‘হ্যাঁ, ওগুলো রসটুকু শুষে নিয়ে একটা মিথ্যে রোশনাই ছাড়ে’, বিড়বিড় করে লেখা থামালেন লেভিন আর কিটি তাঁর দিকে হেসে তাকিয়ে আছে টের পেয়ে মুখ ফেরালেন।
‘কি হল?’ হেসে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘ফিরে তাকাল তাহলে’, ভাবল কিটি। এবং ওঁর দিকে তাকিয়ে কাজ থেকে সরানো হয়েছে বলে রাগ করেছেন কিনা তা আনন্দ করার চেষ্টা করে বলল, ‘আমার ইচ্ছে হচ্ছিল তুমি যেন আমার দিকে চাও।’
‘তা, শুধু দুজনে মিলে থাকতে ভালোই তো লাগে! আমার লাগে’, সুখের হাসিতে জ্বলজ্বলে হয়ে কিটির কাছে এসে লেভিন বললেন।
‘এত ভালো লাগছে আমার! কোথাও আমি যাব না, বিশেষ করে মস্কোয়।’
‘কি ভাবছিলে?’
‘আমি? আমি ভাবছিলাম… না, না, যাও লেখো গে, অন্য দিকে মন দিয়ো না’, কিটি বলল ওষ্ঠ সংকুচিত করে, ‘আমাকে এখন এইগুলো কাটতে হবে, দেখছ, এই ছেঁদাগুলো।’
কাঁচি নিয়ে কাটতে শুরু করল সে।
‘না, বলো কি?’ কিটির পাশে বসে ছোট্ট কাঁচিটার বৃত্তাকার গতি লক্ষ করতে করতে লেভিন বললেন। ‘ও, কি আমি ভাবছিলাম? ভাবছিলাম মস্কোর কথা, তোমার মাথার পেছনটার কথা।’
‘ঠিক কেন যে আমার এত সুখ বলো তো? স্বাভাবিক নয়। বড় বেশি ভালো’, লেভিন বললেন ওর হাতে চুমু খেয়ে।
‘আমার কাছে উল্টো, যত ভালো ততই স্বাভাবিক।’
‘তোমার কিন্তু একগোছা চুল খসে এসেছে’, সন্তর্পণে কিটির মাথাটা ঘুরিয়ে লেভিন বললেন, ‘চুল। দেখেছ, এখানে। না, থাক, কাজে ফিরতে হবে আমাদের।’
কাজ আর চলল না, আর কুজ্মা এসে যখন বলল যে চা দেওয়া হয়েছে, দোষীর মত পরস্পর থেকে ছিটকে গেলেন ওঁরা।
‘শহর থেকে ওরা এসেছে?’ কুমাকে জিজ্ঞেস করলেন লেভিন।
‘এইমাত্র ফিরল। ডাক বাছছে।’
‘তাড়াতাড়ি ফিরো’, স্টাডি থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে কিটি বলল লেভিনকে, ‘নইলে তোমাকে ছাড়াই চিঠি পড়ে ফেলব। আর শোন, ডুয়েটে পিয়ানো বাজানো যাক।’
একা হয়ে নিজের খাতাপত্র কিটির কেনা নতুন পোর্টফোলিওটায় গুছিয়ে কিটির সাথে সাথে মনোরম সব সাজ- সজ্জা সমেত নতুন যে ওয়াশস্ট্যান্ডটার উদয় হয়েছে এখানে তাতে হাত ধোবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন লেভিন। নিজের ভাবনাটায় হাসি পেল লেভিনের এবং অননুমোদনের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন সে ভাবনায়; অনুশোচনার মত একটা মনোভাব বিঁধছিল তাঁকে। তাঁর বর্তমান জীবনে কি-একটা যেন আছে লজ্জাকর, থলথলে, তাঁর ভাষায় ঘ্যাটের মত; তাঁর মনে হল, ‘এভাবে দিন কাটানো ভালো নয়। তিন মাস হতে চলল অথচ প্রায় কিছুই করিনি আমি। আজ প্রথম গুরুত্ব নিয়ে কাজে লেগেছিলাম, কিন্তু