তাঁর কর্মাধ্যক্ষ মিখাইল বাসিলিয়েভিচ স্লিউদিন একজন সহজ, বুদ্ধিমান, সহৃদয় ও নীতিনিষ্ঠ লোক, তাঁর জন্য লোকটির কিছু দুর্বলতা আছে বলে কারেনিন টের পেতেন; কিন্তু চাকরির পাঁচ বছর কাজকর্মের ফলে তাঁদের মধ্যে প্রাণ খোলা আলাপের পথে বাধার সৃষ্টি হয়।
কাগজগুলো সই করে কারেনিন মিখাইল ভাসিলিয়েভিচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ, কথা বলার চেষ্টা করলেন কয়েকবার, কিন্তু পারলেন না। বাক্যটা তিনি তৈরি করেও রেখেছিলেন : ‘আমার দুর্ভাগ্যের কথা শুনেছেন আপনি?’ কিন্তু শেষ করলেন বরাবরের মত এই বলে যে : ‘তাহলে এটা আমার জন্য তৈরি করে রাখবেন’, এবং ছেড়ে দিলেন তাঁকে।
দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন ডাক্তার। তিনিও তাঁর প্রতি সুপ্রসন্ন; কিন্তু বহুদিন হল দুজনের মধ্যে একটা নীরব স্বীকৃতি দেখা দিয়েছে যে দুজনেই কাজে ভারি ব্যস্ত, দুজনেরই তাড়া আছে।
নিজের নারী বন্ধুদের কথা, তাদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার কথা কারেনিন ভাবেননি। সমস্ত নারীই স্রেফ নারী বলেই তাঁর কাছে ভয়াবহ আর বিরক্তিকর লাগত।
বাইশ
কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার কথা ভুলে গিয়েছিলেন আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন, কিন্তু তিনি ভোলেননি তাঁকে। নিঃসঙ্গ হতাশার অতি দুঃসহ এই মুহূর্তেই তিনি এলেন তাঁর কাছে এবং কোনরকম জানানি না দিয়ে ঢুকলেন তাঁর স্টাডিতে। দুই হাতে মাথা রেখে যে অবস্থায় তিনি বসেছিলেন, সেই অবস্থাতেই তাঁকে দেখলেন কাউন্টেস।
‘নিষেধ অমান্য করলাম’, দ্রুত পদক্ষেপে এবং বিচলিত হৃদয় ও দ্রুততার জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে ফরাসি ভাষায় বললেন তিনি, ‘আমি সব শুনেছি, কারেনিন, বন্ধু আমার!’ দুই হাতে শক্ত করে ওঁর হাতে চাপ দিয়ে নিজের সুন্দর ভাবালু দৃষ্টি ওঁর চোখে নিবদ্ধ রেখে বলে চললেন তিনি।
ভুরু কুঁচকে উঠে দাঁড়ালেন কারেনিন, নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে চেয়ার এগিয়ে দিলেন তাঁর দিকে।
‘বসবেন না কাউন্টেস? আমি কারো সাথে দেখা করছি না কারণ আমি অসুস্থ, কাউন্টেস’, উনি বললেন, ঠোঁট ওঁর কাঁপছিল।
‘বন্ধু আমার।’ তাঁর ওপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে পুনরুক্তি করলেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা। হঠাৎ ভুরু তাঁর জোড়ের জায়গায় উঁচু হয়ে উঠে একটা ত্রিভুজ গড়ে তুলল কপালে; কাউন্টেসের অসুন্দর হলদেটে মুখখানা হয়ে উঠল আরো অসুন্দর; কিন্তু কারেনিন টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর জন্য কষ্ট হচ্ছে তাঁর, কেঁদেও ফেলবেন বুঝি। মন ভিজে উঠল তাঁর; কাউন্টেসের মুটকো হাতখানা নিয়ে চুমু খেতে লাগলেন তিনি।
