গাত্রলেপনের পর রোগীর হঠাৎ অনেক ভালো বোধ হল। এক ঘণ্টার মধ্যে একবারও তিনি কাশেননি, হেসেছেন, সাশ্রনয়নে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চুমু খেয়েছেন কিটির হাতে এবং বললেন যে ভালো লাগছে তাঁর, কোথাও ব্যথা করছে না, ক্ষিদে আর শক্তি টের পাচ্ছেন। তাঁর কাছে স্যুপ আনতে তিনি এমন কি নিজে নিজেই উঠে বসলেন, চাইলেন কাটলেট। অবস্থা তাঁর যত নৈরাশ্যজনকই হোক, তাঁর দিকে চাইলেই তিনি যে আর সেরে উঠবেন না সেটা যত সুস্পষ্টরূপেই বোঝা যাক না কেন, এই এক ঘণ্টা লেভিন আর কিটি একই রকম সুখ, আর পাছে বা ভুল হয়—এমন একটা ভীতির দোলায় দুলছিলেন।
‘ভালো বোধ হচ্ছে—হ্যাঁ, অনেক—আশ্চর্য—আশ্চর্যের কিছু নেই—যতই হোক ভালো তো’, হেসে ফিসফিসিয়ে বলাবলি করছিলেন ওঁরা।
বিভ্রমটা বেশিক্ষণ টেকেনি। রোগী শান্তভাবে ঘুমিয়ে পড়েন, কিন্তু আধ ঘণ্টা বাদেই জেগে ওঠেন কাশির দমকে আর হঠাৎ তাঁর চারপাশের লোকদের মধ্যে, তাঁর নিজের মধ্যেও নিবে গেল আশা। যন্ত্রণার বাস্তবতা নিঃসন্দেহে, এমন কি আগেকার আশার স্মৃতিটুকু পর্যন্ত মুছে দিয়ে লেভিন, কিটি, স্বয়ং রোগীরও সব ভরসা গেল।
আধ ঘন্টা আগে কি বিশ্বাস হয়েছিল সেটা স্মরণ করাটাও যেন লজ্জার কথা। রোগী সেটা ভুলে ছেঁদা করা কাগজে মোড়া আইওডিনের শিশি চাইলেন শুঁকবার জন্য। লেভিন বয়ামটা দিলেন, আর গাত্রলেপনের সময় যেমন, তেমনি আকুল আশার একটা দৃষ্টি নিবদ্ধ হল ভাইয়ের ওপর, আইওডিন শোঁকায় যে অলৌকিক কাণ্ড হতে পারে ডাক্তারের এই কথাটার সমর্থন চাইছিলেন ভাইয়ের কাছ থেকে।
‘কি কাতিয়া নেই?’ অনিচ্ছায় লেভিন ডাক্তারের কথাটায় সায় দেবার পর উনি এদিক-ওদিক চেয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, ‘নেই, তাহলে বলা যায়… ওর জন্যই এই প্রহসনটা করলাম আমি। ভারি মিষ্টি মেয়ে, কিন্তু তুই আর আমি তো আত্মপ্রতারণা করতে পারি না। হ্যাঁ, এইটাকে আমি বিশ্বাস করি’, হাড্ডিসার হাতে বয়ামটা চেপে ধরে শুঁকতে শুঁকতে বললেন তিনি
সন্ধ্যা সাতটার পর নিজেদের কামরায় স্ত্রীর সাথে চা খাচ্ছিলেন লেভিন, এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে তাঁদের কাছে ছুটে এল মারিয়া নিকোলায়েভনা। বিবর্ণ সে, থরথর করছে ঠোঁট।
ফিসফিস করল, ‘মারা যাচ্ছে! আমার ভয় হচ্ছে, মারা যাবে এখুনি।’
দুজনেই ছুটে গেলেন ওঁর কাছে। কনুইয়ে ভর দিয়ে দীর্ঘ পিঠ বাঁকিয়ে মাথা নুইয়ে তিনি বসে ছিলেন খাটে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ফিসফিসিয়ে লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন বোধ করছ?’
‘বোধ করছি যে চললাম’, অতি কষ্টে, কিন্তু অসাধারণ স্পষ্টতায় প্রতিটি শব্দ ধীরে ধীরে নিষ্কাশিত করে বললেন নিকোলাই। মাথা তুললেন না তিনি, শুধু ওপরে চোখ তুললেন, কিন্তু ভাইয়ের মুখ দেখতে পেলেন না, ‘কাতিয়া, চলে যাও!’ যোগ করলেন তিনি 1
লেভিন লাফিয়ে উঠে আদেশব্যঞ্জক স্বরে ফিসফিসিয়ে বললেন চলে যেতে।
‘চললাম’, নিকোলাই বললেন আবার।
‘কেন তা ভাবছ?’ কিছু-একটা বলতে হয় বলে লেভিন বললেন।
‘কারণ চললাম’, পুনরুক্তি করলেন যেন কথাটা মনে ধরে গেছে তাঁর, ‘শেষ।’
মারিয়া নিকোলায়েভনা এল তাঁর কাছে।
বলল, ‘আপনি শুতে পারেন, কিছু আরাম হত।’
‘শিগগিরই শান্ত হয়ে শুয়ে থাকব। মরা’, বললেন উনি ব্যঙ্গভরে, রাগ করে, ‘বেশ, যদি চান, শুইয়ে দিন।’ লেভিন ভাইকে চিত করে শুইয়ে দিয়ে তাঁর পাশে বসে রুদ্ধনিঃশ্বাসে চেয়ে রইলেন তাঁর মুখের দিকে। চোখ বুজে শুয়ে রইলেন মুমূর্ষু, কিন্তু মাঝে মাঝে কপালের পেশী তাঁর নড়ে উঠছিল, একাগ্র প্রগাঢ় চিন্তামগ্ন লোকের যেমন হয়। ওঁর ভেতরে এখন যা ঘটছে সে বিষয়ে তাঁর সাথেই ভাবার চেষ্টা করলেন লেভিন, কিন্তু তাঁর সঙ্গ ধরার জন্য চিন্তার সমস্ত প্রয়াস সত্ত্বেও শান্ত, কঠোর এই মুখখানায় যে ভাব ফুটে উঠেছিল তা দেখে, ভুরুর ওপর পেশীর যে কাঁপন ফুটছিল তা দেখে লেভিন বুঝলেন যে মুমূর্ষুর কাছে কিছু-একটা পরিষ্কার হয়ে উঠছে এবং যা পরিষ্কার হয়ে উঠছে তা অন্ধকারই থেকে যাচ্ছে লেভিনের কাছে।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই’, থেমে থেমে, ধীরে ধীরে বললেন মুমূর্ষু। ‘দাঁড়ান’, আবার চুপ করে গেলেন। ‘তাই!’ হঠাৎ শান্ত হয়ে টেনে টেনে বললেন যেন সব কিছুর মীমংসা হয়ে গেছে তাঁর কাছে; ‘ওহ্ সৃষ্টিকর্তা’, বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।
মারিয়া নিকোলায়েভনা তাঁর পা টিপে দেখল।
ফিসফিস করে বলল, ‘ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।’
অনেকক্ষণ, লেভিনের যা মনে হল, অনেকক্ষণ রোগী শুয়ে রইলেন নিশ্চল হয়ে। কিন্তু তখনও বেঁচে ছিলেন তিনি, মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিলেন। চিন্তার চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন লেভিন। টের পাচ্ছিলেন যে ভাবনার সমস্ত তাড়না সত্ত্বেও ওই ‘তাই’-টা কি তা তিনি বুঝতে পারবেন না। টের পাচ্ছিলেন যে মুমূর্ষুর কাছ থেকে তিনি পেছিয়ে পড়েছেন অনেক আগে। মৃত্যুর প্রশ্ন নিয়ে তিনি আর ভাবতে পারছিলেন না, তবে থেকে থেকেই তাঁর মনে আসছিল এবার, এখনই কি করতে হবে তাঁকে, চোখ বুজিয়ে দিতে হবে, পোশাক পরাতে হবে, ফরমায়েশ দিতে হবে কফিনের। এবং আশ্চর্য, নিজেকে একেবারে নিরুত্তাপ লাগছিল তাঁর, ভাইয়ের জন্য তাঁর দুঃখ, শোক, এমন কি করুণাও হচ্ছিল না। ভাই সম্পর্কে তাঁর কোন মনোভাব এখন যদি থেকে থাকে, তবে সেটা মুমূর্ষু যা জেনেছেন আর তিনি যা জানেন না সেই জানাটার জন্য ঈর্ষা।
