ওদিকে মিখাইলোভ কিন্তু আন্নার পোর্ট্রেটে খুব ডুবে গেলেও সিটিঙগুলো যখন শেষ হল, শিল্প নিয়ে গোলেনিশ্যেভের মতামত শোনার প্রয়োজন রইল না, ভুলে যেতে পারেন ভ্রন্স্কির ছবিটাকে, তখন তিনি বেশি খুশি হলেন ওঁদের চেয়েও। তিনি জানতেন যে চিত্রকলা নিয়ে ভ্রন্স্কির ছেলেখেলা নিষিদ্ধ করা চলে না; ওঁর এবং সমস্ত অপেশাদারদেরই যা খুশি আঁকার পূর্ণ অধিকার আছে, কিন্তু বিছছিরি লেগেছিল তাঁর। মোম দিয়ে বড় একটা পুতুল বানিয়ে লোকে যদি সেটাকে চুমু খায় তা বারণ করা যায় না। কিন্তু যে প্রেমে পড়েছে, লোকটা যদি তার পুতুল নিয়ে যায় তার কাছে, এবং প্রেমিক যাকে ভালোবাসে তাকে সে যেভাবে আদর করে সেভাবে লোকটা আদর করতে থাকে তার পুতুলকে, তাহলে প্রেমিকের খারাপ লাগবে। ভ্রন্স্কির ছবি দেখে সেইরকম একটা বিশ্রী অনুভূতি হয়েছিল তাঁর : তাঁর একাধারে হাসি পেয়েছিল, রাগ হয়েছিল, করুণা বোধ করেছিলেন তিনি, নিজেকে মনে হয়েছিল অপমানিত।
চিত্রকলা আর মধ্য যুগ নিয়ে ভ্রুনস্কির নেশা বেশি দিন টিকল না। শিল্পরুচি তাঁর এতখানি ছিল যে নিজের ছবি তিনি শেষ করতে আর পারলেন না। আঁকা থেমে গেল। ঝাপসাভাবে তিনি টের পাচ্ছিলেন কি ত্রুটি ছবিটার, প্রথমটায় সামান্য লক্ষণীয় হলেও আঁকা চালিয়ে গেলে সেগুলো হয়ে উঠবে মারাত্মক। তাঁর ক্ষেত্রে যা ঘটল সেটা ঘটেছে গোলেনিশ্যেভের ক্ষেত্রে, যিনি অনুভব করছিলেন যে তাঁর বলার কিছু নেই এবং ক্রমাগত এই বলে আত্মপ্রতারণা করছিলেন যে তাঁর ভাবনাটা এখনো পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি, তিনি খাটছেন সেটা নিয়ে আর মালমশলা সংগ্রহ করে চলেছেন। কিন্তু গোলেনিশ্যেভকে এটা তিক্ত করে তুলছিল, যন্ত্রণা দিচ্ছিল, ভ্রন্স্কি ওদিকে আত্মপ্রতারণা করতে ও নিজেকে কষ্ট দিতে পারেন না, বিশেষ করে পারেন না তিক্ত হয়ে উঠতে। নিজের স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ়তায় তিনি কিছু না বলে, কোন কৈফিয়ৎ না দিয়ে শিল্পচর্চা বন্ধ করলেন।
আন্না বিস্মিত হন তাঁর মোহভঙ্গে। অথচ ঐ চর্চাটা ছাড়া ইতালীয় শহরে তাঁর ও আন্নার জীবন তাঁর কাছে এত একঘেয়ে লাগল, পালাৎসো হঠাৎ হয়ে উঠল স্পষ্টত এত জীর্ণ আর নোংরা, কার্নিসের ভাঙা পলেস্তারা, পর্দায় দাগ এবং মেঝেতে ফুটো এত বিশ্রী দেখাতো, সেই একই গোলেনিশ্যেভ, ইতালীয় প্রফেসার আর জার্মান পর্যটকের সেই একই সাহচর্য এত বিরক্তিকর দাঁড়াল যে দরকার পড়ল জীবনটা বদলে নেবার। তাঁরা স্থির করলেন যাবেন রাশিয়ায়, গ্রামে। ভ্রন্স্কি ঠিক করলেন পিটার্সবুর্গে ভাইয়ের সাথে সম্পত্তি ভাগ করে নেবেন আর আন্নার ইচ্ছা ছেলেকে দেখার। গ্রীষ্মটা তাঁরা কাটাবেন ভাবলেন ভ্রন্স্কির পৈত্রিক মহালে।
চৌদ্দ
লেভিনের বিয়ের পর তৃতীয় মাস চলছে। সুখী তিনি, তবে যা আশা করেছিলেন মোটেই সে ধরনে নয়। প্রতি পদে তাঁর চোখে পড়ত আগের স্বপ্নগুলোয় মোহভঙ্গ আর অপ্রত্যাশিত নতুন মোহ। লেভিন সুখী, কিন্তু সংসার পেতে তিনি প্রতি পদে দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি যা কল্পনা করেছিলেন সেটা সেই লোকের দশার মত যে মুগ্ধ হয়ে হ্রদে মসৃণ, নিশ্চিন্ত নৌকা বাওয়া দেখার পর নিজেই উঠেছে সে নৌকায়। সে দেখতে পাচ্ছে টলমল না করে স্থির হয়ে বসে থাকা দরকার তাই শুধু নয়, মাথাও খিলাতে হবে, মুহূর্তের জন্যও ভোলা চলবে না কোথায় যাওয়া দরকার, পায়ের নিচে পানি, দাঁড় বাইতে হবে, অনভ্যস্ত হাত ব্যথা করছে, নৌকা বাওয়া দেখতেই শুধু সহজ, বাইতে যাওয়া অতি আনন্দের হলেও অতিশয় কঠিন।
