আরো অনেকক্ষণ তিনি অমনিভাবে পাশে বসে রইলেন শেষের প্রতীক্ষায়। কিন্তু শেষ এল না। দরজা খুলে দেখা দিল কিটি। ওকে ফেরাবার জন্য লেভিন উঠে দাঁড়াতেই শোনা গেল মৃতের নড়াচড়া।
‘যাস নে’, নিকোলাই বললেন হাত বাড়িয়ে দিয়ে। লেভিন সে হাতখানা নিজের হাতে নিয়ে স্ত্রীর উদ্দেশে ক্রদ্ধ ইশারা করলেন চলে যেতে।
মৃতের হাতখানা নিজের হাতে নিয়ে লেভিন বসে রইলেন—আধ ঘণ্টা, এক ঘণ্টা, আরো এক ঘণ্টা। এখন তিনি মৃত্যুর কথা আর আদৌ ভাবছিলেন না। ভাবছিলেন কিটি এখন কি করছে, কে থাকে পাশের কামরায়, ডাক্তারের বাড়িটা কি নিজের। খিদে পাচ্ছিল তাঁর, ঘুম পাচ্ছিল। সন্তর্পণে তিনি হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন, পা টিপে দেখলেন রোগীর। পা ঠাণ্ডা, কিন্তু তখনো নিঃশ্বাস পড়ছে। লেভিন আবার পা টিপে টিপে চলে যেতে চাইছিলেন কিন্তু রোগী পুনরায় নড়েচড়ে উঠে বললেন, ‘যাস নে।’
.
ভোর হল। রোগীর অবস্থা একইরকম। লেভিন ধীরে ধীরে হাত ছাড়িয়ে মৃত্যুপথযাত্রীর দিকে না তাকিয়ে নিজের কামরায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। যখন ঘুম ভাঙল, ভাইয়ের যে মৃত্যুসংবাদের অপেক্ষা করছিলেন তার বদলে শুনলেন যে ভাই আগের অবস্থায় ফিরেছেন। আবার তিনি উঠে বসছেন, কাশছেন, খাচ্ছেন, কথা বলছেন, মৃত্যুর কথা আর বলছেন না, আবার আরোগ্যলাভের আশা করছেন, কিন্তু হয়েছেন আরও খিটখিটে আর মনমরা। ভাই বা কিটি কেউ শান্ত করতে পারলেন না তাঁকে। তিনি রেগে রইলেন সবার ওপর, সবাইকেই অপ্রীতিকর কথা বললেন, নিজের পীড়ার জন্য ভর্ৎসনা করলেন সবাইকে এবং দাবি করলেন তাঁর জন্য মস্কোর খ্যাতনামা ডাক্তার ডাকা হোক। কেমন তিনি বোধ করছেন, এ নিয়ে যত প্রশ্ন তাঁকে করা হল, জবাব দিলেন সেই একই আক্রোশ আর তিরস্কারের সুরে : ‘কষ্ট হচ্ছে ভয়ানক, অসহ্য!’
ক্রমেই কষ্ট বাড়তে লাগল রোগীর, বিশেষ করে শয্যাক্ষতগুলোর জন্য যা আর সারবার নয়। চারপাশের লোকজনদের ওপর ক্রমেই রাগ চড়তে থাকল তাঁর, সব কিছুর জন্যই তিরস্কার করলেন তাঁদের, বিশেষ করে মস্কোর ডাক্তার ডাকা হয়নি বলে। সর্বোপায়ে কিটি চেষ্টা করলে তাঁকে সাহায্য করার, শান্ত করার; কিন্তু সবই বৃথা হল, লেভিন দেখতে পেলেন যে কিটি নিজেই দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে কাহিল হয়ে পড়েছে যদিও সেটা সে স্বীকার করতে চাইছে না। যে রাতে নিকোলাই ভাইকে ডেকেছিলেন, তখন জীবনের কাছ থেকে তাঁর বিদায় নেবার দরুণ সবার মনে যে মৃত্যুচিন্তা জেগেছিল এখন তা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। সবাই জানতেন যে উনি অবশ্য-অবশ্যই এবং শিগগিরই মারা যাবেন, এখনই তিনি অর্ধমৃত। সবাই একটা জিনিসই চাইছিলেন—উনি যেন মারা যান তাড়াতাড়ি, আর সবাই সেটা গোপন রেখে ওষুধ ঢালছিল শিশি থেকে, অন্য ওষুধ আর ডাক্তারের খোঁজ করে তাঁকে, নিজেকে, পরস্পরকে ভুল বুঝ দিচ্ছিল। এ সবই ছিল জঘন্য, অপমানকর, অসৎ কপটতা। আর লেভিনের যা চরিত্র তাতে, তা ছাড়া মুমূর্ষুকে তিনি সবার চাইতে ভালোবাসতেন বলে এই কপটতা তাঁর কাছে মর্মান্তিক লেগেছিল।
সৎ ভাইদের মধ্যে অন্তত মরণের আগে মিটমাট করিয়ে দেবার কথা নিয়ে লেভিন ভাবছিলেন অনেক দিন থেকে। বড় ভাই কজ্নিশেভকে চিঠি লিখেছিলেন তিনি। জবাব পেয়ে লেভিন সেটা পড়ে শোনান রোগীকে। কজ্নিশেভ লিখেছেন যে তিনি নিজে আসতে পারতেন না, তবে মর্মস্পর্শী ভাষায় ক্ষমা চেয়েছেন ভাইয়ের কাছ থেকে।
রোগী কিছু বললেন না।
লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি লিখব ওকে? আশা করি তুমি রাগ করছ না ওর ওপর?