‘বন্ধু আমার!’ ব্যাকুলতায় ভাঙা ভাঙা কণ্ঠস্বরে বললেন কাউন্টেস, ‘দুঃখে ভেঙে পড়া আপনার উচিত নয়। আপনার দুঃখটা খুবই বেশি, কিন্তু সান্ত্বনা পেতে হবে আপনাকে।’
‘আমি ভেঙে পড়েছি, মারা গেছি, আমি আর মানুষ নই’, ওঁর হাত ছেড়ে দিয়ে বললেন কারেনিন, তাকিয়েই রইলেন ওঁর সজল চোখের দিকে। ‘আমার অবস্থাটা সাংঘাতিক, কারণ কোথাও, এমন কি নিজের মধ্যেও আমি কোন নির্ভরস্থল দেখতে পাচ্ছি না।’
‘নির্ভরস্থল আপনি পাবেন, তার খোঁজ করুন, তবে আমার মধ্যে খুঁজবেন না, যদিও আমার বন্ধুত্বে বিশ্বাস রাখতে আপনাকে’, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন উনি। ‘আমাদের নির্ভরস্থল হল প্রেম, সেই প্রেম যার উত্তরাধিকার তিনি দিয়ে গেছেন আমাদের; তাঁর বোঝা হালকা’, তিনি বললেন সেই তুরীয় দৃষ্টি মেলে যা কারেনিনের খুবই পরিচিত, ‘উনি রক্ষা করবেন আপনাকে, সাহায্য করবেন।’
কথাগুলোর মধ্যে নিজের মহত্ত্বের জন্য একটা মমতা আর কারেনিনের কাছে যা বাড়াবাড়ি বলে মনে হয় এবং পিটার্সবুর্গে সম্প্রতি যে নতুন তুরীয় অতীন্দ্রিয় মনোভাবের চল হয়েছে তা থাকলেও কথাগুলো শুনতে এখন ভালো লাগল কারেনিনের।
‘আমি দুর্বল। আমি ধ্বংসপ্রাপ্ত। কিছুই আমি আগে থেকে দেখতে পাইনি আর এখন বুঝতে পারছি না কিছুই।’
‘বন্ধু আমার—’ পুনরুক্তি করলেন লিদিয়া ইভানোভনা।
‘এখন যেটা নেই সেটা আমি হারাচ্ছি না, ও কথা নয়’, বলে গেলেন কারেনিন, ‘ও নিয়ে আমার কোন খেদ নেই। কিন্তু আমি যে অবস্থায় পড়েছি তাতে লোকের কাছে মুখ দেখানো ভার। এটা খারাপ, কিন্তু আমি পারছি না, পারছি না।’
‘ক্ষমা করার মহৎ যে কাজটা নিয়ে আমি এবং সবাই উচ্ছ্বসিত সেটা আপনি করেছেন তা নয়, আপনার বুকের মধ্যে যিনি আশ্রয় নিয়েছেন তিনি সেটা করেছেন’, তুরীয় উল্লাসে চোখ তুলে বললেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা, ‘তাই নিজের আচরণের জন্য আপনার লজ্জার কিছু নেই।’
ভুরু কুঁচকে হাত ঘুটিয়ে আঙুল মটকাতে লাগলেন আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন।
সরু গলায় তিনি বললেন, ‘সমস্ত খুঁটিনাটি আপনার জানা দরকার। মানুষের শক্তির একটা সীমা আছে কাউন্টেস, আমি সেই সীমায় পৌঁছেছি। সারা দিন আজ আমাকে হুকুম দিতে হয়েছে, আমার নতুন একাকী অবস্থা থেকে যা আসছে’ (‘যা আসছে’ কথাটার ওপর তিনি জোর দিলেন) ‘সেই হুকুম দিতে হয়েছে সংসার নিয়ে। চাকর, গৃহশিক্ষিকা, বিল… ছোট এই আগুনটা আমাকে দগ্ধে মারছে। টিকে থাকার শক্তি আমার আর নেই। ডিনারে… কাল সন্ধ্যায় ডিনার ছেড়ে প্রায় চলে যাচ্ছিলাম আর কি। ছেলে আমার দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিল, তা সইতে পারছিলাম না আমি। এসবের মানে কি সেটা সে জিজ্ঞেস করেনি আমাকে, তবে জিজ্ঞেস করতে চাইছিল, আর সে দৃষ্টি আমি সইতে পারছিলাম না। আমার দিকে তাকাতে সে ভয় পাচ্ছিল, তবে এটুকুই সব নয়…’
