শহরে আসার দশম দিনে অসুস্থ হয়ে পড়ল কিটি। মাথা ধরেছিল, বমি করল, সারা সকাল উঠতে পারল না বিছানা ছেড়ে।
ডাক্তার বলল, অসুখের কারণ ক্লান্তি, অস্থিরতা, মনের শান্তি বজায় রাখার পরামর্শ দিলেন তিনি।
তবে ডিনারের পর কিটি উঠে দাঁড়াল এবং বরাবরের মত সেলাইটা নিয়ে গেল রোগীর কাছে। ঘরে ঢুকতে রোগী কঠোর দৃষ্টিতে চাইলেন তার দিকে, সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বলায় হাসলেন ঘৃণাভরে। সারাটা দিন তিনি নাক ঝাড়লেন আর কাতরাতে লাগলেন করুণ সুরে।
‘কেমন বোধ করছেন?’ কিটি জিজ্ঞেস করল।
‘খারাপ’, বহু কষ্টে বলতে পারলেন উনি, ‘ব্যথা! ‘কোথায় ব্যথা?’
‘সবখানে।’
‘আজ শেষ হয়ে যাবে দেখবেন’, মারিয়া নিকোলায়েভনা বলল যদিও ফিসফিসিয়ে, কিন্তু এমনভাবে যে অতি সজাগ রোগীর (লেভিনের সেটা চোখে পড়েছিল) তা কানে যাবার কথা। মারিয়া নিকোলায়েভনাকে চুপ করার ইঙ্গিত দিয়ে লেভিন চাইলেন রোগীর দিকে। নিকোলাই কথাটা শুনতে পেয়েছিলেন; কিন্তু তাতে কোন প্রতিক্রিয়া হল না তাঁর। দৃষ্টি তাঁর একইরকম ধিক্কারহানা ও তীব্র।
লেভিনের পিছু পিছু মারিয়া নিকোলায়েভনা করিডোরে বেরিয়ে আসতে লেভিন জিজ্ঞেস করলেন তাকে, কেন তা ভাবছেন?’
‘উনি নিজেকে খামচাতে শুরু করেছেন’, বলল মারিয়া নিকোলায়েভনা।
‘খামচানো মানে?’
‘এই রকম’, নিজের উলের পোশাকটার ভাঁজ টেনে ধরে সে বলল। সত্যিই লেভিন লক্ষ করেছিলেন যে সারাটা দিন রোগী নিজেকে খামচেছেন যেন কিছু-একটা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চান।
সঠিকই হয়েছিল মারিয়া নিকোলায়েভনার ভবিষ্যদ্বাণী। রাতের দিকে হাতখানা তোলারও শক্তি রইল না রোগীর। দৃষ্টিতে একটা অপরিবর্তিত মনোযোগী কেন্দ্রীভূত ভাব নিয়ে তিনি তাকিয়ে রইলেন সামনের দিকে। উনি যাতে তাঁদের দেখতে পান সে জন্য লেভিন আর কিটি তাঁর ওপর ঝুঁকে এলেন, তখনো তিনি তাকিয়ে রইলেন একইভাবে। অন্তিম প্রার্থনা পাঠের জন্য যাজক ডেকে পাঠাল কিটি।
যাজক যখন প্রার্থনা পড়ছিলেন, মুমূর্ষুর মধ্যে জীবনের কোন লক্ষণ দেখা গেল না; চোখ ছিল বন্ধ। শয্যাপার্শ্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন লেভিন, কিটি আর মারিয়া নিকোলায়েভনা। পাঠ তখনো শেষ হয়নি, মুমূর্ষু টান-টান হয়ে নিঃশ্বাস ফেলে চোখ মেললেন। পাঠ শেষ করে যাজক তাঁর শীতল কপালে ক্রস ঠেকালেন, তারপর ধীরে ধীরে তা জড়িয়ে রাখলেন স্টোলে এবং নীরবে মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে থেকে ঠাণ্ডা হয়ে আসা রক্তহীন বিশাল হাতখানা ছুঁলেন।
‘মারা গেছে’, বলে যাজক চলে যাবার উপক্রম করলেন। হঠাৎ দেখা গেল মৃতের লেপটে যাওয়া গোঁফ নড়ছে, এবং নীরবতার মধ্যে পরিষ্কার শোনা গেল বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে সুনির্দিষ্ট একটা তীক্ষ্ণ ধ্বনি : ‘পুরো নয়… শিগগিরই।’
এক মিনিট বাদেই মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল গোঁফের নিচে ফোটা হাসিতে এবং যে নারীরা জুটেছিল তারা সযত্নে সাজাতে লাগল তাঁকে।
