প্রথম দিককার গোটা এই সময়টায় বিশেষ তীব্রভাবে অনুভব হত, যে শেকলটায় তাঁরা বাঁধা, যেন তার দু’দিকেই চলছে এক একটা হেঁচকা টানাটানি। মোটের ওপর মধুচন্দ্রিকা, অর্থাৎ বিয়ের পরেকার মাসটা, লোকপ্রথা অনুসারে যা থেকে অনেককিছু আশা করছিলেন লেভিন, তা মধুময় তো হলই না, বরং দুজনের মনেই তা তাঁদের জীবনের একটা দুর্বিষহ ও হীনতাসূচক সময়ের স্মৃতি রেখে গেল। এই যে অসুস্থ সময়টায় দুজনেই স্বাভাবিক থাকতেন কদাচিৎ, স্বপ্রকৃতিস্থ থাকতেন কদাচিৎ, তার সমস্ত কদর্য, লজ্জাকর ঘটনাগুলো তাঁরা দুজনেই পরবর্তী জীবনে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন সমানভাবে।
মস্কোয় তাঁরা গিয়েছিলেন এক মাসের জন্য। সেখান থেকে ফেরার পর দাম্পত্য জীবনের কেবল তৃতীয় মাসেই তাঁদের জীবন হয়ে উঠল মসৃণ।
আন্না কারেনিনা – ৫.১৫
পনেরো
সবেমাত্র তাঁরা মস্কো থেকে ফিরে একা হতে পেরে খুশি হলেন। লেভিন তাঁর স্টাডিতে টেবিলের সামনে বসে লিখতেন। আর বিয়ের পর প্রথম কদিন গাঢ় বেগুনি রঙের যে পোশাকটা সে পরতো, লেভিনের কাছে যা ছিল বিশেষ আদৃত ও মনে রাখার মত, সেটা কিটি আবার পরলে এবং স্টাডিও লেভিনের বাবা ও দাদার আমলে সব সময় যেটা থাকত, চামড়া-বাঁধাই সেই পুরানো সোফাটায় বসে বিলেতি এম্ব্রয়ডারি বুনে যেত। লেভিন ভাবতেন আর লিখতেন এবং সব সময় কিটির উপস্থিতি অনুভব করে আনন্দ হত তাঁর। বিষয়-আশয় দেখা এবং যে বইটাতে কৃষিকর্মের মূল নীতিগুলি বিবৃত করার কথা, তা নিয়ে খাটুনি তিনি ছেড়ে দেননি; কিন্তু যে অন্ধকারে তাঁর জীবন সমাচ্ছন্ন ছিল, তার তুলনায় আগে যেমন এই খাটুনি আর চিন্তাপ্রয়াস ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ মনে হত, এখন তেমনি সুখের উজ্জ্বল কিরণে উদ্ভাসিত ভবিষ্যৎ জীবনের তুলনায় সমান গুরুত্বহীন ও ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। কাজ তিনি চালিয়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু টের পাচ্ছিলেন যে এখন তাঁর মনোযোগের ভারকেন্দ্র সরে গেছে অন্য জিনিসে আর তার ফলে এখন ব্যাপারটা তিনি দেখছেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে এবং আরও পরিষ্কার করে। আগে কাজগুলো তাঁর কাছে ছিল জীবন থেকে পরিত্রাণ। আগে তিনি অনুভব করতেন যে এই কাজটা ছাড়া জীবন হবে বড় বেশি তিমিরাচ্ছন্ন। এখন জীবন যাতে বড় বেশি একটানা রকমের উজ্জ্বল না হয়ে পড়ে তার জন্য কাজটা তাঁর কাছে প্রয়োজনীয়। আবার নিজের কাগজগুলো নিয়ে যা লিখেছেন পড়ে দেখে তিনি খুশি হলেন যে কাজটা নিয়ে খাটার সার্থকতা আছে। কাজটা নতুন এবং তা উপকার দেবে। তাঁর আগেকার চিন্তার বহুকিছু তাঁর কাছে মনে হল অবান্তর এবং তা চরমে গেছে, কিন্তু গোটা বিষয়টা মনে মনে নতুন করে নাড়াচাড়া করে নেওয়ায় অনেক সমস্যাই পরিষ্কার হয়ে উঠল তাঁর কাছে। রাশিয়ার কৃষির দুরবস্থার কারণ নিয়ে নতুন একটা