রাতে রোগীর কাছ থেকে নিজেদের নেওয়া দুই কামরায় ফিরে লেভিন মাথা নিচু করে বসে রইলেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না কি করবেন। রাতের খাবার, রাত যাপনের ব্যবস্থা, কি তাঁরা করবেন সে নিয়ে ভাবার কথা ছেড়ে দিলেও স্ত্রীর সাথেও কথা বলতে পারছিলেন না তিনি; লজ্জা হচ্ছিল তাঁর। পক্ষান্তরে কিটি ছিল সচরাচরের চেয়েও বেশি কর্মচঞ্চল। এমন কি সচরাচরের চেয়েও সজীবই। রাতের খাবার আনতে বলল সে, নিজেই জিনিসপত্র বাছাবাছি করল, নিজেই সাহায্য করল বিছানা পাততে আর তাতে পারস্যীয় পাউডার ছিটাতে ভুলল না। তার মধ্যে ছিল এমন একটা উদ্যম আর চিন্তায় ক্ষিপ্রতা যা পুরুষদের ভেতর জেগে ওঠে লড়াই, সংগ্রামে নামার আগে, জীবনের বিপজ্জনক ও নির্ধারক মুহূর্তগুলোয়, পুরুষ যখন বরাবরের মত দেখিয়ে দেয় তার মূল্য, দেখিয়ে দেয় যে তার গোটা অতীতটা বৃথায় কাটেনি, এই মুহূর্তগুলিরই প্রস্তুতি চলেছিল তখন
কিটির সমস্ত কাজ চলছিল ফুর্তিতে, বারোটা না-বাজতেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পরিপাটী করে গোছগাছ হয়ে গেল সব জিনিসের, এমন একটা বিশেষ ধরনে যে হোটেলের কামরা হয়ে দাঁড়াল নিজের বাড়ি, কিটির নিজের ঘরখানার মত : বিছানা তৈরি, বুরুশ চিরুনি আয়না সাজানো, ন্যাপকিন পাতা।
লেভিনের মনে হচ্ছিল, খাওয়া, ঘুমানো, এমন কি কথা বলাও এখন অমার্জনীয়, অনুভব করছিলেন যে তাঁর প্রতিটি হাবভাব হবে অশোভন। কিটি কিন্তু তার বুরুশগুলো বাছলে এবং বাছলে এমনভাবে যে মনে আঘাত পাবার মত কিছু রইল না তাতে।
তবে খেতে ওঁরা পারলেন না, অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি, এমন কি শুতেও যাননি অনেকক্ষণ।
‘কাল গাত্রলেপনে ওঁকে রাজি করাতে পেরেছি বলে ভারি আনন্দ হচ্ছে আমার’, একটা ব্লাউজ পরে নিজের ভাঁজ করা আয়নাটার কাছে বসে সুরভিত নরম চুলে ঘন ঘন চিরুনি চালাতে চালাতে কিটি বলল, ‘এরকম ক্রিয়াকর্ম আমি কখনো দেখিনি, তবে জানি, মা বলেছেন ওতে আরোগ্যলাভের প্রার্থনা হয়।
‘সত্যিই কি তুমি ভাবছ যে ও সেরে উঠতে পারে’, যতবার কিটি চিরুনি চালাচ্ছিল ততবার তার গোল মাথার পেছন দিকে সরু যে সারিটা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল, তার দিকে চেয়ে লেভিন বললেন।
‘আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম : উনি বললেন তিন দিনের বেশি বাঁচা সম্ভব নয়। তবে ওঁরা কি আর সব জেনে ফেলতে পারেন? যাই বলো, ওঁকে বুঝিয়ে রাজি করাতে পেরেছি বলে আমি খুব খুশি’, চুলের তল থেকে কটাক্ষে স্বামীর দিকে চেয়ে বলল কিটি, ‘সবই হতে পারে’, কিটি বলল সেই বিশেষ রকমের, খানিকটা দূর্ত একটা ভাব নিয়ে যা ধর্মের বিষয়ে কথা বলতে গেলে সচরাচর ফুটে উঠত তার মুখে।
যখনও তাঁদের বিয়ে হয়নি তখন ধর্ম নিয়ে একটা আলাপের পর লেভিন বা কিটি কেউ আর ও প্রসঙ্গ কখনো তোলেননি, কিন্তু কিটি গির্জায় যাওয়া, প্রার্থনা করার অনুষ্ঠানগুলো পালন করে এসেছে সব সময় একইরকম এক শান্ত চেতনায় যে ওটা দরকার। লেভিনের বিশ্বাস বিপরীত হলেও কিটির স্থির বিশ্বাস ছিল যে লেভিন তারই মত, বলতে কি তারও চেয়ে ভালো খ্রিস্টান এবং এ নিয়ে যা তিনি বলেছিলেন সেটা তাঁর এক হাস্যকর পুরুষালী চাল, যেমন বিলেতি এম্ব্রয়ডারি সম্পর্কে বলেছিলেন যে সজ্জন লোকের ফুটো রিফু করে থাকে আর কিটি ফুটো করছে ইচ্ছে করে, এই আর কি।
‘এই তো, ওই মেয়েটা, মারিয়া নিকোলায়েভনা এ সব করতে পারেনি’, লেভিন বললেন, ‘আর… স্বীকার করতেই হবে, তুমি যে এসেছ তার জন্য আমার খুব, খুবই আনন্দ হচ্ছে। এত তুমি নির্মল যে…’ কিটির হাতখানা তিনি নিলেন, কিন্তু চুম্বন করলেন না (মৃত্যুর এই সান্নিধ্যে তার হস্তচুম্বন অসভ্যতা বলে মনে হল তাঁর কাছে), শুধু তার জ্বলজ্বলে চোখের দিকে দোষীর মত চেয়ে চাপ দিলেন।
‘একলা তোমার বড় যন্ত্রণা হত’, এই বলে কিটি তৃপ্তিতে রাঙা হয়ে ওঠা গাল ঢেকে হাত উঁচু করে চাঁদির ওপর বেণী ছড়িয়ে খোঁপা বেঁধে কাঁটা গুজতে লাগল তাতে। ‘না—’ বলে চলল কিটি, ‘ও যে জানতো না… সৌভাগ্যের কথা যে আমি অনেককিছু শিখেছি সোডেনে।’
‘সেখানে এমন রোগী ছিল নাকি?’
