কিটি তার মাকে এটা বলেছিল কথাগুলোয় কোন গুরুত্ব না দিয়ে। কিন্তু মা জিনিসটাকে নিয়েছিলেন অন্যভাবে। তিনি জানতেন যে বৃদ্ধা যে কোন দিন এসে পড়বেন বলে অপেক্ষা করা হচ্ছে, ছেলের নির্বাচনে বৃদ্ধা খুশি হবেন, তাই মাকে আঘাত দেবার ভয়েই নাকি ছেলে এখনো পাণিপ্রার্থনা করছে না এটা তার কাছে অদ্ভুত ঠেকেছিল; তাহলেও বিয়েটা তিনি এত চাইছিলেন, এবং তার চেয়েও বেশি করে চাইছিলেন দুর্ভাবনা থেকে শান্তি যে তাই-ই তিনি বিশ্বাস করতেন। বড় মেয়ে ডল্লি যে স্বামীকে ছেড়ে যাবে বলে ঠিক করেছে তা চোখে দেখা তাঁর কাছে এখন যতই কষ্টকর হোক, ছোট মেয়ের যে ভাগ্য নির্ধারিত হতে চলেছে তার জন্য অস্থিরতাই তাঁর অন্য সমস্ত অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আজ লেবিনের আবির্ভাবে আরো নতুন দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছি তার। তার ধারণা, লেভিনের প্রতি এক সময় টান ছিল মেয়ের, অতিরিক্ত সততাবশে সে আবার স্কিকে প্রত্যাখ্যান না করে বসে, এবং সাধারণভাবেই লেভিনের আগমনে সমাপ্তির মুখে এসে পড়া ব্যাপারটা আবার গোলমালে না পড়ে, বিলম্বিত না হয়, এই ভয় করছিলেন তিনি।
বাড়ি ফিরে প্রিন্স-মহিষী লেভিন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও কি অনেকদিন হল এসেছে?
‘আজ, মামা।
‘একটা কথা আমি বলতে চাই…’ মা শুরু করলেন এবং তাঁর গুরুগম্ভীর উত্তেজিত মুখ দেখে কিটি টের পেল কথাটা হবে কি নিয়ে।
লাল হয়ে উঠে ঝট করে দায়ের দিকে ফিরে সে বললে, মা, মিনতি করছি, বলল না। আমি জানি, সব জানি।
মা যা চাইছিলেন, সেও চাইছিল তাই, কিন্তু মায়ের চাওয়ার পেছনকার উদ্দেশ্যগুলো আঘাত দিচ্ছিল তাকে।
‘আমি শুধু বলতে চাই যে একজনকে আশা দিয়ে …’
মা, লক্ষ্মী মা আমার, সৃষ্টিকর্তার দোহাই, বলল না। ও নিয়ে কথা বলতে ভারি ভয় লাগে।
‘আচ্ছা, বলব না, বলব না, মেয়ের চোখে পানি দেখে মা বলল, কিন্তু একটা কথা, সোনা আমার, আমাকে কথা দাও যে আমার কাছ থেকে তুমি লুকিয়ে রাখবে না কিছু। রাখবে না তো?
