বিলটার কথা বলবেন ভাবছিলাম কারেনিন, কিন্তু গলা তাঁর কেঁপে গেল, থেমে গেলেন তিনি। নীল কাগজে টুপি আর ফিতের জন্য এই বিলটার কতা তিনি ভাবতে পারছিলেন না আত্মরুণা বোধ না করে।
‘আমি বুঝতে পারছি, বন্ধু আমার’, কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা বললেন, ‘সবই আমি বুঝতে পারছি। আমার কাছে থেকে সাহায্য আর সান্ত্বনা আপনি পাবেন না। তাহলেও এলাম শুধু পারলে আপনাকে সাহায্য করার জন্য। হীন করে তোলা ছোট ছোট এসব ঝামেলা থেকে যদি রেহাই দিতে পারতাম আপনাকে… আমি বুঝতে পারছি যে নারীর মুখের কথা, নারীর হুকুম দরকার। আপনি সে ভার দেবেন আমাকে?
নীরবে, কৃতজ্ঞচিত্তে কারেনিন ওঁর হাতে চাপ দিলেন।
‘আপনি আমি দুজনে সেরিওজার দেখাশোনা করব। সাংসারিক ব্যাপারে আমি দুরস্ত নই। তাহলেও ভার নিচ্ছি, আমি হব আপনার ভাণ্ডারিণী। ধন্যবাদ দিতে হবে না। এটা তো করছি আমি নিজে নয়…’
‘ধন্যবাদ না দিয়ে যে পারি না।’
‘কিন্তু বন্ধু আমার, ওই যে মনোভাবটার কথা বললেন ওতে গা ভাসাবেন না। খ্রিস্ট ধর্মের দিক থেকে যে জিনিসটা সবচেয়ে মহনীয় তার জন্য আবার লজ্জা কি। যে নিজেকে নিচু করে, সে ওপরে ওঠে। আর আমাকে ধন্যবাদও দিতে পারেন না আপনি। ধন্যবাদ দিতে হয় ওঁকে, সাহায্য চান ওঁর কাছে। শুধু ওঁর কাছ থেকেই আমরা পাব শান্তি, সান্ত্বনা, ত্রাণ এবং প্রেম’, এই বলে তিনি আকাশের দিকে চোখ তুললেন এবং প্রার্থনা করতে লাগলেন, কারেনিন সেটা অনুমান করলেন তাঁর নীরবতা থেকে।
কারেনিন শুনছিলেন তাঁর কথা। তাঁর যে উক্তিগুলো আগে বিশ্রী না হলেও অন্তত অনাবশ্যক মনে হত, সেগুলো এখন মনে হল স্বাভাবিক, সান্ত্বনাদায়ক। নতুন এই তুরীয় প্রেরণাটা ভালোবাসতেন না কারেনিন। তিনি ছিলেন ধর্মবিশ্বাসী লোক, কিন্তু ধর্মে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রধানত রাজনৈতিক অর্থে, আর নতুন যে মতবাদটা কিছু কিছু ভিন্ন ব্যাখার সুযোগ দিচ্ছে, তা তর্ক ও বিশ্লেষণের পথ করে দিচ্ছে বলেই নীতির দিক থেকে তাঁর বিরাগ উদ্রেক করত। নতুন এই মতবাদটা সম্পর্কে আগে তিনি ছিলেন নিরুত্তাপ, এমন কি শত্রুভাবাপন্নই। কিন্তু কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা এই নিয়ে মেতে উঠলে তিনি কখনো তর্ক করেননি তাঁর সাথে, প্রাণপণে চেষ্টা করতে নীরবতায় তাঁর চ্যালেঞ্জগুলো এড়িয়ে যেতে। এখন কিন্তু এই প্রথম তাঁর কথা শুনেছিলেন তৃপ্তির সাথে, মনের মধ্যে কোন প্ৰতিবাদ উঠছিল না তাঁর।
‘আপনার কাজ আর কথা দুইয়ের জন্যই আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ’, ওঁর প্রার্থনা শেষ হতে বললেন কারেনিন।
কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা আরো একবার বন্ধুর দুই হাতে চাপ দিলেন।
‘এবার আমি কাজে নামছি’, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অবশিষ্ট অশ্রুটুকু মুখ থেকে মুছে তিনি বললেন হেসে, ‘আমি যাচ্ছি সেরিওজার কাছে। শুধু চূড়ান্ত ক্ষেত্রেই আপনার দ্বারস্থ হব’, এই বলে তিনি উঠে চলে গেলেন।
কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা সেরিওজার কামরায় গিয়ে চোখের পানিতে ভীত ছেলেটির গাল ভিজিয়ে দিয়ে বললেন যে তার বাবা সাধু পুরুষ আর তার মা মারা গেছেন।
