ছোট্ট নোংরা একটা কামরা, দেয়ালের রঙিন প্যানেলে থুতু ছিটানো, পার্টিশনের ওপাশ থেকে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে, পেটের নাড়ি উলটে আসা দুর্গন্ধে বাতাস ভরপুর, দেয়ালের কাছ থেকে সরিয়ে আনা একটা খাটে কম্বল-ঢাকা একটি দেহ। সে দেহের একটা হাত দুর্বোধ্য কি কারণে যেন পাতলা, মসৃণ একটা তক্তার সাথে কনুই পর্যন্ত বাঁধা। মাতাটা কাত হয়ে আছে বালিশের ওপর। লেভিনের চোখে পড়ল রঙের কাছে ঘর্মাক্ত বিরল চুল আর টান টান, প্রায় স্বচ্ছ কপাল।
লেভিনের মনে হল, ‘ভয়াবহ এই দেহটা নিকোলাই ভাই হতে পারে না।’ কিন্তু কাছে গিয়ে মুখখানা দেখতেই সন্দেহ আর সম্ভব হল না। মুখের সাঙ্ঘাতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও আগতের দিকে তোলা জীবন্ত ওই চোখজোড়া, লেপটে- যাওয়া মোচের তলে ঠোঁটের সামান্য নাড়াচড়া দেখা মাত্রই লেভিনের কাছে এই ভয়ংকর সত্যটা অস্পষ্ট রইল না যে মৃত এই দেহটাই তাঁর জীবন্ত ভাই।
আগত ভাইয়ের দিকে তিরস্কারের কঠোর এক দৃষ্টি হানল ধকধকে চোখ দুটো। আর তখনই সে দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল জীবিতদের মধ্যে সম্পর্ক। তাঁর দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টিতে তিরস্কার টের পেলেন লেভিন, নিজের সুখের জন্য অনুশোচনা হল।
কনস্তান্তিন যখন তাঁর করমর্দন করলেন, হাসি ফুটল নিকোলাইয়ের মুখে। হাসিটা ক্ষীণ, সামান্য চোখে পড়ে মাত্র আর হাসি সত্ত্বেও চোখের কঠোর ভাবটা বদলাল না।
‘আমাকে এই অবস্থায় দেখবি আশা করিসনি তো’, অতি কষ্টে বলতে পারলেন নিকোলাই।
‘হ্যাঁ… মানে, না’, কথাগুলো গোলমাল করে বললেন লেভিন, ‘আগে, মানে আমার বিয়ের সময় খবর দিলে না কেন? আমি সবখানে খোঁজ নিয়েছিলাম।’
চুপ করে থাকতে না হলে কথা বলা দরকার কিন্তু লেভিন জানতেন না কি বলা যায়, তার ওপর ভাই কোন জবাব দিচ্ছিলেন না, চোখ না সরিয়ে শুধু একদৃষ্টে দেখছিলেন, স্পষ্টতই প্রতিটি শব্দের অর্থ ধরতে চাইছিলেন। লেভিন তাঁকে জানালেন যে তাঁর স্ত্রীও এসেছেন সাথে। সন্তুষ্টির একটা ভাব দেখা গেল নিকোলাইয়ের মধ্যে, কিন্তু বললেন, তাঁর যা অবস্থা তাতে ওকে ভয় পাইয়ে দেবেন বলে আশংকা হচ্ছে তাঁর। নামল নীরবতা। হঠাৎ নড়েচড়ে উঠে নিকোলাই কি- একটা যেন বলতে গেলেন। তাঁর মুখভাব দেখে লেভিন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় কিছু-একটার আশা করেছিলেন, কিন্তু তনি বললেন শুধু নিজের স্বাস্থ্যের কথা। ডাক্তার সম্পর্কে নালিশ করলেন তিনি, আক্ষেপ করলেন যে মস্কোর নামকরা ডাক্তার ডাকা হয়নি, এবং লেভিন বুঝলেন যে এখনো আশা রাখছেন উনি।
তিনি একটু চুপ করতেই যন্ত্রণাকর অনুভূতিটা থেকে অন্তত এক মিনিটের জন্য মুক্তি পাবার আশায় লেভিন উঠে দাঁড়ালেন, বললেন স্ত্রীকে নিয়ে আসতে যাচ্ছেন।
‘তা বেশ, আমি জায়গাটা পরিষ্কার করতে বলি। জায়গাটা নোংরা, দুর্গন্ধও আছে বলে মনে হয়। মাশা! ঘর পরিষ্কার করো তো’, কষ্ট করে রোগী বললেন। ‘আর হ্যাঁ, পরিষ্কার করা হয়ে গেলেই চলে যেয়ো, এ্যাঃ’, জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন তিনি 1
কোন কথা বললেন না লেভিন। বেরিয়ে করিডোরে তিনি থাকলেন। তিনি বলেছেন স্ত্রীকে নিয়ে আসবেন, কিন্তু এখন, যে কষ্ট তাঁর হয়েছিল সেটা স্মরণ করে স্থির করলেন উল্টো, চেষ্টা করবেন কিটিকে বোঝাতে যাতে রোগীর কাছে সে না যায়। ভাবলেন, ‘আমার মত ওকে কষ্ট পাইয়ে কি হবে মিছেমিছি?