‘ছিল আরো খারাপ।’
‘তরুণ বয়সে ও যা ছিল সে মূর্তি ভেসে উঠছে আমার চোখের সামনে। বিশ্বাস করবে না কি চমৎকার ছেলে ছিল সে, কিন্তু তখন আমি ওকে বুঝতে পারিনি।’
‘খুবই, খুবই বিশ্বাস করি। আমি বেশ বুঝতে পারছি ওঁর সাথে, কি ভাব হয়ে যেত আমাদের’, কিটি বলল আর যা বলেছে তার জন্য ভয় পেয়ে গেল, স্বামীর দিকে তাকিয়ে চোখ তার পানিতে ভরে উঠল।
‘হ্যাঁ, হতে পারত’, লেভিন বললেন বিষণ্ণ সুরে, ‘এ ঠিক সেই মানুষ যাদের সম্পর্কে লোকে বলে ওনারা এ জগতের জন্য নয়।
‘যাক গে, সামনের দিনগুলোয় অনেক কাজ আছে। শুতে হয়’, নিজের ক্ষুদে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে কিটি বলল।
আন্না কারেনিনা – ৫.২০
বিশ
মৃত্যু
পরের দিন রোগীর অনু-সুরা পান ও গাত্রলেপন হল। অনুষ্ঠানের সময় নিকোলাই লেভিন প্রার্থনা করলেন আবেগভরে। ফুলকাটা তোয়ালেতে ঢাকা ছোট একটা টেবিলের ওপর স্থাপিত দেবপটের দিকে নিবদ্ধ তাঁর বড় বড় চোখে ফুটে উঠছিল যে আকুল আশা আর প্রার্থনা, তাতে লেভিনের ভয়ংকর লাগছিল সেদিকে চাইতে। লেভিন জানতেন, যে জীবনকে উনি ভালোবাসতেন, তার কাছ থেকে বিচ্ছেদ আরো দুঃসহই হবে এই আকুল প্রার্থনা আর আশায়। ভাইকে লেভিন চিনতেন, জানতেন তাঁর চিন্তাধারা। জানতেন যে ধর্মে তাঁর অবিশ্বাস এই জন্য আসেনি যে ধর্মবিশ্বাস ছাড়াই জীবনযাপন তাঁর কাছে সহজ, এসেছে এই থেকে যে বিশ্বের ঘটনাপ্রপঞ্চের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এক-পা এক-পা করে সংকুচিত করেছে তাঁর ধর্মবিশ্বাস, তাই তিনি জানতেন যে ধর্মে এই প্রত্যাবর্তনটা চিন্তার সেই পথটা ধরে ঘটেনি, এটা ন্যায়সঙ্গত নয়, এটা শুধু সাময়িক, স্বার্থপর একটা ব্যাপার, এসেছে আরোগ্যলাভের উন্মাদ আশা থেকে। লেভিন এও জানতেন যে তার শোনা অসাধারণ সব আরোগ্যলাভের ঘটনা বলে কিটি বাড়িয়ে তুলেছে আশাটা। এ সবই লেভিন জানতেন আর আশায় আকুল প্রার্থী এই দৃষ্টি, টান-টান কপালে ক্রুশচিহ্ন আঁকার জন্য অতিকষ্টে উত্তোলিত শীর্ণ ওই হাতের থোপা, হাড়-খোঁচা এই কাঁধ, ঘড়ঘড়ে ফাঁপা এই বুক, রোগী যে জীবনের প্রার্থনা করছিলেন তা যেখানে আর ধরবে না, এ সব দেখতে কষ্ট হচ্ছিল, যন্ত্রণা বোধ করছিলেন লেভিন। গুহ্য এসব ক্রিয়াকাণ্ডের সময় লেভিনও প্রার্থনা করছিলেন এবং নাস্তিক হয়েও হাজার বার যা তিনি করেছেন তাই করলেন। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে তিনি বলছিলেন, ‘তোমার অস্তিত্ব যদি থেকে থাকে, তাহলে এই লোকটাকে ভালো করে দাও (এ তো বহুবার ঘটেছে), এতে করে তুমি ওকে আর আমাকেও বাঁচাবে।’
