আগাফিয়া মিখাইলোভনার কথাগুলো থেকে লেভিন অনুমান করলেন যে আগাফিয়া মিখাইলোভনা আর কিটির মধ্যে ইদানীং যে ঝগড়া চলছিল, তার অবসান হয়েছে। তিনি বুঝতে পারলেন, শাসন-ভার কেড়ে নিয়ে নতুন কর্ত্রী যত দুঃখই তাঁকে দিক, তা সত্ত্বেও কিটি জয় করে নিয়েছে আগাফিয়া মিখাইলোভনাকে, বাধ্য করেছে ভালোবাসতে কিটিকে।
‘তোমার চিঠিও আমি পড়ে নিয়েছি’, অশিক্ষিত একটা চিঠি এগিয়ে দিয়ে কিটি বলল, ‘এটা মনে হয় তোমার ভাইয়ের ওই মেয়েলোকটার কাছ থেকে… তবে’, কিটি বলল, ‘আমি পড়িনি। আর এগুলো আমাদের লোকজন আর ডল্লির। কি কাণ্ড! সারমাৎস্কিদের ওখানে শিশুদের বলনাচে গ্রিশা আর তানিয়াকে নিয়ে গিয়েছিল ডল্লি। তানিয়া যায় মার্কুইসের বেশে।
কিন্তু লেভিন তার কথা শুনছিলেন না; লাল হয়ে তিনি নিকোলাই ভাইয়ের ভূতপূর্ব প্রণয়িনী মারিয়া নিকোলায়েভনার চিঠিটা নিয়ে পড়তে লাগলেন। এটা তার দ্বিতীয় চিঠি। প্রথম চিঠিতে সে লিখেছিল যে বিনা দোষে ভাই তাড়িয়ে দিয়েছেন তাকে এবং মর্মস্পর্শী সরলতায় যোগ করেছিল যে আবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়লেও কিছুই সে চায় না, আশা করে না, কিন্তু তাকে ছাড়া ক্ষীণ স্বাস্থ্যের জন্য নিকোলাই দমিত্রিয়েভিচ টেসে যাবেন এই চিন্তাটা তাকে বড় কষ্ট দিচ্ছে; তার দিকে দৃষ্টি রাখতে সে অনুরোধ করেছিল ভাইকে। এখন সে অন্য কথা লিখেছে। নিকোলাই দমিত্রিয়েভিচের দেখা পেয়েছে সে, মস্কোয় ওঁর সাথে সে থাকে, তারপর তাঁরা চলে যান মফস্বল শহরে, সেখানে নিকোলাই দমিত্রিয়েভিচ চাকরি পান। কিন্তু ওপরওয়ালার সাথে ঝগড়া করে আবার মস্কো ফেরেন তিনি, কিন্তু পথে এতই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে শয্যা ছাড়তে পারবেন কিনা সন্দেহ। লিখেছে ‘কেবলি আপনার কথা বলেন। টাকাকড়িও আর নেই।’
পড়ে দেখো, ডল্লি তোমার সম্পর্কে লিখেছে…’ হেসে বলতে যাচ্ছিল কিটি, কিন্তু স্বামীর পরিবর্তিত মুখভাব লক্ষ করে থেমে গেল হঠাৎ।
‘কি হল? কি ব্যাপার?’
‘ও লিখেছে নিকোলাই ভাই মরণাপন্ন। আমি যাব।’
হঠাৎ বদলে গেল কিটির মুখচ্ছবি। মার্কুইস-বেশে তানিয়ার কথা, ডল্লির কথা, সব উধাও হল মন থেকে।
জিজ্ঞেস করল, ‘কবে যাবে?’
