কিন্তু রোগীর চাঙা ভাবটা টিকল না বেশিক্ষণ।
কিটির কথা না ফুরতেই মুখে তাঁর আবার দেখা দিল জীবিতের প্রতি মুমূর্ষুর ঈর্ষার সেই কঠোর, তিরস্কারের ছাপ।
আমার ভয় হচ্ছে এ ঘরখানা আপনার পক্ষে ভালো নয়’, কিটি বলল তাঁর স্থির দৃষ্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে ঘরটায় চোখ বুলিয়ে। ‘অন্য একটা ঘরের জন্য মালিককে বলা দরকার’, কিটি বলল স্বামীকে, ‘যা হবে আমাদের কাছাকাছি।’
আঠারো
লেভিন শান্তভাবে ভাইয়ের দিকে তাকাতে পারছিলেন না, নিজে স্বাভাবিক ও সুস্থির হতে পারছিলেন না তাঁর উপস্থিতিতে। রোগীর কাছে গেলে তাঁর দৃষ্টি ও মনোযোগ আপনা থেকে ঝাপসা হয়ে যেত, ভাইয়ের অবস্থার খুঁটিনাটি তাঁর চোখে পড়ত না, পার্থক্য করে দেখতে পারতেন না। শুধু ভয়াবহ একটা দুর্গন্ধ পেতেন, দেখতেন ময়লা, বিশৃঙ্খলা, যন্ত্রণাকর অবস্থা, কানে আসত কাতরানির শব্দ, আর টের পেতেন যে ওঁকে সাহায্য করা আর সম্ভব নয়। তাঁর খেয়ালই হল না যে রোগীর অবস্থাটা বোঝার জন্য ভাবনা-চিন্তা করা দরকার, ভাবা দরকার কিভাবে তাঁর দেহটা রয়েছে কম্বলের তলে, বেঁকে যাওয়া শীর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কোমর পিঠ রয়েছে কি অবস্থায়, তাদের ভালো করে কি রাখা যায় না, কিছু-একটা কি করা যায় না, যাতে ভালো না হলেও হবে কম খারাপ। এসব জিনিস ভাবতে গেলেই হিম নামত তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে। সন্দেহাতীত এই বিশ্বাস তাঁর জন্মাল যে ভাইয়ের আয়ু বৃদ্ধি অথবা যন্ত্রণা হ্রাসের জন্য কিছুই করবার নেই। কিন্তু কোনরকম সাহায্য যে সম্ভব নয় এই চেতনাটা রোগীকে পীড়া দিত, মেজাজ হয়ে উঠত খিটখিটে। সেই কারণে বেশি কষ্ট হত লেভিনের। রোগীর কামরায় থাকা তাঁর পক্ষে যন্ত্রণাদায়ক হত, না থাকাটা হত আরো বেশি খারাপ। তাই নানা অজুহাতে অবিরাম ঘরে ঢুকতেন আর বেরিয়ে যেতেন, একলা থাকার শক্তি ছিল না তাঁর।
কিন্তু কিটির ভাবনা, অনুভূতি ও আচরণ তেমন ছিল না মোটেই। রোগীকে দেখলে তার করুণা হত। আর করুণা তার নারী হৃদয়ে মোটেই তার স্বামীর মত ভীতি ও বিতৃষ্ণার উদ্রেক করত না, জাগাত কিছু করার, তাঁর অবস্থার সমস্ত খুঁটিনাটি জানার, তাঁকে সাহায্য করার তাগিদ। আর তার যে সাহায্য করা উচিত এ বিষয়ে যেহেতু তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না, এ বিষয়েও সন্দেহ ছিল না যে সেটা সম্ভব, তাই তৎক্ষণাৎ কাজে নেমে পড়ল সে। যে খুঁটিনাটির কথা ভাবতে গেলেই আতংক হত তার স্বামীর, ঠিক সেইগুলিই মনোযোগ আকর্ষণ করল তার। ডাক্তার ঢাকতে পাঠালে সে, ওষুধ কিনতে পাঠাল, তার যে দাসীটি তাঁদের সাথে এসেছিল, তাকে আর মারিয়া নিকোলায়েভনাকে লাগাল ঘরদোর পরিষ্কার করা, ধুলো ঝাড়া, কাপড় কাচায়, নিজেও সে কিছু কাচলে, কিছু বিছিয়ে দিলে কম্বলের তলে। তার হুকুমে রোগীর ঘর থেকে কিছু কিছু জিনিস সরিয়ে দেওয়া হল, কিছু-বা আনা হল সেখানে। সামনে যে ভদ্রলোকেরা পড়তেন তাঁদের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নিজে সে তার ঘরে গিয়ে বিছানার চাদর, ওয়াড, কামিজ বার করে আনত।