‘কি? কেমন আছেন?’ আতংকিত মুখে বলল কিটি।
‘ওহ্, ভয়ংকর, ভয়ংকর! কিন্তু তুমি চলে এলে কেন?’ লেভিন বললেন।
ভীত করুণ মুখে স্বামীর দিকে চেয়ে কয়েক সেকেন্ড কিটি চুপ করে রইল; তারপর দুই হাতে কনুই আঁকড়ে ধরল লেভিনের।
‘কস্তিয়া! ওঁর কাছে নিয়ে চল আমাকে। দুজন থাকলে হালকা লাগবে। তুমি শুধু আমাকে নিয়ে চল লক্ষ্মীটি; আমাকে পৌঁছে দিয়ে তুমি চলে যেয়ো’, কিটি বলল, ‘তোমাকে দেখব আর ওঁকে দেখব না, সে যে আমার কাছে অনেক বেশি কষ্টকর। ওখানে হয়ত আমি তোমারও, ওঁরও উপকারে লাগল। সত্যি, নিয়ে চল!’ স্বামীকে এমনভাবে সে মিনতি করতে লাগল যেন তার জীবনের সব সুখ নির্ভর করছে এরই ওপর।
রাজি না হয়ে লেভিনের উপায় ছিল না; খানিকটা সামলে উঠে আর মারিয়া নিকোলায়েভনার কথা একেবারে ভুলে গিয়ে তিনি আবার কিটির সাথে গেলেন ভাইয়ের কাছে।
লঘু পদক্ষেপে, কেবলি স্বামীর দিকে তাকাতে তাকাতে এবং নির্ভীক ও দরদী মুখখানা তাঁকে দেখিয়ে রোগীর ঘরে ঢুকল কিটি এবং বিনা ব্যস্ততায় ঘুরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর নিঃশব্দ পায়ে দ্রুত গেল রোগীর পালংকের কাছে এমনভাবে যাতে তাঁকে মাথা ফেরাতে না হয় আর তাঁর বিরাট হাতখানা নিজের তাজা, তরুণ হাতে নিয়ে চাপ দিল এবং শুধু মেয়েদেরই যা প্রকৃতিগত তেমন একটা মৃদু উৎসাহে কথা বলতে লাগল তাঁর সাথে যা আত্মাভিমানে ঘা দেয় না, অথচ সহানুভূতি জানায়।
কিটি বলল, ‘আমাদের দেখা হয়েছিল সোডেনে কিন্তু পরিচয় হয়নি, আপনি তখন ভাবতে পারেননি যে আমি হব আপনার ভ্রাতৃবধূ।’
‘আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না তো?’ কিটি আসায় হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত করে তিনি বললেন।
‘না, পারছি। খবর দিয়ে খুব ভালো করেছেন! আপনার কথা কন্তিয়া মনে করেনি, দুশ্চিন্তা করেনি আপনার জন্য, এমন একটা দিনও যায়নি।’