অধ্যায় তিনি লিখলেন এবার। তিনি দেখাচ্ছিলেন যে রাশিয়ায় দারিদ্র্য দেখা দিচ্ছে শুধু ভূসম্পত্তির বেঠিক বণ্টন আর ভুল পরিচালনার জন্য নয়। ইদানীং এতে সহায়তা করছে রাশিয়ায় অস্বাভাবিকভাবে আমদানি করা বাইরের সভ্যতা, বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা, রেলপথ, যা থেকে ঘটছে শহরগুলির কেন্দ্রীভবন, বিলাস বৃদ্ধি এবং তার পরিণামে কৃষির ক্ষতি করে ফ্যাক্টরি-ভিত্তিক শিল্প, ক্রেডিট আর তার সহচর শেয়ার-বাজারি ফাটকার বিকাশ। তাঁর মনে হচ্ছিল যে দেশে সম্পদের স্বাভাবিক বিকাশ হলে এই ব্যাপারগুলিই আসবে, তবে শুধু তখন, যখন কৃষিতে যথেষ্ট শ্রম ঢালা হয়েছে, যখন কৃষি চলছে সঠিক পথে, অন্তত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে; দেশের সম্পদ বাড়া চাই সমভাবে, বিশেষ করে এমনভাবে যাতে সম্পদের অন্যান্য শাখা কৃষিকে ছাড়িয়ে না যায়; কৃষি যে নির্দিষ্ট মানটায় রয়েছে তারই উপযোগী রূপে বাড়া উচিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আমাদের ভূমির অপব্যবহারের ক্ষেত্রে যে রেলপথ প্রবর্তিত হয়েছে অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে, সেটা হয়েছে অকালে এবং রেলপথ দ্বারা কৃষির যে সাহায্য হবে আশা করা হয়েছিল তার বদলে রেলপথ কৃষিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে, আর শিল্প ও ক্রেডিটের বিকাশ ঘটিয়ে কৃষিকে থামিয়ে রেখেছে, জীবদেহে কোন একটা অঙ্গের অকালে ও একপেশে বৃদ্ধিতে যেমন দেহের সাধারণ বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়, তেমনি রাশিয়ায় সম্পদের সাধারণ বিকাশের ক্ষেত্রে ক্রেডিট, যোগাযোগ ব্যবস্থা, এবং ইউরোপে ফ্যাক্টরিগুলি কালোপযোগী এবং নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় হলেও ফ্যাক্টরিগুলির কর্মচাঞ্চল্য বৃদ্ধি আমাদের এখানে কৃষির সুব্যবস্থা করার উপস্থিত প্রশ্ন নাকচ করে দিয়ে ক্ষতিই করেছে।
আর ওদিকে লেভিন যতক্ষণ লিখছেন, কিটি তখন ভাবছে তরুণ প্রিন্স চার্স্কির প্রতি কি অস্বাভাবিক মনোযোগ দেখিয়েছে তার স্বামী। চলে আসার আগে কিটির প্রতি প্রিন্স হয়ে উঠেছিলেন অতি অশিষ্ট ধরনে গদগদ। কিটি ভাবছিল, ‘ও যে হিংসে করে! ওহ্ সৃষ্টিকর্তা, অথচ কি মিষ্টি আর বোকা ও। আমার জন্য ঈর্ষা হয় ওর! যদি ও জানতো যে আমার কাছে ওদের সবার দাম পিওতর বাবুর্চির চেয়ে বেশি নয়’, নিজের কাছেই অদ্ভুত মালিকানা অনুভূতি নিয়ে লেভিনের মাথার পেছনটা আর লাল ঘাড়ের দিকে চেয়ে কিটি ভাবলে, ‘কাজ থেকে ওকে টেনে আনতে কষ্ট হচ্ছে অবশ্য (তবে ও পরে লিখে ফেলতে পারবে!), কিন্তু ওর মুখ আমাকে দেখতে হবে। ও কি টের পাচ্ছে যে আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি? চাই ও যেন ফিরে তাকায়!… চাই, কিন্তু!’ ওঁর ওপর তার দৃষ্টির এভাব বাড়িয়ে তোলার জন্য সে চোখ মেললে আরো বড় বড় করে।