নিজের প্রতিশ্রুতি পালন করলেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা। সত্যিই তিনি কারেনিনের সংসারের সুব্যবস্থা করা ও তা চালানোর ভার নিলেন। তবে তিনি যে বলেছিলেন, সাংসারিক ব্যাপারে তিনি দুরস্ত নন, সেটা কিন্তু অত্যুক্তি ছিল না। তাঁর সমস্ত হুকুম পালটাতে হচ্ছিল, কেননা সেগুলো অপালনীয়, আর পালটাচ্ছিল কারেনিনের পোশাক – বরদার কর্নেই। সকলের অলক্ষ্যে সে এখন কারেনিন সংসার চালাতে লাগল এবং পোশাক পরাবার সময় শান্তভাবে সাবধানে তাঁকে জানাতো কি দরকার। তাহলেও লিদিয়া ইভানোভনার সাহায্য কার্যকরী হয়েছিল খুবই : কারেনিনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় তাঁকে একটা নৈতিক অবলম্বন যোগালেন তিনি এবং বিশেষ করে যা ভাবতে তাঁর ভালো লাগত, তাঁকে প্রায় খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করে ফেললেন, অর্থাৎ উদাসীন ও অলস এক ধর্মবিশ্বাসীতে তিনি প্রায় পরিণত করলেন নতুন ব্যাখ্যার সেই মতবাদটার দৃঢ় ও প্রচণ্ড এক ভক্ততে যার হাওয়া তখন এসেছিল পিটার্সবুর্গে। কারেনিনের প্রত্যয় জাগানো ছিল সহজ। লিদিয়া ইভানোভনা এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি যারা গ্রহণ করেছে তেমন অন্যান্য সব লোকের মত কারেনিনের কল্পনার কোন গভীরতা, মননের যে শক্তিতে কল্পনা থেকে উদ্ভূত ধ্যান-ধারণাগুলি হয়ে দাঁড়ায় এমন বাস্তব যে অন্যান্য ধারণা ও বাস্তবতার সাথে তা সমন্বয় দাবি করে, সেটা তাঁর আদৌ ছিল না। মৃত্যু যে আছে শুধু অবিশ্বাসীদের জন্য, তাঁর জন্য নয়, এবং তিনি যেহেতু ধর্মে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী, আর বিশ্বাস কতটা তার বিচারকর্তা তিনি নিজে, সেহেতু তাঁর প্রাণে কোন পাপ নেই এবং এখানে, এই ইহলোকেই তিনি যে ত্রাণ পেয়ে গেছেন, এ ভাবনায় তিনি অসম্ভব বা অকল্পনীয় কিছু দেখলেন না।
নিজের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে তাঁর এই ধারণাটা যে আসছে অতি অনায়াসে এবং তা ভ্রান্ত, সেটা ঝাপসাভাবে কারেনিন যে অনুভব করতেন তা ঠিক; তিনি জানতেন যে তাঁর ক্ষমাটা কোন উচ্চ শক্তির ক্রিয়া কিনা তা না ভেবেই তিনি যখন ঐ অকপট অনুভূতিটায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন তখন তিনি সুখ পেয়েছিলেন এখনকার চেয়ে বেশি, যখন প্রতি মুহূর্তে তিনি ভাবছেন যে প্রাণে বাস করছে খ্রিস্ট, কাগজপত্রগুলো সই করে তিনি তাঁর ইচ্ছাই পালন করছেন, তবে কারেনিনের পক্ষে এই রকমটা ভাবা ছিল খুবই আবশ্যক, নিজের হীনতায় তাঁর পক্ষে প্রয়োজন ছিল কল্পিত হলেও এমন একটা উচ্চতা লাভ করা যেখান থেকে সকলের কাছে ঘৃণিত তিনি অন্যদের ঘৃণা করতে পারবেন, ত্রাণ হিসেবে তিনি আঁকড়ে রইলেন নিজের কল্পিত ত্রাণটাকে।
তেইশ
অধ্যাত্মানন্দে আকুল এক বালিকা কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার বিয়ে দেওয়া হয় খুব অল্প বয়সে, ধনী উচ্চবংশীয়, ভালোমানুষ এবং লম্পট এক ফুর্তিবাজের সাথে। দ্বিতীয মাসেই স্বামী তাঁকে ত্যাগ করেন এবং তাঁর হৃদয়াবেগের উচ্ছ্বসিত বিবরণের জবাব দেন উপহাসে এমন কি বিদ্বেষভরেই। যাঁরা জানতেন যে কাউন্ট ভালোমানুষ এবং লিদিয়ার আধ্যাত্মিক আকুলতায় খারাপ কিছু দেখতেন না, তাঁদের কাছে এটা দুর্বোধ্য ঠেকেছিল। বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও সেই থেকে ওঁরা বাস করছেন পৃথক হয়ে এবং স্ত্রীর সাথে দেখা হলে স্বামী অবধারিতরূপেই বিষাক্ত বিদ্রূপ করতেন, যার কারণ বোঝা যেত না।
