‘আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে একটা কথা বলতে পারি…’ গোলেনিশ্যেভ বললেন।
‘ওহ্, অত্যন্ত খুশি হব, বলুন-না’, মিখাইলোভ বললেন কপট হেসে।
‘সে কথাটা এই যে আপনার খ্রিস্ট হয়েছে মনুষ্য-দেব, দেব-মনুষ্য নয়। তবে আমি জানি যে আপনি তাই আঁকতে চেয়েছিলেন।’
‘যে খ্রিস্ট আমার প্রাণের মধ্যে নেই, তাঁকে তো আর আঁকতে পারি না আমি’, বিমর্ষ মুখে বললেন মিখাইলোভ।
‘তা ঠিক, কিন্তু সেক্ষেত্রে, যদি আমার ভাবনাটা আমাকে বলতে দেন… ছবিটা আপনার এত সুন্দর যে আমার মন্তব্যে ওর কোন ক্ষতি হবে না, তা ছাড়া এটা আমার ব্যক্তিগত মত। আপনার মত ভিন্ন। আপনার বক্তব্যটাই অন্যরকম। কিন্তু ধরা যাক শিল্পী ইভানভ। আমি মনে করি খ্রিস্টকে যদি একটা ঐতিহাসিক ব্যক্তিতে পর্যবসিত করা হয়, তাহলে ইভানভের উচিত হত অন্য ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু নেওয়া যা আরও তাজা, আরও চিত্তাকর্ষক।’
‘কিন্তু শিল্পের কাছে এটাই যদি হয় একটা মহত্তম প্রসঙ্গ?’
‘খুঁজলে অন্য প্রসঙ্গও পাওয়া যাবে। কিন্তু আসলে যুক্তি-তর্ক মানে না শিল্প। ইভানভের চিত্রের সামনে আস্তিক বা নাস্তিক দু’য়ের কাছেই প্রশ্ন উঠবে : এটা কি সৃষ্টিকর্তা নাকি নয়? এতে ভেঙে পড়ছে সাধারণ একটা আবেশ।‘
‘কেন? আমার ধারণা’, বললেন মিখাইলোভ, ‘শিক্ষিত লোকের কাছে এ নিয়ে তর্ক থাকতে পারে না।’
গোলেনিশ্যেভ তা মানলেন না, তাঁর প্রথম মত ধরে থেকে আবেশের যে ঐক্য শিল্পের পক্ষে প্রয়োজন, সেটা দিয়ে মিখাইলোভকে ভেঙেছেন।
মিখাইলোভ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু নিজের কথাটা প্রমাণের মত কিছু বলতে পারলেন না।
বারো
বন্ধুর বুদ্ধিমন্ত মুখরতায় বিব্রত হয়ে আন্না আর ভ্রন্স্কি অনেকক্ষণ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলেন, শেষ পর্যন্ত গৃহস্বামীর অপেক্ষা না করে ভ্রন্স্কি গেলেন আরেকটা অনতিবৃহৎ ছবির কাছে।
‘আরে, কি সুন্দর, কি যে সুন্দর! আশ্চর্য! কি সুন্দর!’ সমস্বরে বলে উঠলেন তাঁরা।
‘ওটায় কি ওঁদের অত ভালো লাগল?’ ভাবলেন মিখাইলোভ! তিন বছর আগে আঁকা এই ছবিটার কথা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন। কয়েক মাস ধরে দিনরাত ওটা নিয়ে খাটার সময় যে যন্ত্রণা ভুগেছেন, যে কষ্ট হয়েছিল, ভুলে গিয়েছিলেন তার কথা, যেমন সব সময় তিনি ভুলে যান পরিসমাপ্ত ছবিগুলোকে। এমন কি ওটার দিকে তাকাতেও তাঁর ভালো লাগত না, টাঙিয়ে রেখেছেন শুধু ওটা কিনতে ইচ্ছুক জনৈক ইংরেজের আগমনের আশায়।
বললেন, ওটা এমনি একটা স্কেচ, অনেকদিন আগেকার।’
‘কি সুন্দর!’ স্পষ্টত সত্যি করেই ছবিটার সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে বললেন গোলেনিশ্যেভও।
উইলো গাছের ছায়ায় বসে দুটো ছোট ছেলে মাছ ধরছে। বড় ছেলেটি সবেমাত্র ছিপ ফেলেছে, আপ্রাণ চেষ্টা করছে একটা ঝোপ থেকে তার ফাতনাটাকে বার করার, এই কাজেই সে একেবারে মগ্ন; যেটি ছোট, সে শুয়ে আছে ঘাসের ওপর, এলোমেলো শণরঙা মাথাটা ভর দিয়ে আছে তার হাতে, নীল ভাবাকুল চোখে তাকিয়ে আছে পানির দিকে। কি সে ভাবছে?