‘উঁহু, একটুও না’, বিষণ্ণভাবে উত্তর দিলেন নিকোলাই, ‘লিখে দে, আমার জন্য যেন ডাক্তার পাঠায়।
কাটল যন্ত্রণার আরো তিন দিন; রোগীর অবস্থা একইরকম। যারাই তাঁকে দেখছিল, সবাই তারা এখন তাঁর মরণ চাইছিল : হোটেলের চাপরাশি, মালিক, হোটেলবাসী, ডাক্তার, মারিয়া নিকোলায়েভনা, লেভিন, কিটি—সবাই। শুধু রোগী এ বাসনা ব্যক্ত করেননি, বরং রাগ করতেন ডাক্তার আনা হয়নি বলে, ওষুধ খেয়ে চললেন, বলতেন বাঁচার কথা। শুধু অবিরাম যন্ত্রণা থেকে আরাম দেবার জন্য আফিং দিলে বিস্মরণের মুহূর্তটার আধো ঘুমে মাঝে মাঝে বলতেন প্রাণের মধ্যে কি তাঁর সবচেয়ে প্রবল : ‘আহ্, একটা শেষ হলেই বাঁচি!’ কিংবা, ‘কবে শেষ হবে!’
যন্ত্রণা ক্রমাগত বেড়ে উঠে তাঁকে প্রস্তুত করল মৃত্যুর জন্য। কষ্ট হবে না এমন একটা অবস্থায় পড়ে থাকা, এমন একটা মুহূর্ত যখন ভুলে থাকা যায়, দেহের এমন একটা প্রত্যঙ্গ যা ব্যথা দিচ্ছে না, যন্ত্রণাকর ঠেকছে না, কিছুই ছিল না। এমন কি এই দেহের স্মৃতি অভিজ্ঞতা ভাবনা, তা নিয়ে চিন্তা এখন ওই দেহটার মতই বিতৃষ্ণা জাগাচ্ছিল। অন্য লোককে দেখা, তাদের কথাবার্তা, নিজের স্মৃতিচারণ—সবই কষ্ট দিচ্ছিল তাঁকে। আশেপাশের লোকে সেটা টের পেত এবং তাঁর সামনে খোলাখুলি ঘোরা, কথা বলা, ইচ্ছাপ্রকাশ থেকে অজ্ঞাতসারে বিরত থাকত। তাঁর সমস্ত জীবন মিলে গিয়েছিল যন্ত্রণার একটা অনুভূতি আর তা থেকে পরিত্রাণের কামনায়।
স্পষ্টতই তাঁর মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটছিল যা তাঁকে শেখাবে তাঁরই ইচ্ছার পরিপূরণ হিসেবে, সুখ হিসেবে মৃত্যুকে দেখতে। আগে যন্ত্রণা থেকে, অথবা ক্ষুধা, ক্লান্তি, তৃষ্ণার মত অভাববোধ থেকে উদ্ভূত তাঁর এক-একটা ইচ্ছা মিটতো দেহ দিয়ে, যাতে তৃপ্তি পাওয়া যেত; কিন্তু এখন অভাববোধ ও যন্ত্রনার উপশম হচ্ছিল না, তা মেটাবার চেষ্টা করতে গেলে দেখা দিতো নতুন যন্ত্রণা। তাই সমস্ত ইচ্ছা মিলে গেল একটায় : সমস্ত যন্ত্রণা এবং তার উৎস দেহটা থেকে অব্যাহতি পাবার ইচ্ছেয়। কিন্তু অব্যাহতি পাবার এ ইচ্ছেটা প্রকাশ করার মত ভাষা ছিল না তাঁর, তাই সে ইচ্ছাটার কথা তিনি বলেননি, শুধু অভ্যাসবশে তাঁর সেই ইচ্ছাগুলো মেটাবার দাবি করতেন যা আর মিটবার নয়। বলতেন : ‘আমাকে ওপাশে কাত করে শোয়াও’, আর তক্ষুনি আবার দাবি করতেন আগে যেমন ছিলেন সেভাবে রাখতে। ‘বুলিয়ন খেতে দাও। নিয়ে যাও বুলিয়ন। কথা বলো, কেন চুপ করে আছ সবাই।’ আর কথা বলতে শুরু করলেই তিনি চোখ বুজে ক্লান্তি, উদাসীনতা আর বিতৃষ্ণার ভাব ফুটিয়ে তুলতেন।