কি দাঁড়াল? শুরু করেই ছেড়ে দিলাম। এমন কি আমার সাধারণ যে কাজ, তাও প্রায় ফেলে রেখেছি। বিষয়কর্ম—তা দেখতেও আমি প্রায় যাই না। কখনো ওকে একলা রেখে যেতে কষ্ট হয়, কখনো দেখতে পাই যে ওর একঘেয়ে লাগছে। অথচ আমি কিনা ভেবেছিলাম যে বিয়ের আগের জীবনটা সে হলেই হল, চলে যাচ্ছে, ওটা ধর্তব্যের মধ্যেই নয়, সত্যিকারের জীবন শুরু হবে বিয়ের পরে। অথচ তিন মাস তো হতে চলল, এমন অলস আর অসার্থক দিন আমি কাটাইনি কখনো। না, এটা অনুচিত, শুরু করা দরকার। বলা বাহুল্য ওর দোষ নেই। কোন কিছুর জন্যই ভর্ৎসনা করা চলে না ওকে। নিজেরই আমার শক্ত হওয়া উচিত ছিল, রক্ষা করতে হত নিজের পুরুষালী স্বাধীনতা। নইলে এভাবে আমি নিজেই অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারি, ওকেও তাই করে তুলব… বলাই বাহুল্য ওর দোষ নেই’, মনে মনে ভাবলেন তিনি।
কিন্তু অসন্তুষ্ট ব্যক্তির পক্ষে অন্যকে এবং যে তার কাছে সবচেয়ে প্রিন্স তাকে নিজের অসন্তোষের জন্য ভর্ৎসনা না করা কঠিন। এবং লেভিনের ঝাপসাভাবে মনে হল দোষ ওর নয় (কোন কিছুতেই দোষী হওয়া সম্ভব নয় ওর পক্ষে), দোষ ওর লালনপালনের যা অগভীর, চপল (যেমন ঐ বাঁদর চাঙ্কিটা; আমি জানি যে কিটি ওকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি’)। ‘হ্যাঁ, সংসার নিয়ে আগ্রহ ছাড়া (এটা ওর আছে), নিজের প্রসাধন আর বিলেতি এম্ব্রয়ডারি ছাড়া ওর গুরুত্বপূর্ণ কোন আগ্রহ নেই। আমার কাজে, বিষয়কর্মে, চাষীদের নিয়ে, সঙ্গীতে, যাতে তার বেশ দখল আছে, বই পড়ায় কোন আগ্রহ নেই ওর। কিছুই সে করে না আর তাতে খুব তুষ্ট থাকে সে।’ মনে মনে লেভিন এটার সমালোচনা করতেন, কিন্তু তখনো বোঝেননি যে কিটি ক্রিয়াকলাপের সেই পর্বের জন্য তৈরি হচ্ছে যা আসার কথা, যখন সে হবে একই সময়ে স্বামীর স্ত্রী, গৃহের কর্ত্রী, গর্ভধারিণী, স্তন্যদাত্রী, শিশুদের পালিকা। লেভিন ভাবেননি যে কিটি এটা তার সহজবোধে জেনে ফেলেছে এবং তৈরি হচ্ছে এই সাংঘাতিক খাটুনির জন্য, নির্ভাবনা আর প্রেমসুখের যে মুহূর্তগুলিকে সে এখন কাজে লাগিয়ে সানন্দে তার ভবিষ্যৎ নীড় রচনা করে চলেছে তার জন্য আত্মগ্লানি নেই তার।
ষোলো
লেভিন যখন ওপরে গেলেন, স্ত্রী তখন রূপার নতুন সামনোভার আর চায়ের নতুন সরঞ্জামগুলোর সামনে বসে ছোট একটা টেবিলের কাছে আর এক পেয়ালা চা ঢেরে বৃদ্ধা আগাফিয়া মিখাইলোভনাকে বসিয়ে ডল্লির চিঠি পড়ছিল। তাঁর সাথে কিটির অবিরাম পত্র-বিনিময় হত ঘন ঘন।
‘দেখছেন তো, আমাকে এখানে বসিয়ে তাঁর কাছে থাকতে বলেছেন’, কিটির দিকে চেয়ে অমায়িক হেসে বললেন আগাফিয়া মিখাইলোভনা।
