বাহুলগ্না, বাহুলগ্না মস্কায়া রাস্তায়।’
‘এ লোকটার নেই…’ ফরাসি ভাষায় বলতে শুরু করেছিলেন কামেরহের, কিন্তু জার বংশের একজনকে পথ ছেড়ে দিয়ে অভিবাদন জানাবার জন্য থেমে গেলেন।
এভাবে ওঁরা কারেনিনকে অবিরাম ধিক্কার আর টিটকারি দিয়ে কথা বলে চললেন আর উনি ওদিকে রাষ্ট্রীয় পরিষদের সদস্যকে পাকড়াও করে তাঁর জন্য পথ না ছেড়ে দিয়ে এক মিনিটও না থেমে, উনি যাতে ফসকে না যান তার জন্য আর্থিক প্রকল্পটির প্রতি পয়েন্ট বোঝাতে থাকলেন তাঁকে।
স্ত্রী যখন কারেনিনকে ছেড়ে যান, ঠিক সেই সময়েই ঘটে চাকুরে লোকের কাছে সবচেয়ে যা দুঃখজনক সেই ঘটনাটি—উদীয়মান ভাগ্যের অবসান। অবসানটা ঘটল এবং সবাই পরিষ্কার তা দেখতে পাচ্ছিল, কিন্তু কারেনিন নিচে সজ্ঞান ছিলেন না যে তাঁর উন্নতি থেমে গেছে। স্ত্রেমভের সাথে সংঘাত, নাকি স্ত্রীর ব্যাপারে তাঁর দুর্ভাগ্য অথবা তাঁর যা নির্বন্ধ ছিল সে সীমায় তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন কিনা, যে কারণেই হোক, এ বছর সবার কাছেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে তাঁর চাকরি জীবনে ইতি পড়েছে। তখনও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী, বহু কমিশন ও কমিটির সদস্য, কিন্তু তিনি তখন ফুরিয়ে যাওয়া মানুষ, কেউ তাঁর কাছ থেকে কোন প্রত্যাশা রাখে না। যাই তিনি বলুন, যে প্রস্তাবই তিনি দিন, লোকে তাঁর কথা শুনতো এমনভাবে যেন তিনি যা বলছেন তা অনেকদিন থেকেই সবার জানা এবং সেটি ঠিক তাই যা নিষ্প্রয়োজন।
কিন্তু কারেনিন এটা অনুভব করতেন না, বরং উল্টো : সরকারি ক্রিয়াকলাপে সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে অপসারিত হবার পর অন্যের কাজকর্মে ভুলচুক তাঁর চোখে পড়তে লাগল আগের চেয়েও বেশি স্পষ্ট করে, এবং তা সংশোধনের উপায় নির্দেশ করা তাঁর কর্তব্য বলে গণ্য করলেন। স্ত্রীর সাথে তাঁর বিচ্ছেদের কিছু পরেই তিনি লিখতে শুরু করেন নতুন আদালত সম্পর্কে রিপোর্ট, প্রশাসনের সমস্ত শাখা নিয়ে অসংখ্য যেসব নিষ্প্রয়োজন রিপোর্ট লেখা তাঁর কপালে ছিল, এটি তার প্রথম।
চাকুরির জগতে তাঁর নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিটা কারেনিন শুধু যে খেয়াল করলেন না তাই নয়, তার জন্য তাঁর কোন বেদনা হল না তাই নয়, নিজের কাজকর্মে এত তুষ্ট তিনি আর কখনো বোধ করেননি।
