স্বামীর প্রণয়িনী হওয়ায় কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা ক্ষান্তি দিয়েছিলেন অনেকদিন, কিন্তু সেই থেকে কারো একজনের প্রণয়িনী হয়ে থাকতে তাঁর ককনো আটকায়নি। হঠাৎ তিনি ভালোবেসে ফেলতেন একসাথে একাধিক লোককে, নারী পুরুষ উভয়কেই। যাঁর কিছু-একটা বৈশিষ্ট্য আছে এমন প্রায় সকলেরই প্রেমে পড়েছেন তিনি। জার বংশের সাথে আত্মীয়তা আছে এমন প্রতিটি প্রিন্সেস ও প্রিন্সকে তিনি ভালোবেসেছেন, রুশ গির্জার একজন মেট্রোপলিটান, একজন ভিকার এবং একজন পুরোহিতের প্রেমে পড়েছেন; একজন সাংবাদিক, তিনজন মন্ত্রী, একজন ডাক্তার, একজন ইংরেজ মিশনারি আর কারেনিনকে। কখনো ক্ষীণ, কখনো প্রবল এসব ভালোবাসায় অতি সুবিস্তৃত ও জটিল দরবারী ও সামাজিক সম্পর্কে পাততে তাঁর বাধা হয়নি। কিন্তু কারেনিনের দুর্ভাগ্যের পর, যখন থেকে তিনি তাঁকে তাঁর নিজের বিশেষ রক্ষণাধীনে নেন, যখন থেকে তিনি তাঁর মঙ্গলার্থে তাঁর সংসারে খাটতে থাকেন, তখন থেকে তাঁর মনে হতে লাগল যে অন্য সমস্ত ভালোবাসা সাঁচ্চা নয়, সত্যি করে তিনি ভালোবাসেন এক কারেনিনকে। তাঁর প্রতি তাঁর এখনকার যে হৃদয়াবেগ, সেটা মনে হল আগেকার সমস্ত হৃদয়াবেগের চেয়ে প্রবল। নিজের হৃদয়াবেগের বিশ্লেষণ এবং পূর্বেকারগুলির সাথে তুলনা থেকে তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন যে জারের জীবন রক্ষা না করলে কমিসারভের প্রেমে তিনি পড়তেন না, নিখিল স্লাভ প্রশ্ন না উঠলে তিনি প্রেমে পড়তেন না রিস্তিচ-কুজিৎস্কির সাথে, কিন্তু কারেনিনকে তিনি ভালোবেসেছেন তাঁর নিজের জন্যই, তাঁর সমুন্নত দুর্বোধ্য প্রাণ, তাঁর কাছে মধুর তাঁর সরু কণ্ঠস্বর, প্রলম্বিত বাগভঙ্গি, তাঁর ক্লান্ত দৃষ্টি, তাঁর চরিত্র, তাঁর ফুলো ফুলো শিরায় ভরা নরম সাদা হাতের জন্যই। তাঁর সাথে দেখা হলে শুধু আনন্দই হত না তাঁর, কি প্রভাব তিনি ফেলছেন তার লক্ষণ তিনি খুঁজতেন কারেনিনের মুখভাবে। তাঁকে কারেনিনের মনে ধরুক, এটা তিনি চাইতেন শুধু কথা কয়ে নয়, সর্ব সত্তা দিয়ে। ওঁর জন্য তিনি এখন নিজের প্রসাধন নিয়ে যত ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, তা আগে আর কখনো হননি। ওঁর যদি স্বামী না থাকত আর কারেনিন ঘরে ঢুকলে উদ্বেল হৃদয়ে তিনি লাল হয়ে উঠতেন, কারেনিন তাঁকে মনোরম কিছু বললে উল্লাসের হাসি তিনি দমন করতে পারতেন না।
কয়েক দিন ধরে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা আছেন প্রবল উত্তেজনার মধ্যে। তিনি জানতে পেরেছেন যে আন্না আর ভ্রন্স্কি রয়েছেন পিটার্সবুর্গে। আন্নার সাথে সাক্ষাৎ থেকে বাঁচাতে হবে কারেনিনকে, কষ্টকর এই জ্ঞানটা থেকেও তাঁকে বাঁচাতে হবে যে ভয়াবহ ওই নারীটা রয়েছে তাঁর সাথে একই শহরে আর যে কোন মুহূর্তে ওঁর সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে তাঁর।