যখন অবিবাহিত ছিলেন, অন্যদের দাম্পত্য জীবন, ছোটখাটো ঝামেলা, ঝগড়া-ঝাঁটি, ঈর্ষা দেখে তিনি শুধু অবজ্ঞাভরে হেসেছেন মনে মনে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে তাঁর ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনে এ সব শুধু হবে না তাই নয়, মনে হত তার বাইরের চেহারাটাও হবে একেবারেই অন্যদের জীবনের মত নয়। হঠাৎ তার বদলে স্ত্রীর সাথে তাঁর জীবনটা বিশেষ রকমের কিছু-একটা হয়ে উঠল না শুধু তাই নয়, গড়ে উঠল ঠিক সেই সব তুচ্ছ খুঁটিনাটি নিয়েই যাকে তিনি আগে অত অবজ্ঞা করেছেন কিন্তু যা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এখন একটা অসাধারণ ও অকাট্য গুরুত্ব লাভ করেছে। এবং লেভিন দেখলেন যে এসব তুচ্ছ জিনিসগুলোর সুব্যবস্থা করা মোটেই তেমন সহজ নয়, যা তাঁর মনে হয়েছিল আগে। পারিবারিক জীবনের একটা যথাযথ ধারণা তাঁর আছে বলে ধরে নিলেও অন্য সমস্ত পুরুষের মতই তিনিও শুধু প্রেমের পরিতৃপ্তিকেই পারিবারিক জীবন বলে কল্পনা করতেন যাতে কোন কিছুতেই ব্যাঘাত ঘটতে দেওয়া চলে না, ছোটখাট ঝামেলায় তা থেকে বিচ্যুত হওয়া অনুচিত। তাঁর ধারণায়, তিনি নিজের কাজ করে যাবেন আর কাজ থেকে বিশ্রাম নেবেন ভালোবাসার সুখাবেশে। কিটিকে হতে হবে শুধুই প্রিয়তমা। কিন্তু সমস্ত পুরুষের মত উনিও ভুলে গিয়েছিলেন যে কিটিরও কাজ করা প্রয়োজন। আর তাঁর দেখে অবাক লাগল যে কাব্যময়ী অপরূপা কিটি কিভাবে পারিবারিক জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই শুধু নয়, প্রথম কয়েকটা দিনেই টেবিল-ক্লথ, আসবাব, অতিথিদের জন্য শয্যা, ট্রে, বাবুর্চি, ডিনার ইত্যাদির কথা ভাবতে, মনে করতে, তা নিয়ে ব্যস্ত হতে পারল। সেই পাণিপ্রার্থী থাকার সময়েই যে দৃঢ়তায় কিটি বিদেশে যেতে আপত্তি জানিয়েছিল এবং স্থির করেছিল যে গ্রামে যাবে, যেন কি দরকার তেমন কিছু-একটা তার জানাই আছে, নিজের ভালোবাসা ছাড়াও বাইরের জিনিস নিয়ে সে ভাবতে পারছে, তাতে অভিভূত হয়েছিলেন লেভিন। তখন সেটা ক্ষুণ্ন করেছিল তাঁকে আর এখন বার কয়েক তাঁকে ক্ষুণ্ণ করেছে ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে তার ব্যস্ততা আর দুর্ভাবনা। কিন্তু উনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে ওটা কিটির দরকার। আর এই ঝামেলাগুলো কেন সেটা না বুঝলেও, তাতে তাঁর হাসি পেলেও কিটিকে ভালোবাসতেন বলে এতে মুগ্ধ না হয়ে পারতেন না। মস্কো থেকে আনা আসবাবগুলো কিটি যেভাবে সাজিয়েছে, নিজের এবং তাঁর ঘর যেভাবে নতুন করে গোছগাছ করেছে, পর্দা টাঙিয়েছে, যেভাবে ভবিষ্যৎ অতিথিদের এবং ডল্লির জন্য ঘর ঠিক করে ফেলেছে, যেভাবে নিজের নতুন দাসীর জন্য জায়গা বরাদ্দ করেছে, যেভাবে ডিনারের বরাত করত সে, আগাফিয়া মিখাইলোভনার সাথে তর্ক বাধিয়ে খাদ্যভাণ্ডারের ভার থেকে তাঁকে সরিয়ে দেয়, তাতে হাসতেন লেভিন। বৃদ্ধ পাচক মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখত, হাসত, শুনত তার আনাড়ী ও অসম্ভব হুকুমগুলো; দেখতে পেতেন যে ভাঁড়ারে তরুণী বধূর নতুন নির্দেশগুলোয় আগাফিয়া মিখাইলোভনা চিন্তিতভাবে সস্নেহে মাথা নাড়ছেন; কিটিকে লেভিনের অসাধারণ মিষ্টি লাগত যখন আধো কেঁদে আধো হেসে তাঁর কাছে এসে সে অনুযোগ করত যে দাসী মাশা তাকে বাবুবাড়ির অকর্মা মেয়ে বলে মনে করে, তাই কেউ তার কথা শোনে না। এটা তাঁর মিষ্টি লাগলেও অদ্ভুত মনে হত এবং তিনি ভাবতেন ওটা বাদ দিতে পারলেই বরং ভালো।
