পিতৃগৃহে কিটির মাঝে মাঝে ইচ্ছা হত ভাস বা বাঁধাকপি, কি চকোলেট খাবে কিন্তু কোনটাই জুটত না, আর এখন সে যা ইচ্ছা ফরমাশ দিতে পারে, কিনতে পারে স্তূপাকৃতি চকোলেট, যত খুশি টাকা খরচ করা যায়, ইচ্ছামত বরাত করা সম্ভব মিষ্টি কেকের, এই যে পরিবর্তনটা কিটি অনুভব করতে, সেটা বুঝতেন না লেভিন
কিটি এখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে ডল্লির আসার সানন্দ স্বপ্নে বিভোর, কেননা শিশুগুলির যার যা পেয়ারের কেক তার হুকুম দিতে পারবে সে, আর ডল্লি কদর করবেন তার ব্যবস্থা-বন্দোবস্তের। কিটি নিজেই জানতো না কেন এবং কিসের জন্য, কিন্তু গৃহস্থালী তাকে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে টানতো। স্বতঃবোধে বসন্ত আসন্ন অনুভব করায় এবং এটা জানা থাকায় যে দুর্যোগের দিনও আসবে, সে তার নীড়টি বাঁধছিল যেমন পারে, তাড়াতাড়ি করছিল একই সাথে বাসা বাঁধতে আর কি করে তা বাঁধতে হয় শিখে নিতে
বিবাহোত্তর সমুন্নত সুখ সম্পর্কে লেভিনের যা আদর্শ, তার অতি বিরোধী এসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে কিটির এই দুশ্চিন্তা ছিল একটা মোহভঙ্গ; আর এই মধুর যে ব্যস্ততাগুলোর অর্থ তিনি বুঝতেন না, আবার ভালো না বেসেও পারতেন না, তা হল নতুন মুগ্ধতাগুলির একটা।
দ্বিতীয় মোহভঙ্গ ও মুগ্ধতা হল কলহ। লেভিন কদাচ কল্পনা করতে পারেননি তাঁর ও স্ত্রীর মধ্যে কোমলতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসার সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু সম্ভব; আর হঠাৎ কিনা প্রথম দিনগুলোয় ঝগড়া বাধল আর কিট ওঁকে বলে দিলে যে উনি ওকে ভালোবাসেন না, ভালোবাসেন কেবল নিজেকে, কাঁদলে, হাত ঝটকালে।
প্রথম ঝগড়াটা হয়েছিল কারণ লেভিন নতুন একটা খামার বাড়িতে গিয়েছিলেন এবং ফেরেন আধ ঘণ্টা দেরি করে, কেননা তাড়াতাড়ি একটা রাস্তা ধরতে গিয়ে পথ হারান। বাড়ি তিনি আসেন কেবল কিটির কথা, তার ভালোবাসা, নিজের সুখের কথা ভাবতে ভাবতে আর যতই কাছিয়ে আসছিলেন ততই বেশি করে তাঁর মধ্যে প্রেমের আগুন জ্বলে উঠছিল। ঘরে তিনি ঢুকলেন ছুটতে ছুটতে এবং একই হৃদয়াবেগ নিয়ে, শ্যেরবাৎস্কিদের ওখানে গিয়ে তিনি যখন পাণিপ্রার্থনা করেন এটা তার চেয়েও প্রবল। হঠাৎ তিনি দেখলেন কিটির গোমড়া মুখ যা আগে কখনো দেখেননি। চুমু খেতে চেয়েছিলেন লেভিন, কিন্তু কিটি ঠেলে সরিয়ে দিলে তাঁকে।
‘কি হল?’
