খুব চাঙা হয়ে, ফুর্তি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন ভ্রন্স্কি, আন্না আর গোলেনিশ্যেভ। মিখাইলোভ আর তাঁর ছবিগুলো নিয়ে তাঁরা কথা বলছিলেন। আলাপে বার বার করে উঠছিল প্রতিভা শব্দটা। তাতে তাঁরা বোঝাচ্ছিলেন মন ও হৃদয় নির্বিশেষে সহজাত, প্রায় দৈহিক একটা সামর্থ্যের কথা, যা দিয়ে তাঁরা শিল্পীর সব কিছু অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করতে চাইছিলেন। শব্দ তাঁদের দরকার পড়েছিল, কারণ যা নিয়ে তাঁরা কথা বলছিলেন সে সম্পর্কে তাঁদের কোন ধারণা ছিল না, অথচ ইচ্ছে হচ্ছিল কথা বলার আর তার একটা নামকরণ দরকার। তাঁরা বলছিলেন যে ওঁর প্রতিভা আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু শিক্ষার অভাবে সেটা বিকশিত হতে পারে না—যেটা আমাদের রুশী শিল্পীদের সাধারণ দুর্ভাগ্য। তবে ছেলে দুটোর ছবিটা ওঁদের স্মৃতিতে গেঁথে গিয়েছিল এবং থেকে থেকেই উঠছিল তার কথা।
‘কি অপরূপ! কি করে ওটা উনি করতে পারলেন আর কি সহজে! ছবিটা যে কি সুন্দর তা নিজেই জানেন না। না, ছাড়া চলবে না, কিনব ওটাকে’, ভ্রন্স্কি বললেন।
তেরো
ভ্রন্স্কিকে ছবি বিক্রি করলেন মিখাইলোভ, আন্নার পোর্ট্রেট আঁকতেও রাজি হলেন। নির্ধারিত দিনে এসে কাজ শুরু করলেন তিনি।
পঞ্চম দিন থেকে চবিটা সবাইকে, বিশেষ করে ভ্রন্স্কিকে চমৎকৃত করে দিলে শুধু আন্নার সাথে তার সাদৃশ্যেই নয়, অসাধারণ সৌন্দর্যেও। আন্নার ওই বিশেষ সৌন্দর্যটা মিখাইলোভ কেমন করে যে ধরতে পারলেন আশ্চর্য। ‘তার অন্তরের এই সুমধুর অভিব্যক্তিটা ধরতে হলে আন্নাকে জানা ও বালোবাসা প্রয়োজন, আমি যেমন করে ভালোবেসেছি’, ভ্রন্স্কি ভাবলেন, যদিও আন্নার অন্তরের সুমধুর অভিব্যক্তিটা এত সত্য যে ভ্রন্স্কির এবং অন্যান্যদের মনে হল ওটা অনেকদিন থেকেই তাঁদের জানা।
তাঁর নিজের আঁকা পোর্ট্রেটটা সম্বন্ধে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আমি কত দিন থেকে মাথা ঠুকছি, কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারিনি, আর উনি তাকিয়ে দেখেই এঁকে ফেললেন। এই হল টেকনিকের মানে।’
‘যথাসময়ে তা দেখা দেবে’, বললেন গোলেনিশ্যেভ, তাঁর ধারণায় ভ্রন্স্কির প্রতিভাও আছে এবং বড় কথা শিক্ষাও আছে যাতে শিল্প সম্পর্কে একটা সমুন্নত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে তাঁর পক্ষে। ভ্রন্স্কির প্রতিভা বিষয়ে গোলেনিশ্যেভের প্রত্যয় পুষ্ট হয়েছে আরও এই জন্য যে তাঁর দরকার ছিল যে ভ্রন্স্কি তাঁর প্রবন্ধগুলি আর ভাবধারণায় দরদ দেখান, প্রশংসা করুন এবং তিনি অনুভব করতেন যে প্রশংসা ও সমর্থন হওয়া উচিত পারস্পরিক।
