তাঁর কাছে যে মুখখানা সবচেয়ে প্রিয়, খ্রিস্টের মুখ, ছবির কেন্দ্রবিন্দু, যা আবিষ্কার করে তিনি অত উল্লসিত হয়েছিলেন, সেটা ওঁদের চোখ দিয়ে দেখে তাঁর কাছে মনে হল ওটা একেবারে মূল্যহীন। সুন্দর করে আঁকা চবিটায় (এমন কি সুন্দরও নয়—একরাশ ত্রুটি এখন পরিষ্কার চোখে পড়ছিল তাঁর) তিনি দেখলেন টিশিয়ান, রাফায়েল, রুবেন্সের অসংখ্য খ্রিস্ট আর ওই একই যোদ্ধাদের ও পিলাতের পুনরাবৃত্তি। এ সবই মামুলী, নিঃস্ব, পুরানো, এমন কি আঁকাটাও খারাপ–রঙবেরঙ, দুর্বল। শিল্পীর উপস্থিতিতে কপট কিছু প্রশংসা করে আড়ালে তাঁকে নিয়ে করুণা আর হাসাহাসি করলে ওঁরা ঠিকই করবেন।
এই নীরবতাটা বড় বেশি দুঃসহ হয়ে উঠল তাঁর কাছে (যদিও সেটা মিনিটখানেকের বেশি নয়)। সে নীরবতা ভঙ্গ করা এবং তিনি যে উিেদ্বগ বোধ করছেন না তা দেখাবার জন্য তিনি গোলেনিশ্যেভকে বললেন, ‘মনে হচ্ছে আপনার সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।’ বললেন অস্থির হয়ে কখনো আন্না কখনো ভ্রন্স্কির দিকে তাকাতে তাকাতে যাতে তাঁদের মুখভাবের একটা দিকও দৃষ্টিচ্যুত না হয়।
‘বটেই তো! আমাদের দেখা হয় রসিতে, সেই যে সন্ধ্যায় মনে আছে ওই যে ইতালীয়ান ভদ্রকন্যাটি আবৃত্তি করে—নতুন রাশেল’, ছবি থেকে চোখ ফিরিয়ে এতটুকু আফশোস বোধ না করে শিল্পীর দিকে চাইতে অনায়াসে বলরেন গোলেনিশ্যেভ।
কিন্তু মিখাইলোভ ছবিটা সম্পর্কে মতামতের অপেক্ষা করছেন লক্ষ করে বললেন, ‘আমি শেষ বার ছবিটা যা দেখেছিলাম তার চেয়ে ওটা অনেক ভালো হয়ে উঠেছে এখন। যেমন তখন, তেমনি এখনো আমাকে অসাধারণ অভিভূত করেছে পিলাতের মূর্তি। বেশ বোঝা যায় মানুষটাকে—সদাশয়, চমৎকার লোক, কিন্তু অস্থিমজ্জায় এক আমলা, যে দেখতে পাচ্ছে না কি সে করছে। তবে আমার মনে হয়…’
মিখাইলোভের চঞ্চল মুখখানা হঠাৎ একেবারে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, জ্বলজ্বল করে উঠল চোখ। কিছু-একটা বলতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু ব্যাকুলতাবশে পারলেন না, ভান করলেন যে কাশছেন। গোলেনিশ্যেভের শিল্প বোঝার ক্ষমতাকে আগে তিনি যত তুচ্ছই জ্ঞান করে থাকুন, আমলা হিসেবে পিলাতের মুখভাবের যথার্থও সম্পর্কে সঠিক ওই মন্তব্যটা যত তুচ্ছই হোক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণগুলো সম্পর্কে কিছু না বলে প্রথম ওই ধরনের তুচ্ছ মন্তব্য তাঁর কাছে যত অপমানকর লাগতে পারত তা সত্ত্বেও মিখাইলোভ উল্লসিত হয়ে উঠলেন কথাটায়। পিলাতের মূর্তি সম্পর্কে গোলেনিশ্যেভ যা বলেছেন, তিনিও তাই ভাবতেন। লক্ষ লক্ষ অন্যান্য যে মতও সঠিক হত বলে মিখাইলোভের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এটা তারই একটা হলেও গোলেনিশ্যেভের মন্তব্যের গুরুত্ব হ্রাস পেল না তাঁর কাছে। এ মন্তব্যের জন্য গোলিশ্যেভের ভালো লেগে গেল তাঁর এবং বিষাদ থেকে হঠাৎ উল্লাসে পৌঁছে গেলেন। সমস্ত জীবিতের অনির্বচনীয় জটিলতা নিয়ে গোটা ছবিটা তৎক্ষণাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল তাঁর সামনে। পিলাতকে যে তিনি ওইভাবেই বুঝেছিলেন সেটা আবার বলবার চেষ্টা কররেন মিখাইলোভ; কিন্তু ঠোঁট তাঁর অবাধ্য হয়ে কাঁপতে থাকল, বলতে পারলেন না তিনি। ভ্রন্স্কি আর আন্নাও কি যেন বলাবলি করছিলেন চাপা গলায়, প্রদর্শনীতে যেভাবে লোকে বলে থাকে খানিকটা শিল্পীকে আঘাত না দেবার জন্য আর শিল্প সম্পর্কে বলতে গিয়ে নির্বোধ যে উক্তি করে বসা খুবই সহজ, সেটা উচ্চকণ্ঠে না বলার জন্য খানিকটা। মিখাইলোভের মনে হল ছবিটা ওঁদের ওপরও ছাপ ফেলেছে। কাছে গেলেন তিনি।