‘তোমার তো ফুর্তি লাগছে দেখছি…’ কিটি শুরু করলে শান্তভাবে একটা বিষাক্ত সুর ফোটাবার চেষ্টা করে। কিন্তু যেই সে মুখ খুলল, অমনি অর্থহীন ঈর্ষায় ভর্ৎসনার কথাগুলো, এই আধ ঘণ্টা জানালার কাছে নিশ্চল হয়ে বসে থাকার সময় যা কিছু তাকে পীড়িত করেছে তা সব অনর্গল বেরিয়ে এল। বিবাহের পর গির্জা থেকে কিটিকে নিয়ে আসার সময় লেভিন যা বোঝেননি, সেটা স্পষ্ট বুঝলেন কেবল এই প্রথম। তিনি বুঝলেন যে কিটি শুধু তার
আপনজন নয়, তিনি জানেনই না কোতায় কিটির শেষ আর তাঁর শুরু। সেটা তিনি বুঝলেন সেই মুহূর্তে দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ার যে যন্ত্রণাকর অনুভূতি তাঁর হচ্ছিল তা থেকে। প্রথম মিনিটটায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তেই তিনি টের পেলেন যে কিটি তাঁকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে না, কেননা নিজেই তিনি কিটি। প্রথম মুহূর্তটায় তাঁর যে মনোভাব হয়েছিল তা সেই লোকের মত যে পেছন থেকে হঠাৎ প্রচণ্ড একটা গুঁতো খেয়ে রাগে আর প্রতিশোধস্পৃহায় ঘুরে দাঁড়িয়ে দোষীকে খুঁজে খুঁজে দেখে যে দোষ তারই, এবং নিঃসন্দেহ হয়ে ওঠে যে নিজেই সে গুঁতো মেরেছে নিজেকে, কারো ওপর রাগ করার নেই, ব্যথাটা মেনে নিয়ে সয়ে যেতে হবে।
এর পরে আর কখনো তিনি এটা এত তীব্রভাবে অনুভব করেননি, কিন্তু সেই প্রথম বার অনেকক্ষণ সুস্থির হতে পারেননি তিনি। স্বাভাবিক একটা প্রবৃত্তিতে কৈফিয়ৎ দাবি করতে যাচ্ছিলেন তিনি, কিটির দোষটা তাকে দেখিয়ে দিতে চাইছিলেন; কিন্তু দোষ দেখিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে তাকে আরো চটিয়ে দেওয়া, যে ফাটলটা সমস্ত বিপত্তির কারণ তাকে বাড়িয়ে তোলা। অভ্যস্ত একটা প্রবণতা ছিল দোষটা নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে কিটির ওপর চাপানো; কিন্তু প্রবলতর আরেকটা প্রবণতা তাঁকে টানছিল তাড়াতাড়ি, যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফাটলটাকে বাড়তে না দিয়ে মিটিয়ে ফেলা। এমন অন্যায় একটা অভিযোগ মেনে নিয়ে থাকা কষ্টকর, কিন্তু নিজেকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করা, ওদে দগ্ধানো হবে আরো খারাপ। আধঘুমন্ত লোকের যন্ত্রণা হলে যেমন হয়, তার মত তিনি চাইছিলেন রুগ্ণ অঙ্গটা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে, কিন্তু চৈতন্যোদয় হতে টের পেলেন যে রুগ্ণ অঙ্গটা তিনি নিজে। সে অঙ্গটা যাতে সহিষ্ণু হয়, তাতে সাহায্য করার চেষ্টা করা উচিত এবং সে চেষ্টা তিনি করলেন।
মিটমাট হয়ে গেল ওঁদের। নিজের দোষ সম্পর্কে সচেতন হয়ে কিন্তু লেভিনকে তা না বলে কিটি ওঁর প্রতি আরো কোমল হয়ে উঠল, ভালোবাসার দ্বিগুণ একটা নতুন সুখ বোধ করলেন তাঁরা। কিন্তু সংঘাতের পুনরাবৃত্তি হতে এমন কি ঘন ঘনই এবং খুবই অপ্রত্যাশিত ও তুচ্ছ কারণে, কোন বাধা হল না এতে। সংঘাতগুলো হচ্ছিল ঘন ঘন, কারণ তখনো তাঁরা জানতেন না পরস্পরের কাছে কি গুরুত্বপূর্ণ, এবং এ কারণেও বটে যে এই প্রথম দিকটায় উভয়েরই মেজাজ প্রায়ই থাকত বিগড়ে। একজনের মেজাজ যখন ভালো থাকত আর অন্যজনের খারাপ তখন শান্তিভঙ্গ হত না, কিন্তু যখন দুজনেরই মেজাজ খারাপ থাকত, তখন সংঘাত বাধতো এবং দুর্বোধ্য তুচ্ছ কারণে যে পরে মনে করতে, পারতেন না তাঁরা ঝগড়াটা বেধেছিল কি নিয়ে। এ কথা ঠিক যে দুজনেরই মন ভালো থাকলে জীবনের আনন্দ হয়ে উঠত দ্বিগুণ। তাহলেও এই প্রথম দিকটায় দুঃখের একটা সময় গিয়েছিল তাঁদের।
