দ্রুত পায়ে তিনি গেলেন তাঁর স্টুডিওর দরজার কাছে এবং নিজের উত্তেজনা সত্ত্বেও তিনি অভিভূত হলেন মৃদু আভাটায় আন্নার মূর্তিতে। আন্না দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রবেশমুখের ছায়ায় এবং গোলেনিশ্যেভ উত্তপ্ত কণ্ঠ তাঁকে যা বোঝাচ্ছিলেন তা শুনছিলেন, তবে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল যে আগতপ্রায় শিল্পীকে দেখতে তিনি উৎসুক। শিল্পী খেয়াল করেননি যে আন্না যে ছাপটা ফেলেছিলেন সেটা তিনি লুফে নিয়েছেন আর গলাধঃকরণ করেছেন যেমন করেছিলেন চুরুট বিক্রেতার থুতনির বেলায়, কোথায় যেন তা লুকিয়ে ফেলেছেন, সেখান থেকে তা বার করে নেবেন দরকার পড়লে। গোলেনিশ্যেভের কথায় দর্শকদের মোহ আগেই কেটে গিয়েছিল, এখন আরও বেশি কাটল শিল্পীর চেহারা দেখে। বাদামি টুপি, জলপাই-রঙা ওভারকোট আর আঁটো প্যান্টালুন পরা (যেখানে অনেক দিন থেকেই ঢিলা ট্রাউজারের চল হয়েছে), মাঝারি লম্বা, গাঁট্টা-গোট্টা মিখাইলোভ তাঁর ছটফটে চলনে, বিশেষ করে তাঁর চওড়া মুখের মামুলিয়ানায়, ভীরুতার একটা ভাবের সাথে সাথে নিজের মর্যাদা জাহির করার বাসনায় যে ছাপটা ফেললেন সেটা উপাদেয় নয়।
‘আসুন দয়া করে’, একটা নির্বিকার ভাব ফোটাবার চেষ্টা করে বললেন তিনি, প্রবেশমুখে গিয়ে পকেট থেকে চাবি বার করে দরজা খুললেন।
এগারো
স্টুডিওয় ঢুকে শিল্পী মিখাইলোভ আরও একবার অতিথিদের দিকে চাইলেন এবং ভ্রন্স্কির মুখভাব, বিশেষ করে তাঁর গণ্ডাস্থির ছবিটা ধরে রাখলেন কল্পনায়। তাঁর শিল্পীসুলভ অনুভব মালমশলা সংগ্রহ করে অবিরাম কাজ করে যেতে থাকলেও এবং তাঁর কাজের ওপর মতামত দেবার মুহূর্তটা কাছিয়ে আসার দরুন ক্রমাগত বেশি করে অস্থিরতা বোধ করলেও অলক্ষ্য সব লক্ষণ থেকে এই তিন ব্যক্তি সম্পর্কে দ্রুত ও সূক্ষ্ম একটা ধারণা করে নিলেন। ওটি (গোলেনিশ্যেভ) হলেন স্তানীয় রুশী। ওঁর উপাধি কি, কোথায় ওঁর সাথে দেখা হয়, কি কথাবার্তা তাঁরা কয়েছিলেন মিখাইলোভের মনে ছিল না। শুধু তাঁর মুখটা মনে ছিল, কাউকে কখনো দেখলে তার মুখ যেমন মনে থেকে যায় তাঁর। এও তাঁর মনে ছিল, মিত্যে গুরুত্বধারী কিন্তু অভিব্যক্তিতে দীন যে মুখগুলোকে তিনি তাঁর বিশাল প্রকোষ্ঠে সরিয়ে রাখতেন, এটা তাদেরই একটা। বড় বড় চুল আর অতি উন্মুক্ত কপালে বাহ্যিক একটা গুরুত্ব এসেছে মুখে, যেখানে ছেলেমানুষের মত ছোট্ট একটা অস্থিরতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে সংকীর্ণ নাসাদণ্ডে। মিখাইলোভের অনুমান অনুসারে অঙ্কি আর কারেনিনা বড় ঘরের ধনী রুশী হওয়ার কথা, সমস্ত ধনী রুশীর মত যারা শিল্পের কিছুই বোঝেন না, কিন্তু ভাব করেন যেন শিল্পানুরাগী ও সমঝদার। মনে মনে ভাবলেন, ‘নিশ্চয়ই প্রাচীন দ্রষ্টব্যগুলো সব দেখা হয়ে গেছে, এখন ঘুরে ফিরছেন নতুনদের স্টুডিওতে—বুজরুক জার্মান আর নির্বোধ প্রাক্-রাফায়েলী ইংরেজটার স্টুডিও ঘুরে আমার কাছে এসেছে কেবল পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ করার জন্য।’ পল্লবগ্রাহীদের (যতই তারা মেধাবী হয় ততই খারাপ) হালচাল তাঁর বেশ ভালোই জানা আছে, এরা আধুনিক শিল্পীদের স্টুডিও দেখতে যায় কেবল এই কথা বলার অধিকার অর্জনের জন্য যে শিল্পর অধঃপতন ঘটেছে, নতুনদের যত বেশি দেখা যায় ততই বোঝা যায় কি অননুকরণীয় রয়ে গেছেন অর্থীতের মহান শিল্পাচার্যরা। এই রকমটাই তিনি আশা করছিলেন, এ সবই দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁদের মুখে আঁকা, যে নিস্পৃহ অবহেলায় তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন, দেখছিলেন ডামি আর আবক্ষ মূর্তিগুলোকে, শিল্পী কখন চিত্রের আবরণ উন্মোচন করবেন তার প্রতীক্ষায় অবাধে পায়চারি করছিলেন, দেখতে পাচ্ছিলেন তা থেকে। তা সত্ত্বেও যখন তিনি তাঁর স্কেচগুলো বিছচ্ছিলেন, জানালার খড়খড়ি, ক্যানভাস-ঢাকা কাপড়টা খুলে নিলেন, তখন বড় ঘরের সমস্ত ধনী রুশীদের যে মূর্খ ও গর্দভ হওয়ার কথা, তাঁর এই অভিমত সত্ত্বেও তিনি প্রচণ্ড একটা অস্থিরতা বোধ না করে পারলেন না, বিশেষ করে এই জন্য যে ভ্রন্স্কি এবং আরো বেশি আন্নাকে তাঁর ভালো লেগেছিল।
ছটফটে চলনে দূরে সরে গিয়ে ছবিটা দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘আজ্ঞা হোক। এটা পিলাতের ধিক্কার। মথি লিখিত সুসমাচার, ২৭ অধ্যায়।’ টের পাচ্ছিলেন উত্তেজনায় ঠোঁট তাঁর কাঁপতে শুরু করেছে। সরে গিয়ে তিনি দাঁড়ালেন ওঁদের পেছনে।
দর্শনার্থীরা যে কয়েক সেকেন্ড ছবিটা দেখছিলেন নীরবে, মিখাইলোভও তা দেখলেন এবং দেখলেন বাইরের লোকের উদাসীন দৃষ্টিতে। এই কয়েক সেকেন্ড ধরে তাঁর বিশ্বাস হচ্ছিল যে সর্বোচ্চ ন্যায্য রায় দেবেন এঁরা, ঠিক এই লোকগুলিই, এক মিনিট আগে যাঁদের তিনি ঘৃণা করেছিলেন। নিজের ছবি সম্পর্কে আগে, যে তিন বছর ছবিটা তিনি এঁকেছিলেন তখন কি ভেবেছিলেন তা সব ভুলে গেলেন তিনি; তার যে কৃতিত্ব তাঁর কাছে ছিল সন্দেহাতীত, তা ভুলে গেলেন—ছবিটা তিনি দেখলেন বাইরের লোকের নির্বিকার নতুন একটা দৃষ্টিতে এবং ভালো কিছু পেলেন না তাতে। তাঁর সামনে মুখ্য স্থানে পিলাতের বিরক্ত আর খ্রিস্টের শান্ত মুখ, পিছনে পিলাতের অনুচরদের মূর্তি আর জনের মুখ, কি ঘটছে তা দেখছে সে। প্রতিটি মুখ যা এত অন্বেষণ, ভুলচুক, সংশোধনের ভেতর দিয়ে তাঁর মানসপটে বেড়ে উঠেছিল তাদের বিশিষ্ট চরিত্র নিয়ে, প্রতিটি মুখ যা তাঁকে অত কষ্ট আর আনন্দ দিয়েছে, একটা সাধারণ রূপ ফোটাবার জন্য কতবার জায়গা অদল-বদল করা এসব মুখ, অত কষ্টে অর্জিত বর্ণবিন্যাস ও বর্ণভঙ্গির সমস্ত মাত্রা— ওঁদের চোখ দিয়ে দেখে এখন এ সবই মনে হল মামুলী, হাজার বার যা পুনরাবৃত্ত হয়ে গেছে।
