যে ঢাক্তার নিকোলাইয়ের চিকিৎসা করত এবং নিকোলাই যার ওপর ছিলেন অসন্তুষ্ট, ক্লাবে যে ডাক্তারকে পেয়ে লেভিন নিয়ে এসেছেন তিনি সে নন। নতুন ডাক্তার স্টেথোস্কোপ বার করে বুক দেখলেন, মাথা নাড়লেন, ওষুধ লিখে দিলেন এবং বিশেষ সবিস্তারে বোঝালেন প্রথম ওষুধ খেতে হবে কিভাবে, দ্বিতীয়ত—পথ্য কি হবে। পরামর্শ দিলেন ডিম, কাঁচা বা সামান্য সেদ্ধ, নির্দিষ্ট একটা তাপমাত্রায় টাটকা দোয়া দুধের সাথে সেলৎজার পানি। ডাক্তার চলে যেতে রোগী কি যেন বললেন ভাইকে, কিন্তু লেভিন শুনতে পেলেন শুধু শেষ শব্দটা : তোর কাতিয়া’, তবে যে দৃষ্টিতে তিনি কিটিকে দেখছিলেন তাতে লেভিন বুঝলেন কিটির প্রশংসা করছেন। কিটি বা তিনি তাকে যা বলে উল্লেখ করেছেন সেই কাতিয়াকেও ডাকলেন তিনি।
বললেন, ‘অনেক ভালো বোধ করছি। আপনি থাকলে সেরে উঠতাম অনেক আগেই। আহ, কি যে ভালো লাগছে! কিটির হাত ধরে তিনি তা টেনে আনলেন ঠেটের কাছে, কিন্তু এটা কিটির ভালো লাগবে না ভেবে শুধু হাত বলাতে লাগলেন। নিজের দুই হাতে হাতখানা নিয়ে কিটি চাপ দিল তাতে।
‘এবার আমাকে বাঁ পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে আপনি ঘুমাতে যান’, উনি বললেন।
কি উনি বললেন তা ধরতে পারেনি কেউ, কিন্তু কিটি বুঝেছিল। বুঝেছিল, কেননা কি তাঁর প্রয়োজন সেটা মনে মনে অবিরাম অনুধাবন করে যেত সে।
স্বামীকে সে বলল, ‘ওপাশে, উনি ঘুমোন ওপাশ ফিরে। ওঁকে পাশ ফিরিয়ে দাও, চাকর ঢাকা ভালো দেখাবে না। আমি তো পারব না। আপনি পারবেন?’ মারিয়া নিকোলায়েভনাকে জিজ্ঞেস করল কিটি।
‘ভয় পাচ্ছি আমি’, জবাবে বলল মারিয়া নিকোলায়েভনা।
ভয়াবহ এই দেহটাকে জড়িয়ে ধরা, কম্বলের তলে যে অঙ্গগুলোর কথা ভাবতেই চাইতেন না, তাতে হাত দেওয়া লেভিনের কাছে যত ভয়ংকরই লাগুক, স্ত্রীর প্রভাবে আত্মসমর্পণ করে একটা দৃঢ়তাব্যঞ্জক মুখভাব ফুটিয়ে তুললেন যা স্ত্রীর ভালোই জানা, হাত নামিয়ে কাজে লাগলেন তিনি। নিজের যথেষ্ট শক্তি সত্ত্বেও এই শীর্ণ অঙ্গগুলি এত আশ্চর্য রকমের ভারি দেখে অবাক লাগল তাঁর। বিশাল এক শীর্ণ হাত তাঁর গলা জড়িয়ে ধরেছে এই অনুভূতি নিয়ে তিনি যখন ওঁকে ঘোরাচ্ছিলেন, কিটি ততক্ষণে দ্রুত নিঃশব্দে বালিশ ঠিক করে এগিয়ে দেয় মাথার তলে, আবার রগের সাথে লেপটে যাওয়া তাঁর বিরল চুলগুলোও বিন্যস্ত করে দেয়।
রোগী ভাইয়ের হাত ধরে রেখেছিলেন নিজের হাতে। লেভিন টের পেলেন যে উনি তাঁর হাত নিয়ে কিছু-একটা করতে চান, কোথায় যেন সেটা টানছেন। আড়ষ্ট হাতে ঢিল দিলেন। হ্যাঁ, হাতটা উনি নিজের মুখের কাছে টেনে এনে চুমু খেলেন। ফোঁপানিতে কাঁপতে কাঁপতে, কথা বলার শক্তি হারিয়ে লেভিন বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
ঊনিশ
‘প্রাজ্ঞদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখে উদ্ঘাটিত করেছে শিশু আর সরলদের কাছে’, সে সন্ধ্যায় স্ত্রীর সাথে কথা বলার সময় কিটি সম্পর্কে এই কথা মনে হচ্ছিল লেভিনের।
