স্ত্রী চলে যাবার পর প্রথম দু’দিন কারেনিন উমেদারদের ও কর্মাধ্যক্ষের সাথে কথা বলেছেন, কমিটিতে যেতেন, এবং সচরাচরের মতই বেরোতেন ক্যান্টিনে খাবার জন্য। কেন এটা করছেন সে সম্পর্কে সচেতন না থেকেই এই দুই দিন তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছেন একটা শান্ত, এমন কি নির্বিকার ভাবই বজায় রাখার জন্য। আন্না আর্কাদিয়েভনার ঘর আর জিনিসপত্রের কি ব্যবস্থা হবে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন একটা লোকের ভাব নেবার জন্য প্রাণপণ করেছেন যার কাছে যা ঘটল সেটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়, একসার সাধারণ ঘটনার কাঠামো তা ছাড়ায় না, এবং এটা তিনি করতে পেরেছিলেন, কেউ তাঁর মধ্যে হতাশার কোন লক্ষণ দেখতে পায়নি। কিন্তু আন্না চলে যাবার দ্বিতীয় দিন যখন কর্নেই ফ্যাশনেবল দোকানের বিল, আন্না যা শোধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন, তাঁকে দিয়ে জানাল যে দোকানের লোকটি এখানে আছে, কারেনিন বললেন লোকটাকে ডাকতে।
‘মাপ করবেন হুজুর, যে আপনাকে বিরক্ত করার অপরাধ করেছি, কিন্তু যদি বলেন, হুজুরানির কাছে পাঠাতে, তাহলে কৃপা করে ওঁর ঠিকানাটা যদি দেন…
লোকটির মনে হয়েছিল কারেনিন কি যেন ভাবছেন, কিন্তু হঠাৎ তিনি ঘুরে গিয়ে টেবিলে বসলেন। হাসের ওপর মাথা ভর দিয়ে অনেকক্ষণ তিনি ওই অবস্থায় বসে রইলেন, কি যেন বলবার চেষ্টা করলেন কয়েকবার, কিন্তু থেমে গেলেন।
কর্তার ভাবাবেগ বুঝতে পেরে কর্নেই দোকানের লোকটিকে বললেন অন্য দিন আসতে। আবার একা হয়ে কারেনিন টের পেলেন যে দৃঢ়তা ও প্রশান্তির ভূমিকা চালিয়ে যাবার শক্তি তাঁর আর নেই। অপেক্ষমাণ গাড়িটিকে চলে যাবার হুকুম দিয়ে তিনি বললেন কারো সাথে তিনি আজ সাক্ষাৎ করবেন না, খেতেও গেলেন না তিনি।
তিনি অনুভব করলেন দোকানের এই লোকটি, কর্নেই, এবং এই দুই দিনে যাদের সাথেই তাঁর দেখা হয়েছে বিনা ব্যতিক্রমে তাদের সবার মুখে যে ঘৃণা ও নিষ্ঠুরতা তিনি পরিষ্কার দেখেছেন তার সর্বাত্মক চাপ সহ্য করার সাধ্য নেই তাঁর। তিনি অনুভব করছিলেন লোকদের এই আক্রোশ থেকে আত্মরক্ষা করতে তিনি অক্ষম, কেননা আক্রোশটা আসছে এই জন্য নয় যে তিনি খারাপ লোক (তাহলে ভালো হবার চেষ্টা করতে পারতেন তিনি), আসছে এই থেকে যে উনি লজ্জাকররূপে জঘন্যরকমে অসুখী। তিনি জানতেন যে এই জন্যই, বুক তাঁর শরবিদ্ধ বলেই ওরা তাঁর প্রতি নির্মম। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে, যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে যে আহত কুকুরটাকে অন্য কুকুরেরা যেমন করে মেরে ফেলে, তেমনি করেই তাঁকে মেরে ফেলবে ওরা। তিনি জানতেন যে লোকদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় নিজের ক্ষতটা ঢেকে রাখা, এ দু’দিন তিনি অচেতনভাবে সে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু এখন অনুভব করলেন যে এই অসমান সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শক্তি তাঁর আর নেই।
হতাশা তাঁর আরো বেড়ে উঠল এই চেতনায় যে নিজের দুঃখে তিনি একেবারে একা। যাকে তিনি বলতে পারেন কি সহ্য করতে তাঁকে হয়েছে, উচ্চ রাজপুরুষ হিসেবে, উঁচু সমাজের লোক হিসেবে নয়, আর্ত মানুষ বলে তাঁর জন্য যে কষ্ট বোধ করবে এমন লোক শুধু পিটার্সবুর্গেই ছিল না তাই নয়; এমন লোক তাঁর কোথাওই ছিল না।