‘কি আশ্চর্য খ্রিস্টের মুখভাব!’ আন্না বললেন, যা কিছু তিনি দেখেছিলেন তা সবের মধ্যে এই মুখভাবটাই তাঁর ভালো লেগেছিল এবং টের পাচ্ছিলেন যে এটাই ছবিটার মধ্যবিন্দু হওয়ায় তার প্রশংসা শিল্পীকে খুশি করবে। ‘বেশ দেখা যাচ্ছে যে পিলাতের জন্য করুণা হচ্ছে তাঁর।’
তাঁর ছবি এবং খ্রিস্টের মূর্তি সম্পর্কে লক্ষ লক্ষ সঠিক যেসব মন্তব্য হতে পারত, এটাও তারই একটা। আন্না বলেছেন যে পিলাতের জন্য খ্রিস্টের করুণা হচ্ছে। খ্রিস্টের মুখে করুণার ভাবও থাকার কথা বৈকি, কেননা তাঁর মধ্যে রয়েছে প্রেম, অপার্থিব প্রশান্তি, মৃত্যু বরণের আর বাক্যব্যয়ের নিষ্ফলতা সম্পর্কে চেতনার ভাব। বলাই বাহুল্য, পিলাতের মধ্যে আমলা আর খ্রিস্টের মধ্যে করুণা তো থাকবেই, কেননা একজন রক্তমাংসের জীবন অন্যজন আত্মিক জীবনের প্রতিমূর্তি। এসব এবং আরও অনেক কিছু চিন্তা ঝলক দিয়ে গেল মিখাইলোভের মনে এবং আবার তিনি উল্লসিত বোধ করলেন।
‘আর কিভাবে আঁকা হয়েছে মূর্তিটা, কত হাওয়া। প্রদক্ষিণ করা যায়’, গোলেনিশ্যেভ বললেন, স্পষ্টতই এতে করে তিনি দেখাতে চাইছিলেন যে মূর্তিটার বিষয়বস্তু ও সারার্থে তাঁর অনুমোদন নেই।
‘হ্যাঁ, আশ্চর্য ওস্তাদি!’ বললেন ভ্রন্স্কি, ‘পেছনদিককার এই লোকগুলোকে কিভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে! একেই বলে টেকনিক!’ কথাটা বললেন তিনি গোলেনিশ্যেভের উদ্দেশে, এই টেকনিক আয়ত্ত করতে ভ্রন্স্কি নিজের হতাশা জানিয়ে ওঁর সাথে যেসব কথাবার্তা বলেছিলেন তার ইঙ্গিত করে।
‘সত্যি আশ্চর্য!’ পুনরাবৃত্তি করলেন গোলেনিশ্যেভ আর আন্না। মিখাইলোভ তখন একটা তুরীয় অবস্থায় থাকলেও টেকনিক নিয়ে মন্তব্যটা তাঁকে বড় মর্মাহত করল, ভ্রন্স্কির দিকে একটা ক্রদ্ধ দৃষ্টিপাত করে হঠাৎ চুপসে গেলেন। এই টেকনিক কথাটা প্রায়ই শুনেছেন তিনি, কিন্তু তাতে কি বোঝায় সেটা একেবারেই বোধগম্য হত না তাঁর। তিনি জানতেন যে কথাটায় ছবির মর্মবস্তুর মোটেই অপেক্ষা না করে তা আঁকতে পারার যান্ত্রিক নৈপুণ্য বোঝাচ্ছে। বর্তমান এই প্রশংসাটার মত প্রায়ই তিনি লক্ষ করেছেন যে টেকনিককে রাখা হয় ভেতরকার পরাকাষ্ঠার বিপরীতে, যেন যে জিনিসটা ভালো নয় তাকেও আঁকা যায় ভালো করে। তিনি জানতেন যে আসল সৃষ্টিটার ক্ষতি না করে তার আবরণগুলো মোচনে, সমস্ত আবরণ মোচনে অনেক মনোযোগ ও সতর্কতা প্রয়োজন; কিন্তু সেটা শিল্পরচনা নয়, টেকনিকও নয়। তিনি যা দেখছেন তা যদি দেখা দেয় কোন একজন শিশু বা তাঁর রাঁধুনির কাছে, তাহলে তারাও তিনি যা দেখেছেন তার খোসা ছাড়িয়ে দেবে। অথচ অতি অভিজ্ঞ ও নিপুণ চিত্রকর-টেকনিশিয়ান শুধুই যান্ত্রিক দক্ষতায় কিছুই আঁকতে পারবেন না যদি আগে মর্ম বস্তুর রূপরেখা তিনি আবিষ্কার করতে না পারেন। তা ছাড়া তিনি দেখেছেন যে টেকনিকের কথাই যদি ওঠে, তাহলে তার জন্য তাঁকে বাহবা দেবার কিছু নেই। যা কিছু তিনি এঁকেছেন আর আঁকছেন তার সবেতেই তিনি চোখ-জ্বালানো এমন ত্রুটি দেখছেন যা ঘটেছে আবরণ মোচনের অসতর্কতা থেকে, কিন্তু গোটা সৃষ্টিকর্মটাকে নষ্ট না করে তখন তা আর শোধরানো যায় না। আর পায় প্রতিটি মূর্তি আর মুখাবয়বে তিনি দেখতে পেতেন পুরোপুরি মোচন না করা আবরণের অবশেষ যা মাটি করে দিচ্ছে ছবিটাকে