ছবিটার প্রশংসায় মিখাইলোভের মনে তাঁর অতীতের দোলা জেগে উঠেছিল, কিন্তু তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, অতীত নিয়ে এই অলস ভাবাবেগ তাঁর ভালো লাগত না, তাই প্রশংসাগুলো তাঁকে আনন্দ দিলেও তিনি দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইলেন তৃতীয় একটি ছবিতে।
কিন্তু ভ্রন্স্কি বললেন ছবিটা বিক্রি হতে পারে কিনা। দর্শকদের আগমনের ভাবনায় আন্দোলিত মিখাইলোভের কাছে এখন টাকাকড়ির ব্যাপারটা খুবই বিছছিরি ঠেকল।
বিমর্ষ কুঞ্চিত মুখে তিনি বলরেন, ‘ওটা টাঙানো হয়েছে বিক্রির জন্যই।’
অতিথিরা চলে গেলে মিখাইলোভ বসলেন পিলাত আর খ্রিস্টের সামনে, যা যা বলা হয়েছিল, এমন কি বলা না হলেও অতিথিরা যা ভেবেছেন তাও আওড়াতে লাগলেন মনে মনে। আর আশ্চর্য : ওঁরা যখন এখানে ছিলেন এবং মনে মনে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তখন তাঁর কাছে যা অত গুরুত্ব ধরেছিল, তা সবই অর্থহীন হয়ে গেল। শিল্পীর আদ্যন্ত দৃষ্টিতে তিনি নিজের ছবিটা দেখতে লাগলেন এবং পরিপূর্ণতা আর সেহেতু নিজের ছবির তাৎপর্যের একটা নিশ্চয়তায় তিনি পৌঁছলেন যা অন্য সব কিছু ভাবনা বর্জন করে যে একান্ত অভিনিবেশেই কেবল তিনি কাজ করতে পারতেন তার জন্য প্রয়োজন ছিল।
পরিপ্রেক্ষিতে দেখানো খ্রিস্টের পা ঠিক তেমনই হয়নি। রঙের পাত্র নিয়ে আঁকতে লালেন তিনি। পা শোধরাতে শোধরাতেই তিনি অনবরত চাইছিলেন গৌণস্থানে রাখা জনের মূর্তির দিকে। দর্শকেরা এটি লক্ষ করেননি, কিন্তু তিনি জানতেন এ মূর্তি পূর্ণতার পরাকাষ্ঠা। পা-টা শেষ করে তিনি জনের মূর্তি নিয়ে লাগবেন ভাবছিলেন, কিন্তু তার পক্ষে বড় বেশি উত্তেজিত বলে নিজেকে বোধ হল তাঁর। যখন তিনি নিরুত্তাপ আর যখন তিনি বড় বেশি ভাবাকুল, সব কিছু বড় বেশি দেখতে পাচ্ছেন, এর কোন অবস্থাতেই তিনি কাজ করতে পারতেন না। শীতলতা থেকে উদ্দীপনার মাঝখানে কেবল একটা ধাপেই কাজ করা সম্ভব হত তাঁর পক্ষে। কিন্তু এখন তিনি বড় বেশি উদ্বেল। ভাবছিলেন ছবিটা ঢেকে ফেলবেন, কিন্তু থেমে গেলেন, আচ্ছাদনের চাদরটা হাতে ধরে পরমানন্দের হাসি নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখতে লাগলেন জনের মূর্তিটা। অবশেষে যেন বিষণ্ন হয়ে চোখ ফেরালেন, চাদরটা টাঙিয়ে ক্লান্ত কিন্তু প্রসন্ন চিত্তে ফিরে গেলেন বাড়ি।