‘কাল।’
‘আমিও তোমার সাথে যাব, কেমন?’ কিটি বলল।
‘কিটি! এটা কি হচ্ছে?’ ভর্ৎসনার সুরে লেভিন বললেন।
‘কি হচ্ছে মানে?’ লেভিন যে তার প্রস্তাবটাকে যেন নিচ্ছেন অনিচ্ছায় এবং বিরক্তি সহকারে এতে আহত বোধ করল সে। ‘আমার যাওয়া চলবে না কেন? আমি তোমার ব্যাপারে বাধা দেব না। আমি… ‘
আমি যাচ্ছি কারণ আমার ভাই মারা যাচ্ছে। কিন্তু তুমি কি জন্য…’
কি জন্য? তুমি যে জন্য সেই জন্যই…’
‘আমার পক্ষে এমন গুরুতর একটা মুহূর্তেও ও ভাবছে কেবল এই কথা যে একলা থাকলে ওর বিছছিরি লাগবে’, লেভিন ভাবলেন এবং এরূপ গুরুতর ব্যাপারে এই কৈফিয়ৎটা রাগিয়ে দিল তাঁকে।
কঠোরভাবে তিনি বললেন, ‘এটা অসম্ভব।’
ব্যাপারটা কলহের দিকে গড়াচ্ছে দেখে আগাফিয়া মিখাইলোভনা আস্তে করে পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেলেন। কিটির সেটা নজরেই পড়ল না। যে সুরে স্বামী ওই শেষ কথাটা বলেছেন সেটা তাকে আঘাত দিল বিশেষ করে এই জন্য যে কিটি যা বলেছে স্পষ্টতই সেটা তিনি বিশ্বাস করছেন না।
‘আর আমি তোমাকে বলছি যে তুমি যদি যাও, তাহলে আমিও তোমার সাথে যাব, অবশ্য-অবশ্যই যাব’, কিটি বলল তাড়াতাড়ি কর এবং সরোষে। ‘কেন অসম্ভব? কেন বলছ যে অসম্ভব?’
‘কারণ সৃষ্টিকর্তা জানেন কোথায় যাচ্ছি, কোন রাস্তায়, কোন হোটেলে। তুমি থাকলে মুশকিলে পড়ব’, লেভিন বললেন শান্ত থাকার চেষ্টা কর।
‘একটুও না। আমার কিছুই লাগবে না। তুমি যেখানে পারবে, সেখানে আমিও…’
‘অন্তত শুধু এই একটা কারণে যে—ওই মেয়েটা থাকবে সেখানে, তার সাথে তোমার অন্তরঙ্গতা হতে পারে না।’
‘আমি কিছু জানি না, জানতে চাই না কে থাকবে সেখানে, কি থাকবে। শুধু জানি যে স্বামীর ভাই মারা যাচ্ছে, স্বামী যাচ্ছে তার কাছে, আমিও স্বামীর সাথে চলেছি যাতে…’
‘কিটি! রাগ করো না। কিন্তু ভেবে দেখো যে ব্যাপারটা গুরুতর, ভাবতে কষ্ট হচ্ছে যে তুমি এখানে নিজের দুর্বলতাটা, একলা থাকতে অনিচ্ছাটা মিশিয়ে ফেলছ। একলা থাকতে বিছছিরি লাগবে, বেশ মস্কো যাও।’
‘সবসময় তুমি আমার মধ্যে এটা খারাপ একটা নিচ মতলব দেখতে পাও’, কিটি বলল অপমান ও ক্রোধের অশ্রু নিয়ে, ‘আমি কিছু না, দুর্বলতা কিছু নেই আমার… আমি শুধু এই বুঝি যে স্বামী যখন দুঃখে পড়েছে; তখন তার সাথে থাকা আমার কর্তব্য। কিন্তু তুমি ইচ্ছে করেই কষ্ট দিতে চাও আমাকে, ইচ্ছে করেই বুঝতে চাইছে না…’
‘না, ভয়ংকর ব্যাপার! কেমন একটা গোলাম হয়ে থাকা!’ নিজের বিরক্তি আর চেপে রাখতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন। কিন্তু তক্ষুনি টের পেলেন যে তিনি আঘাত করছেন নিজেকেই।
‘তাহলে কেন বিয়ে করলে তুমি? বেশ তো স্বাধীন ছিলে। কেন, এখন যখন অনুতাপ হচ্ছে তোমার?’ এই বলে লাফিয়ে উঠে কিটি ছুটে গেল ড্রয়িং-রুমে।
লেভিন যখন তার কাছে গেলেন, সে ফোঁপাচ্ছিল।
তিনি বলতে শুরু করলেন, খুঁজলেন এমন কথা যা তাকে বুঝ মানাতে না পারলেও অন্তত শান্ত করবে। কিটি কিন্তু শুনছিল না তাঁর কথা, কোন কিছুতেই সে রাজি হল না। নিচু হয়ে লেভিন তার হাতটা নিলেন যা প্রতিরোধ করছিল। চুমু খেলেন হাতে, চুমু খেলেন চুলে, তারপর আবার হাতে—কিটি চুপ করে রইল। কিন্তু যখন তিনি দুই হাতে কিটির মুখখানা ধরে বলে উঠলেন : ‘কিটি!’ তখন হঠাৎ সম্বিত ফিরল তার, কেঁদে ফেলে মিটমাট করে নিল।
