ঠিক হল পরের দিন তাঁরা একসাথে রওনা দেবেন। স্ত্রীকে লেভিন বললেন যে সে যেতে চাইছে কেবল তাঁকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে সেটা তিনি বিশ্বাস করেন, সায় দিলেন যে ভাইয়ের কাছে মারিয়া নিকোলায়েভনা থাকলে অশালীন কিছু হবে না; কিন্তু মনে মনে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন কিটি আর নিজের ওপর। কিটির ওপর অসন্তুষ্ট হলেন, কারণ যখন প্রয়োজন তখন তাঁকে ছেড়ে দেবার মত মনের জোর তার হয়নি (ভেবে তাঁর অদ্ভূত লাগল যে কিটি তাঁকে ভালোবাসতে পারে এ সৌভাগ্য সেদিনও পর্যন্ত বিশ্বাস করতে না পারলেও এখন নিজেকে অসুখী মনে হচ্ছে এই জন্য যে কিটি তাঁকে ভালবাসছে বড় বেশি!) আর নিজের ওপর অসন্তুষ্ট হলেন, কারণ তিনি তাঁর মত বজায় রাখতে পারেননি। মনের গভীরে তাঁর আরো বেশি অমত ছিল এই কথায় যে ভাইয়ের সাথে যে মেয়েটা আছে তাতে কিটির কিছু এসে যায় না, সম্ভাব্য নানা সংঘাতের কথা তিনি ভাবলেন সভয়ে। তাঁর স্ত্রী, তাঁর কিটি ওই মেয়েটার সাথে থাকবে একই ঘরে, শুধু এই কথা ভেবেই তিনি চমকে উঠছিলেন বিতৃষ্ণা আর আতংকে।
সতেরো
মফস্বলী যে হোটেলটায় নিকোলাই লেভিন ছিলেন, তা তেমনি একটা মফস্বলী হোটেল যা গড়া হয় আধুনিক সব সুব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আরাম, এমন কি রমণীয়তার অতি শুভ সংকল্প নিয়ে, কিন্তু তাতে যেসব লোক ওঠে তাদের দৌলতেই অতি অচিরেই যা পরিণত হয় আধুনিক সুব্যবস্থার জাঁক করা নোংরা একটা সরাইখানায় আর ঐ জাঁকটার দরুনই তা হয়ে দাঁড়ায় সেকেলে নোংরা হোটেলগুলোর চেয়েও খারাপ। এ হোটেলটাও সেই দশায় পৌঁছেছে; প্রবেশদ্বারে ধূমপানরত নোংরা উর্দি পরা যে সৈনিকটির চাপরাশি সাজার কথা, পেটাই লোহার বিমর্ষ, ছ্যাদা ভরা বিশ্রী সিঁড়িটা, নোংরা ফ্রক-কোট পরা চালিয়াত ওয়েটার, লাউঞ্জে টেবিলের ওপর মোম দিয়ে বানানো ফুলের ধূলিধূসর তোড়ার শোভা এবং জঞ্জাল, ধুলো, সর্বত্র বিশৃঙ্খা আর সেই সাথে হোটেলটার কেমন একটা আধুনিক ‘রেলওয়ে- সুলভ’ আত্মতৃপ্ত উদ্বেগ—লেভিনদের নবজীবন কাটানোর পর খুবই দুর্বিষহ ঠেকল এগুলো, বিশেষ করে তাঁরা যা প্রত্যাশা করছিলেন তার সাথে হোটেলটার একটা মিথ্যে ছাপ কিছুতেই মিলছিল না।
ভালো একটা কামরা কি ভাড়ায় পাওয়া যাবে এ প্রশ্নের পর বরাবরের মতই দেখা গেল ভালো কামরা একটাও নেই; একটা ভালো কামরা দখল করেছেন রেলওয়ে পরিদর্শক, আরেকটা মস্কোর জনৈক উকিল, তৃতীয়টা গ্রাম থেকে আগত প্রিন্সেস আস্তাফিয়েভা। বাকি আছে কেবল একটা নোংরা কামরা, তার পাশেই আরেকটা ঘর সন্দ্যা নাগাদ খালি হতে পারে। যা আশংকা করেছিলেন তাই যে সত্যি হল, আসার প্রথম মুহূর্তেই ভাইয়ের কি হয়েছে ভেবে তিনি যখন অস্থির, তখনই তাঁর কাছে ছুটে যাবার বদলে তাঁকে যে স্ত্রীর কথা ভাবতে হচ্ছে, এতে স্ত্রীর ওপর বিরক্ত হয়ে তিনি তাকে নিয়ে গেলেন প্রদত্ত ঘরটায়।
তাঁর দিকে ভীরু-ভীরু দোষী-দোষী দৃষ্টিতে চেয়ে কিটি বলল, ‘যাও, যাও ওর কাছে!