সাধারণ কক্ষে ইঞ্জিনিয়ারদের একটা দলকে খাবার পরিবেশন করছিল যে চাপরাশিটি কিটির ডাকে বার কয়েক করে সে এসেছে রাগত মুখে, কিন্তু তার আদেশ পালন না করে পারেনি, কেননা সে আদেশ কিটি দিত এমন একটা সস্নেহ ঝোঁক ধরে যে এড়ানো যেত না। এসব পছন্দ হত না লেভিনের; তিনি বিশ্বাস করতেন না যে এ সব থেকে রোগীর কোন উপকার হতে পারে। এতে রোগী আবার চটে না যায়, এই ভয় তাঁর হত সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এতে রোগীকে নির্বিকার মনে হলেও তিনি চটলেন না, শুধু লজ্জা পেলেন, তাঁর জন্য কিটি কি করছে তাতে যেন আগ্রহই দেখা গেল তাঁর। লেভিনকে কিটি পাঠিয়েছিল ডাক্তারের কাছে; সেখানে থেকে ফিরে দরজা খুলে রোগীকে তিনি সেই অবস্থায় দেখতে পেলেন যখন কিটির হুকুমে তাঁর অন্তর্বাস বদলানো হচ্ছে। পিঠের লম্বা সাদা কংকাল তাতে সুপ্রকট হয়ে ওঠা কাঁধের বিশাল হাড়, খোঁচা খোঁচা পাঁজর, আর মেরুদণ্ড, সব নগ্ন। মারিয়া নিকোলায়েভনা আর একজন চাপরাশি কামিজের আস্তিনে আটকে যাওয়া তাঁর দীর্ঘ লম্বমান হাত তাতে গলাতে পারছিল না। লেভিনের পেছনে তাড়াতাড়ি করে দরজা বন্ধ করে কিটি, তবে চাইছিল না ওদিকটায়; কিন্তু রোগী ককিয়ে উঠতে সে দ্রুত গেল তাঁর কাছে। বলল, ‘আহ্ তাড়াতাড়ি কর।’
‘আসবেন না’, রোগী বলে উঠলেন রেগে, ‘নিজেই আমি…’
‘কি বললেন?’ বলল মারিয়া নিকোলায়েভনা।
কিন্তু কিটির কানে গিয়েছিল কথাটা, সে বুঝল যে তার সামনে নগ্ন দেহে থাকতে ওঁর সংকোচ হচ্ছে, বিছছিরি লাগছে। ‘আমি দেখছি না, দেখছি না’, হাত ঠিক করতে করতে কিটি বলল। ‘মারিয়া নিকোলায়েভনা, আপনি ওপাশে গিয়ে ঠিক করে দিন’, যোগ দিল সে।
স্বামীকে সে বললে, ‘যাও লক্ষ্মীটি, আমার ছোটো ব্যাগটায় একটা শিশি আছে, পাশের পকেটে। নিয়ে এসো না গো, ততক্ষণে এরা সব পরিষ্কার করে ফেলবে।’
শিশি নিয়ে ফিরে লেভিন দেখলেন রোগীকে শোয়ানো হয়েছে, একেবারে বদলে গেছে তাঁর চারপাশের চেহারা। গুমোটার জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে ভিনিগার আর সেন্টের গন্ধ, নলে ঠোঁট দিয়ে লালচে গাল ফুলিয়ে সেটা স্প্রে করেছে কিটি। ধুলোর চিহ্ন নেই, খাটের নিচে গালিচা। টেবিলে পরিপাটী করে সাজানো, শিশি-বোতল, পানির পাত্র, ভাঁজ করে রাখা হয়েছে বিছানার দরকারী চাদর আর কিটির বিলেতি এমব্রডারি। রোগীর খাটের কাছে অন্য একটা টেবিলে পানীয়, মোমবাতি আর বড়ি। রোগীকে ধুইয়ে চুল আঁচড়ে দেওয়া হয়েছে। শুয়ে আছেন তিনি পরিষ্কার বিছানায়, উঁচু করে রাখা বালিশগুলোয় মাথা, গায়ে পরিচ্ছন্ন কামিজ, তাতে অস্বাভাবিক রোগা গলার কাছে মাদা কলার, মুখে তাঁর নতুন একটা আশা, চোখ না ফিরিয়ে তাকিয়ে আছেন কিটির দিকে।