কারেনিন বেড়ে উঠেছিলেন অনাথ অবস্থায়। দুই ভাই ওঁরা। পিতাকে তাঁদের মনেই পড়ে না। মা মারা যান যখন কারেনিনের দশ বছর বয়স। বিষয়-আশয় তেমন ছিল না, তাঁদের মানুষ করেন কারেনিনের চাচা, বড় রকমের রাজপুরুষ, একদা প্রয়াত সম্রাটের প্রিয়পাত্র।
স্বর্ণপদক পেয়ে জিমনাসিয়াম আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স শেষ করে কারেনিন চাচার সাহায্যে তখনি বড় চাকরির পদ ধরেন এবং সেই থেকে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন চাকরি ক্ষেত্রের উচ্চাভিলাষে। জিমনাসিয়াম, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে কর্মক্ষেত্রে, কোথাও কারেনিন কারো সাথে বন্ধুত্ব করেননি। বড় ভাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে আপন জন, কিন্তু তিনি কাজ করতেন বৈদেশিক মন্ত্রিদপ্তরে, প্রায় সব সময় থাকতেন বিদেশে এবং সেখানেই মারা যান কারেনিনের বিবাহের কিছু পরেই।
যখন তিনি একটি গুবের্নিয়ায় রাজ্যপাল হিসেবে কাজ করছেন, তখন আন্নার ফুফু, মফস্বলের এক ধনী অভিজাত তাঁর ভাইঝির সাথে তখন আর যুবক না হলেও নবীন রাজ্যপালটির বিয়ে দেবার চেষ্টা করেন এবং তাঁকে এমন অবস্থায় এনে ফেলেন যে ওঁকে হয় পাণিপ্রার্থনা করতে হয়, নয় চলে যেতে হয় শহর ছেড়ে। বহু দ্বিধা করেছিলেন আলেকসেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন। এ পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে যত যুক্তি ছিল, বিপক্ষেও ততটাই, এবং এমন চূড়ান্ত যুক্তি কিছু ছিল না যাতে তিনি বাধ্য হন তাঁর এই নীতি পালটাতে : সন্দেহ থাকলে ক্ষান্ত থেকো; কিন্তু আন্নার ফুফু জনৈক পরিচিত মারফত তাঁর মনে এই বিশ্বাস জাগান যে উনি বালিকাটিকে অপদস্থ করেছেন, নিজের সম্মান রাখতে হলে তাঁর উচিত পাণিপ্রার্থনা করা। পাণিপ্রার্থনাই তিনি করলেন এবং যে ভাবাকুলতা তাঁর পক্ষে সম্ভব তা সবই ঢাললেন পাত্রী এবং স্ত্রীর ওপর।
আন্নার জন্য তাঁর যে টান হয়েছিল তাতে তাঁর প্রাণের মধ্যে অন্য লোকের সাথে হৃদ্যতার শেষ চাহিদাটুকুও নাকচ হয়ে যায়। আর এখন তাঁর পরিচিতদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বলতে নেই কেউ। যাকে বলা হয় যোগাযোগ তেমন ছিল অনেকই; কিন্তু বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল না। এমন লোক কারেনিনের অনেকেই ছিলেন যাঁদের তিনি খেতে ডাকতে, তাঁর দরকারি কোন ব্যাপারে অংশ নেবার অনুরোধ করতে পারতেন, পৃষ্ঠপোষকতা করতে চাইতেন কোন উমেদারের, অন্যান্য ব্যক্তি এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহার নিয়ে খোলাখুলি আলাপ করতে পারতেন অনেকের সাথে; কিন্তু এসব লোকদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল রীতিনীতি আর অভ্যাসাদি দ্বারা অতি সুনির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ, তা থেকে বেরিয়ে আসা ছিল অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সতীর্থ ছিল, যাঁর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল, নিজের ব্যক্তিগত দুঃখের কথা তাঁকে তিনি বলতে পারতেন; কিন্তু বন্ধুটি সুদূরের এক মফস্বলে বিদ্যালয় পরিদর্শক। পিটার্সবুর্গে যারা আছে, তাদের মধ্যে সবার চেয়ে নিকট ও সম্ভবপর হতে পারে তাঁর কর্মাধ্যক্ষ এবং ডাক্তার।