পরের বাড়িতে, বিশেষত ভ্রন্স্কির পালাৎসোতে মিখাইলোভকে মোটেই সে মানুষ মনে হত না যা তিনি ছিলেন নিজের স্টুডিওতে। তিনি থাকতেন নিজের সম্ভ্রম নিয়ে বিরূপ, যেন যাদের তিনি সম্বোধন করতেন হুজুর বলে আর আন্না ও ভ্রন্স্কি আমন্ত্রণ করা সত্ত্বেও ডিনারের জন্য থেকে যেতেন না এবং সিটিঙের জন্য ছাড়া আসতেন না এখানে। অন্য যে কোন লোকের চেয়ে ওঁর সাথেই আন্না মিষ্টি ব্যবহার করতেন বেশি এবং কৃতজ্ঞ ছিলেন নিজের পোর্ট্রেটটার জন্য। তাঁর প্রতি ভ্রন্স্কির মনোভাব ছিল শ্রদ্ধারও অধিক এবং স্পষ্টই বোঝা যেত নিজের ছবিটা সম্পর্কে ওঁর মতামত জানতে তিনি ছিলেন আগ্রহী। শিল্পের আসল একটা বোধ সম্পর্কে মিখাইলোভকে জ্ঞান দান করার সুযোগ কখনো চাড়তেন না গোলেনিশ্যেভ। কিকন্তু সবার প্রতিই মিখাইলোভ রইলেন সমান নিরুত্তাপ। ওঁর দৃষ্টি থেকে আন্না টের পেতেন যে তাঁকে চেয়ে দেখতে তাঁর ভালো লাগে; কিন্তু আন্নার সাথে কথোপকথন এড়িয়ে যেতেন তিনি। তাঁর চিত্রকলা নিয়ে ভ্রন্স্কির কথা-বার্তায় গোঁ ধরে চুপ করে থাকতেন তিনি, আর ভ্রন্স্কির ছবিটা তাঁকে দেখান হলে সমান গোঁ ধরে চুপ করে রইলেন। গোলেনিশ্যেভের আলাপ তাঁর কাছে কষ্টকর লাগত কিন্তু তাঁর কথায় আপত্তি করতেন না কখনো।
মোটের ওপর ওঁর যখন মিখাইলোভকে আরও ভালো করে জানতে পারলেন তখন তাঁর চাপা, বিরূপ, যেন-বা শত্রুতামূলকই মনোভাবে ওঁদের সকলেরই ভারি অপছন্দ হয়েছিল তাঁকে। সিটিঙগুলো যখন শেষ হল, হাতে ওঁদের রয়ে গেল অপূর্ব পোর্ট্রেটটা এবং মিখাইলোভ আসা বন্ধ করলেন, খুশি হয়েছিলেন তাঁরা।
গোলেনিশ্যেভই সবার মনের কথাটা বললেন, যথা—ভ্রন্স্কিকে স্রেফ ঈর্ষা করতেন মিখাইলোভ।
‘ধরা যাক ঈর্ষা করতেন না, কেননা প্রতিভা আছে ওঁর, কিন্তু এই জন্য ওঁর রাগ হত যে উঁচু মহলের ধনী একটি লোক, তদুপরি কাউন্ট (সবাই ওরা যে এটা ঘৃণা করে) বিশেষ প্রয়াস ছাড়াই ওঁর চেয়ে এমন কি ভালো হলেও একইরকম আঁকছেন, যে ক্ষেত্রে উনি এর পেছনে দিয়েছেন গোটা জীবন। প্রধান কথা হল শিক্ষা, যেটা ওঁর নেই।’
ভ্রন্স্কি মিখাইলোভের পক্ষ নিলেন, কিন্তু মনের গভীরে বিশ্বাস করতেন কথাটা, কেননা তাঁর ধারণা ছিল যে নিঃস্ব অন্য একটা জগতের লোক ঈর্ষা করবেই।
জীবন থেকে মিখাইলোভ আর ভ্রন্স্কি আন্নার যে একই পোর্ট্রেট এঁকেছেন, তা থেকে তাঁদের ভেতর প্রভেদটা কি সেটা ভ্রন্স্কির চোখে পড়া উচিত ছিল, কিন্তু পড়ল না। মিখাইলোভের পরে তিনি শুধু আন্নার যে পোর্ট্রেটটা আঁকছিলেন তা বন্ধ করলেন, মনে করলেন ওটা এখন নিষ্প্রয়োজন। মধ্যযুগীয় জীবন নিয়ে তাঁর ছবি কিন্তু এঁকে চললেন তিনি এবং তিনি নিজে, গোলেনিশ্যেভ, বিশেষ করে আন্না, সবার কাছেই ছবিটা মনে হল অতি চমৎকার, কেননা নামকরা ছবিগুলির সাথে তাঁর ছবির মিল মিখাইলোভের চেয়ে বেশি।