ভাইয়ের চেহারা আর মৃত্যুর সান্নিধ্য ও অনিবার্যতায় একটা আতংক জাগিয়ে তুলল, শরতের সেই সন্ধ্যায় ভাই তাঁর কাছে এলে যা হয়েছিল। এই অনুভূতিটা এখন আগের চেয়েও বেশি তীব্র; মৃত্যুর অর্থ ধরতে পারা তার কাছে আগের চেয়ে কম সম্ভব বলে বোধ হল; তার অনিবার্যতা আরো ভয়ংকর ঠেকল তাঁর কাছে; কিন্তু এখন স্ত্রী কাছে থাকায় সেটা তাঁকে হতাশায় ঠেলে দেয়নি; মৃত্যু সত্ত্বেও তিনি বেঁচে থাকা ও ভালোবাসার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছিলেন। টের পাচ্ছিলেন যে হতাশা থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছে ভালোবাসা আর হতাশায় পড়ার ভয় থেকে সে ভালোবাসা হয়ে দাঁড়িয়েছে আরো প্রবল ও পূত।
মৃত্যুর যে রহস্যটা অজ্ঞেয় থেকে গেছে, সেটা তাঁর চোখের সামনে ঘটতে না ঘটতেই দেখা দিল সমান অজ্ঞেয় আরেকটা রহস্য যা প্রেম আর জীবনের চ্যালেঞ্জ জানায়।
কিটি সম্পর্কে নিজের অনুমান সমর্থন করলেন ডাক্তার। কিটির অসুস্থতা তার গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ।
একুশ
বেত্সি আর অবলোন্স্কির সাথে কথাবার্তার পর কারেনিন যখন বুঝেছিলেন যে, তাঁর কাছে শুধু এটুকু চাওয়া হচ্ছে যে নিজের উপস্থিতি দিয়ে স্ত্রীকে কষ্টে না ফেলে তাঁকে শান্তিতে রাখা হোক, স্ত্রী নিজেই যেটা চাইছেন, সেই মুহূর্ত থেকে তিনি এত উদ্ভ্রান্ত বোধ করছিলেন যে নিজে কিছু স্থির করতে পারছিলেন না, নিজেই জানতেন না এখন কি তিনি চাইছেন এবং যাঁরা এত আনন্দের সাথে তাঁর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছেন তাঁদের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিজের সম্মতি জানাতে লাগলেন সব কিছুতে। শুধু আন্না যখন বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে এবং ইংরেজ গৃহশিক্ষিকা লোক পাঠালে জানতে সে তাঁর সাথে খাবে, নাকি আলাদা, কেবল তখনই প্রথম তিনি তাঁর অবস্থাটা পুরোপুরি বুঝলেন এবং আতংক হল তাঁর।
তাঁর অবস্থার সবচেয়ে মুশকিল ব্যাপারটা ছিল এই যে নিজের অতীতকে বর্তমানের সাথে মেলাতে, মেনে নিতে তিনি পারছিলেন না। সে অতীতটা তাঁকে বিব্রত করছিল না যখন তিনি সুখে দিন কাটিয়েছেন স্ত্রীর সাথে। সে অতীত থেকে স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপারটা জানতে পারার উৎক্রমণটা তিনি কাটিয়ে উঠেছেন শহীদের মত; সে অবস্থাটা ছিল কষ্টকর কিন্তু তাঁর কাছে বোধগম্য। স্ত্রী যদি তখন তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানাবার পর তাঁকে ত্যাগ করে যেতেন, তাহলে কষ্ট হত তাঁর, নিজেকে দুর্ভাগা মনে হত, কিন্তু এখন তিনি যে অতি নিরুপায়, নিজের কাছেই দুর্বোধ্য একটা অবস্থায় পড়েছেন, সেটা হত না। এখন তিনি নিজের সাম্প্রতিক ক্ষমা, নিজের মমতা, স্ত্রী আর অপরের ঔরসজাত সন্তানটির জন্য তাঁর ভালোবাসাকে মেলাতে পারছিলেন না এখন যা দাঁড়িয়েছে তার সাথে, অর্থাৎ এটার সাথে যে এ সবের পুরস্কার হিসেবেই যেন তিনি এখন হয়ে পড়েছেন একা, কলংকিত, উপহাসাস্পদ, সবার কাছেই নিষ্প্রয়োজন এবং সবার কাছেই ঘৃণিত।