কখনো না, কোন কিছুই না, আবার লাল হয়ে উঠে মায়ের চোখে চোখে তাকিয়ে বলল কিটি, কিন্তু এখন আমার বলার কিছু নেই। আমি… আমি… যদি আমি বলতে চাইতাম, তাহলেও জানি না কি বলব, কেমন করে বলব… আমি জানি না…’।
‘এইরকম চোখ নিয়ে তুমি মিথ্যে বলতে পারো না’, মেয়ের ব্যাকুলতায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে মা ভাবলেন হাসিমুখে। হাসিমুখে, কেননা মেয়ের প্রাণের ভেতর যা চলেছে সেটা বেচারির কাছে কি বিপুল আর অর্থময়ই না মনে হচ্ছে।
তেরো
আহারের পর থেকে সান্ধ্য পার্টি শুরু হওয়া পর্যন্ত কিটির অনুভূতিটা এমন হয়েছিল যে, লড়াইয়ে নামার আগে একটা তরুণের অনুভূতি যে রকম হয়। বুক তার ভয়ানক ঢিপঢিপ করছিল, কোন কিছুতেই মন বসাতে পারছিল না।
সে অনুভব করছিল, ওঁদের দুজনের মধ্যে প্রথম সাক্ষাৎ হচ্ছে এই যে সন্ধ্যায়, সেটা তার ভাগ্যনির্ধারক হওয়ার কথা। অনবরত তার কল্পনায় ভেসে উঠছিলেন ওঁরা দুজন, কখনো আলাদা আলাদা, কখনো দুজন একসাথে। অতীতে লেভিনের সাথে তার সম্পর্কের কথা সে স্মরণ করছিল পুলকে আর দরদে। শৈশবের স্মৃতি, তার প্রয়াত ভাইয়ের সাথে লেভিনের বন্ধুত্বের স্মৃতিতে তার সাথে কিটির সম্পর্কে লাগছিল একটা কাব্যিক মাধুর্যের ছোঁয়া। কিটির প্রতি তাঁর ভালোবাসা যাতে কিটি কাব্যিকে মাধুর্যের ছোঁয়া। কিটির প্রতি তার ভালোবাসা যাতে কিটি সুনিশ্চিত, সেটা ছিল তার কাছে অহংতৃপ্তি আর আনন্দের ব্যাপার। লেভিনের কথা ভাবাটা তার কাছে সহজ। কিন্তু ভ্রনস্কির কথা ভাবতে গেলে কি একটা সংকোচ গোল বাধাতো, যদিও তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় মার্জিত আর শান্ত; কেমন একটা মিথ্যাচার এসে পড়ত–ভ্রনস্কির দিক থেকে নয়, তিনি ছিলেন খুবই সহজ আর মিষ্টি স্বয়ং কিটির দিক থেকেই, যে ক্ষেত্রে লেভিনের কাছে সে নিজেকে অনুভব করত একেবারে সহজ আর পরিষ্কার। কিন্তু আবার যেই ভাবত ভ্রনস্কির সাথে তার ভবিষ্যতের কথা, অমনি তার সামনে ভেসে উঠত একটা জ্বলজ্বলে সুখময় পরিপ্রেক্ষিত; লেভিনের বেলায় ভবিষ্যৎটা দেখাতো ঝাপসা।
সন্ধ্যার জন্য সাজগোজ করতে ওপরে উঠে কিটি আয়নার তাকিয়ে সানন্দে লক্ষ্য করল যে আজকের দিনটা তার একটা ভালো দিন, নিজের সমস্ত শক্তি আছে তার পরিপূর্ণ দখলে আর সেটা দরকার আসন্নের জন্য; নিজের মধ্যে সে অনুভব করছিল বাইরের একটা প্রশান্তি এবং গতিভঙ্গিমায় অসংকোচ সৌষ্ঠব।
সাড়ে সাতটায় ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই চাপরাশি খবর দিল : কনস্তান্তিন দৃমিত্রি লেভিন। প্রিন্স-মহিষী তখনো তাঁর ঘরে আর প্রিন্স বেরিয়ে এলেন না। কিটি ভাবল, ‘ঠিক যা ভেবেছিলাম, সমস্ত রক্ত ধেয়ে এল তার হৃৎপিণ্ডে। আয়নার নিজের পাণ্ডুরতা দেখে আতঙ্কিত হয়ে উঠল সে।
এখন সে নিশ্চিত জানে যে আগে আগে তিনি এসেছেন শুধু কিটিকে একা পেয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন বলে। এখন এই প্রথম গোটা ব্যাপারটা তার কাছে প্রতিভাত হল একেবারে অন্য, নতুন একটা দিক থেকে। কেবল এখনই। সে বুঝল যে প্রশ্নটা কেবল একা তাকে নিয়ে নয়–করে সাথে সে সুখী হবে, কাকে সে ভালোবাসছে, এই নয়–এই মুহূর্তে তাকে আঘাত দিতে হবে এমন একজনের মনে যাকে সে ভালোবাসে। এবং আঘাত দিতে হবে নিষ্ঠুরভাবে…কিসের জন্য? এজন্য যে সে ভারি ভালো লোক, ভালোবাসে তাকে, তার প্রণয়াসক্ত। কিন্তু করবার কিছু নেই। এটাই দরকার, এটাই উচিত।