বাইবেলের এই উক্তিটা লেভিনের মনে পড়ছিল এই জন্য নয় যে নিজেকে ভিনি প্রাজ্ঞ বলে ভাবতেন। নিজেকে তিনি প্রাজ্ঞ বলে ভাবতেন না, কিন্তু এও তাঁর না জানা থাকার নয় যে তিনি নিজের স্ত্রী আর আগাফিয়া মিখাইলোভনা যা জানেন তার এক শতাংশও তাঁরা জানতেন না। এই দুই নারীর মধ্যে পার্থক্য যতই থাক, আগাফিয়া মিখাইলোভনা আর কাতিয়া-নিকোলাই ভাই তাকে যে নামে ডেকেছিলেন, যে নামে তাকে ডাকতে লেভিনের এখন খুবই ভালো লাগছে, এ ব্যাপারে তাঁরা একেবারে একরকম। দুজনেই নিঃসন্দেহেই জানেন জীবন কি জিনিস, মৃত্যু কি জিনিস। এবং লেভিনের মনে যে সব প্রশ্নের উদয় হয়েছিল, তার কোন উত্তর দিতে না পারলেও, এমন কি প্রশ্নগুলিকেই না বুঝলেও ঘটনাটার তাৎপর্যে দুজনের কোন সন্দেহ নেই এবং তাঁরা শুধু নিজেদের মধ্যে নয়, লক্ষ লক্ষ অন্যান্য লোকের সাথেও তাঁরা জিনিসটা দেখেন একইভাবে। মৃত্যু কি সেটা যে তাঁরা নিঃসন্দেহে বোঝেন এবং ভয় পান না তাতে। লেভিন এবং অন্যান্য অনেকে কিন্তু মৃত্যু সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারলেও স্পষ্টতই সেটা জানেন না, কেননা মৃত্যুকে তাঁরা ভয় পান আর লোকে যখন মরছে তখন কি করা দরকার সেটা বোঝেন না একেবারেই। লেভিন যদি এখন ভাইয়ের কাছে একা থাকতেন, ভাইয়ের দিকে তিনি তাহলে চাইতেন আতংকে এবং আরো বেশি আতংকে প্রতীক্ষা করতেন মৃত্যুর, তা ছাড়া কিছুই করতে পারতেন না।
শুধু তাই নয়, কি বলবেন, কেমন করে তাকাবেন, কিবাবে হাঁটবেন তাও জানা নেই তাঁর। অন্য বিষাদ নিয়ে কথা বলা, তাও চলে না। চুপ করে থাকা—চলে না। ‘চেয়ে দেখব—ও ভাববে আমি ওকে খুঁটিয়ে লক্ষ করছি, ভয় পাচ্ছি; চাইব না–ও ভাববে আমি অন্য চিন্তায় মগ্ন। পা টিপে টিপে হাঁটবও চটে যাবে। পা ফেলে হাঁটব–বিবেকে বাঁধে।’ কিটি কিন্তু স্পষ্টতই নিজের কথা ভাবছিল না, ভাবার সময়ই ছিল না তার; ভাবছিল ওঁর কথা; কিছু সে জানতো বলে সবই উৎরে যেত ভালোই। ওঁর কাছে সে গল্প করে বলতো নিজের কথা, বিয়ের কথা, হাসতো, কষ্ট হত ওঁর জন্য, দরদ দেখাতো, আরোগ্যলাভের ঘটনা শোনাতো, আর সবই উৎরে যেত ভালোই; তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে ও জানে। কিটি আর আগাফিয়া মিখাইলোভনার কাজগুলো যে স্বতঃপ্রবৃত্তিবশে নয়, জীবধর্মী নয়, অবিবেচনাপ্রসূত নয়, তার প্রমাণ দৈহিক শুশ্রূষা, যন্ত্রণার লাঘব ছাড়াও আগাফিয়া মিখাইলোভনা আর কিটি, মুমূর্ষুর জন্য দুজনেরই দাবি ছিল দৈহিক পরিস্থিতির সাথে যার কোন মিল নেই। পরলোকগত বুড়োটা প্রসঙ্গে আগাফিয়া মিখাইলোভনা বলেছিলেন : ‘তা সৃষ্টিকর্তার কৃপা, গির্জায় পবিত্র অন্ন-সুরা নিলে, গাত্রলেপন দেওয়া হল, সৃষ্টিকর্তা করুন আমরা সবাই যেন অমনি করে চলে যেত পারি।’ কাতিয়াও ঠিক একইভাবে বিছানাপত্র, শয্যাক্ষত, পানীয় সম্পর্কে সমস্ত যত্ন ছাড়া প্রথম দিনই রোগীকে বোঝাতে পেরেছিল যে অন্ন-সুরা আর গাত্রলেপন দরকার।