নিচের পরিচিতদের মারফত লিদিয়া ইভানোভনা খবর নিলেন কি মতলব এই জঘন্য লোকগুলোয় (আন্না আর ভ্রন্স্কিকে তিনি এই বলেই অভিহিত করতেন), এবং ওঁদের সাথে যাতে দেখা না হয় তার জন্য এই দিনগুলোয় নিজের বন্ধুর সমস্ত গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেন। ভ্রন্স্কির বন্ধু তরুণ অ্যাডজুট্যান্ট, যার মারফত তিনি খবর জোগাড় করেছিলেন এবং কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার কৃপায় যে একটা পারমিট পাবার আশা করছিল সে জানাল যে ওঁদের কাজকর্ম মিটে গেছে, চলে যাবেন পরের দিন। লিদিয়া ইভানোভনা শান্ত হয়ে আসছিলেন, এমন সময় পরের দিন সকালে তাঁকে একটা চিঠি দেওয়া হল সভয়ে যার হস্তাক্ষর চিনতে পারলেন তিনি। এটা আন্না কারেনিনার হস্তাক্ষর। প্রিন্টের মত পুরু মোটা কাগজে খামটা বানানো, লম্বাটে হলুদ কাগজে বিশাল এক মনোগ্রাম, চিঠি থেকে মিষ্টি গন্ধ ছাছিল।
‘কে আনলে এটা?’
‘হোটেলের একজন লোক।’
চিঠিটা পড়ার জন্য কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা সুস্থির হয়ে বসতে পারলেন না অনেকক্ষণ। উত্তেজনায় হাঁপের টান ধরল তাঁর, এ রোগটায় তিনি ভোগেন। যখন শান্ত হলেন, ফরাসি ভাষায় লেখা নিচের এই চিঠিটা পড়লেন তিনি
মান্যবরা কাউন্টেস,
খ্রিস্টীয় যে অনুভূতিতে আপনার হৃদয় পূর্ণ, তাতে আপনার কাছে চিঠি লেখার, আমার বিশ্বাস, অমার্জনীয় দুঃসাহস পাচ্ছি আমি। ছেলের সাথে বিচ্ছেদে আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমি চলে যাবার আগে ওকে অন্তত একবার দেখার অনুমতি ভিক্ষা করছি। আমার কথা আপনার মনে পড়িয়ে দিলাম বলে মাপ করবেন। আমি কারেনিনের কাছে নয়, আপনার কাছেই লিখছি শুধু এই জন্য যে নিজের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মহানুভব ওই মানুষটাকে কষ্ট দিতে চাই না আমি। ওঁর প্রতি আপনার বন্ধুত্বের কথা আমি জানি, তাই আমাকে আপনি বুঝবেন। সেরিওজাকে কি আমার কাছে পাঠাবেন, নাকি-একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমিই বাড়ি যাব, অথবা আপনি জানাবেন বাড়ির বাইরে কোথায় এবং কখন ওর সাথে দেখা করতে পারি? যাঁর ওপর এটা নির্ভর করছে তাঁর মহানুভবতা জানা থাকায় আমি আশা করছি না যে এতে আপত্তি হবে। আপনি কল্পনা করতে পারবেন না কি আকুলতা বোধ করছি ওকে দেখার জন্য, তাই আপনার সাহায্য আমার মধ্যে কি কৃতজ্ঞতা জাগাবে সেটাও কল্পনা করতে পারবেন না আপনি।
আন্না’
চিঠির সব কিছুতে, তার বক্তব্য, মহানুভবতার ইঙ্গিত, বিশেষ করে তার সুর, যেটা তাঁর মনে হল বেহায়া গোছের—সব কিছুতেই পিত্তি জ্বলে গেল কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার
