‘সৃষ্টিকর্তা, এটা কি আমাকে নিজেকেই বলতে হবে ওকে?’ কিটি ভাবলে, কিন্তু কি বলব? সত্যিই কি ওকে বলব যে আমি ওকে ভালোবাসি না? কিন্তু সে তো মিথ্যে বলা হবে। কি বলি তাকে? বলব কি ভালোবাসি অন্যকে? না, সে অসম্ভব। আমি চলে যাব এখান থেকে, চলে যাব।
দরজার কাছে ও চলেই গেছে, এমন সময় লেভিনের পদশব্দ কানে এল। না, এটা অসাধুতা। আমার ভয় পাবার কি আছে? আমি খারাপ তো কিছু করিনি। যা হবার, হবে! সত্যি কথাই বলব। ওর কাছে আমার অস্বস্তি লাগতে পারে না। ওই এসে গেছে, তার বলিষ্ঠ আর ভীরু মূর্তি, তার দিকে নিবদ্ধ তার জ্বলজ্বলে চোখ দেখে মনে মনে বলল সে। সোজাসুজি তার মুখের দিকে তাকাল যেন ক্ষমা প্রার্থনা করছে, হাত এগিয়ে দিল।
ফাঁকা ড্রয়িংরুমে চোখ বুলিয়ে লেভিন বললেন, আমি ঠিক সময়ে নয়, মনে হচ্ছে বড় বেশি আগে এসে পড়েছি। যখন দেখলেন যে তার আশা সফল হয়েছে, মন খুলতে কেউ তাকে বাধা দেবে না, মুখখানা তার হয়ে উঠল বিষণ্ণ-গভীর।
‘আরে না, এই বলে কিটি বসল একটা টেবিলের কাছে।
না বসে, আর মনোবল যাতে না হারায় সে জন্য কিটির দিকে না তাকিয়ে তিনি শুরু করলেন, আমি আপনাকে একলা পেতেই চেয়েছিলাম।’
মা এখনই বেরোবেন। গতকালের পর খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। গতকাল…’
সে কথা বলছিল যদিও নিজেই জানত না কি বলছে তার ঠোঁট, লেভিনের ওপর থেকে মিনতিভরা কোমল দৃষ্টি সে সরিয়ে নিচ্ছিল না।
লেভিন তাকালেন ওর দিকে; কিটি লাল হয়ে উঠে চুপ করে গেল।
‘আমি আপনাকে বলেছি যে অনেকদিনের জন্য এসেছি কিনা জানি না… সব নির্ভর করছে আপনার ওপর…’
কিটি ক্রমশ মাথা নুইয়ে আনল। ভেবে পাচ্ছিল না আসন্নের কি জবাব দেবে।
লেভিন পুনরুক্তি করলেন, ‘সব আপনার ওপর নির্ভর করছে। আমি বলতে চাইছিলাম… আমি বলতে চাইছিলাম… আমি এই জন্যই এসেছি… যে… বলব, আমাকে বিয়ে করুন!’ কি বলছেন তা খেয়াল না করেই তিনি বলে যাচ্ছিলেন; কিন্তু সবচেয়ে সাঙ্ঘাতিক জিনিসটা বলা হয়ে গেছে টের পেয়ে থেমে গেলেন এবং তাকালেন কিটির দিকে।
লেভিনের দিকে না তাকিয়ে সে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। পরমানন্দের অনুভূতি হচ্ছিল তার। সুখাবেশে ভরে উঠেছিল হৃদয়। একেবারেই সে আশা করেনি যে লেভিনের প্রেম-স্বীকৃতি তার ওপর এমন প্রবল রেখাপাত করবে। কিন্তু এ অনুভূতিটা টিকল শুধু এক মুহূর্ত। ভ্রনস্কির কথা মনে পড়ল তার। লেভিনের দিকে তার উজ্জ্বল সত্যনিষ্ঠ চোখ মেলে এবং তার মরিয়া মুখখানা দেখে তাড়াতাড়ি করে সে জবাব দিলে :
‘সে হতে পারে না… মাপ করবেন আমাকে…’
এক মুহূর্ত আগেও কিটি ছিল লেভিনের কত আপন, তাঁর জীবনের পক্ষে কত জরুরি! আর এখন সে হয়ে গেল তার কত পর। তার কাছ থেকে কত সুদূর!
তিনি কিটির দিকে না তাকিয়ে বললেন, ‘এছাড়া আর কিছু হতে পারত না।
তিনি মাথা নুইয়ে চলে যাবার উপক্রম করলেন।
চৌদ্দ
প্রিন্স-মহিষী এ সময় ঘরে ঢুকলেন। ওদের একা দেখে এবং মুখভাবে হতাশা লক্ষ্য করে তার আতঙ্ক হয়েছিল। লেভিন তাকে অভিবাদন করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। কিটি চোখ না তুলে চুপ করে রইল। মা ভাবলেন, হায় সৃষ্টিকর্তা! রাজি হয়নি তাহলে, এবং প্রতি বৃহস্পতিবার সচরাচর যে হাসি দিয়ে তিনি অভ্যাগতদের বরণ করেন, তাতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তাঁর মুখ। আসন নিয়ে তিনি লেভিনের গ্রামের জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। আবার বসলেন লেভিন, অতিথিদের আগমনের অপেক্ষা করতে লাগলেন যাতে অলক্ষ্যে চলে যেতে পারেন।
পাঁচ মিনিট বাদে ঢুকলেন কিটির বান্ধবী, গত শীতে বিবাহিতা, কাউন্টেস নর্ডস্টন।
রোগা, হলদেটে, রুগ্ণ, স্নায়বিক চেহারার এক মহিলা ইনি, কালো চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। কিটিকে ভালবাসতেন তিনি, আর অনূঢ়াদের প্রতি বিবাহিতাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রে সব সময় যা ঘটে থাকে, তার এ ভালোবাসা প্রকাশ পেত সুখ সম্পর্কে তাঁর আদর্শ অনুসারে কিটির বিয়ে দেবার বাসনায়, তাই চাইতেন যে ভ্রনস্কিকে সে বিয়ে করুক। শীতের গোড়ায় লেভিনকে তিনি প্রায়ই এদের এখানে দেখেছেন এবং কখনোই তাঁকে পছন্দ হয়নি। লেভিনের সাথে দেখা হলে তার বরাবরের প্রিয় কাজ হত তাঁকে নিয়ে তামাসা করা।
‘উনি যখন তার মহিমার শিখর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে দেখেন : হয় আমার সাথে মননশীল কথাবার্তা বন্ধ করেন কারণ আমি বোকা, নয় কৃপা করে আমার পর্যায়ে নেমে আসেন,–তখন সেটা আমার খুব ভালো লাগে। আমি ভারি ভালোবাসি : এই নেমে আসা! আমাকে যে উনি দেখতে পারেন না, তাতে আমি খুব খুশি, উনি বলতেন।
উনি ঠিকই বলতেন, কেননা সত্যিই লেভিন ওঁকে দেখতে পারতেন না এবং যা নিয়ে তার গর্ব ছিল এবং যা তিনি নিজের গুণ বলে মনে করতেন–তাঁর স্নায়বিকতা, স্থল ও ঐহিক সব কিছুর প্রতি তাঁর সূক্ষ্ম অবজ্ঞা ও উদাসীনতা– তার জন্য লেভিন ঘৃণা করতেন তাঁকে।
নর্ডস্টন আর লেভিনের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যা উঁচু সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, যথা, দুজন ব্যক্তি বাহ্যত বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকে পরস্পরকে ঘৃণা করছে এমন মাত্রায় যে পরস্পরকে গুরুত্ব দিয়ে নিতে, এমন কি কেউ কারো দ্বারা আহত হতেও অক্ষম।
কাউন্টেস নর্ডস্টন তৎক্ষণাৎ ঝাঁপিয়ে পড়লেন লেভিনের ওপর।