নীরবে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন লেভিন আর তখনই দেখা পেলেন মারিয়া নিকোলায়েভনার, তাঁর আসার খবর পেয়েছে সে কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছিল না। মস্কোয় লেভিন তাকে যেমন দেখেছিলেন, এখনো ঠিক তেমনি; সেই একই হাত-কাটা গলা-খোলা পশমী গাউন, একটু ভারী হয়ে ওঠা বসন্তের দাগ ধরা সেই একইরকম সহৃদয় ভোঁতা মুখ।
‘কি? কেমন আছে? কি হয়েছে?’
‘খুব খারাপ। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। উনি আপনার অপেক্ষা করছেন… উনি… আপনি… স্ত্রীর সাথে।’
লেভিন প্রথমটা বুঝতে পারেননি কেন সে বিব্রত বোধ করছে, কিন্তু তখনই সে বুঝিয়ে বলল নিজেই।
‘আমি এখন যাচ্ছি। আমি থাকব রান্নাঘরে’, সে বলল, ‘উনি খুশি হবেন। উনি শুনেছেন, ওঁকে চেনেন, বিদেশে থাকতেই চেনেন।’
লেভিন বুঝলেন যে তাঁর স্ত্রীর কথা হচ্ছে, কিন্তু কি জবাব দেবেন ভেবে পেলেন না।
বললেন, ‘চলুন যাই!’
কিন্তু তিনি পা বাড়াতেই তাঁর কামরার দরজা খুলে গেল, মুখ বাড়াল কিটি। লজ্জায় এবং এই দুঃসহ অবস্থায় নিজেকে ও তাঁকে ফেলেছে বলে স্ত্রীর ওপর বিরক্তিতে লাল হয়ে উঠলেন লেভিন; কিন্তু মারিয়া নিকোলায়েভনা লাল হয়ে উঠল আরও বেশি। একেবারে কুঁকড়ে গিয়ে সে লাল হয়ে উঠল কাঁদো-কাঁদো মুখ করে, কি বলবে, কি করবে ভেবে না পেয়ে সে দুই হাতে মাথার রুমালের প্রান্ত ধরে জড়াতে লাগল রাঙা রাঙা আঙুলে।
তার কাছে দুর্বোধ্য ভয়াবহ এই নারীটিকে কিটি প্রথম যে দৃষ্টিতে দেখেছিল, তাতে লেভিন একটা অদম্য কৌতূহলই লক্ষ করেছিলেন; কিন্তু সেটা শুধু এক মুহূর্তের জন্য।
‘কি? কেমন আছে?’ কিটি জিজ্ঞেস করল প্রথমে স্বামীকে, পরে ওকে।
‘না, করিডোর কথাবার্তা বলার জায়গা নয়’, লেভিন বললেন বিরক্তিতে এক ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে, যিনি তখন করিডোর দিয়ে পা নাচাতে নাচাতে যাচ্ছিলেন যেন নিজেরই কাজে।
‘তাহলে ভেতরে আসুন-না’, কিটি বলল সামলে ওঠা মারিয়া নিকোলায়েভনার উদ্দেশে, তবে স্বামীর উদ্বিগ্ন মুখভাবও চোখে পড়ল তার, ‘তাহলে যান, যান, পরে ডেকে পাঠাবেন আমাকে’, এই বলে সে ঢুকল কামরায়। লেভিন গেলেন ভাইয়ের কাছে।
ভাইয়ের ওখানে তিনি যা দেখলেন, যে অনুভূতি তাঁর হল সেটা মোটেই আশা করেননি লেভিন। তিনি আশা করেছিলেন যে দেখবেন সেই একই আত্মপ্রতারণা, ক্ষয়রোগীদের ক্ষেত্রে যা প্রায়ই ঘটে থাকে বলে তিনি শুনেছেন এবং গত হেমন্তে ভাই তাঁর ওখানে গেলে যা তাঁকে খুবই বিহ্বল করেছিল; তিনি আশা করেছিলেন যে দেখবেন মৃত্যুর সান্নিধ্যের আরও সুপ্রকট দৈহিক লক্ষণ, বেশি দুর্বলতা, বেশি শীর্ণতা, তাহলেও একইরকম অবস্থা। আশা করেছিলেন যে প্রিয়তম ভ্রাতাকে হারাবার জন্য সেই করুণা আর মৃত্যুর সামনে সেই আতংক তাঁর হবে যা তখন তিনি বোধ করেছিলেন, শুধু আরও অধিক পরিমাণে। এর জন্য তিনি তৈরি হয়ে ছিলেন; কিন্তু দেখলেন একেবারে ভিন্ন জিনিস।
