‘শুনুন এক কাজ করা যাক’, অনেকক্ষণ ধরে ভ্রন্স্কির সাথে চুপিসারে মুখ চাওয়া-চাওনি করার পর এটা জেনেই যে শিল্পীটির শিক্ষাদীক্ষায় ভ্রন্স্কির কোন আগ্রহ নেই, তিনি চাইছেন শুধু তাঁকে সাহায্য করতে আর পোর্ট্রেটের ফরমাশ দিতে, আন্না বললেন। ‘শুনুন’, কথায় পেয়ে বসা গোলেনিশ্যেভকে দৃঢ়ভাবে থামিয়ে দিলেন তিনি, ‘চলুন যাই ওঁর কাছে!’
সচেতন হয়ে উঠে গোলেনিশ্যেভ রাজি হলেন সাগ্রহেই। তবে শিল্পী দূরের পাড়ায় থাকতেন বলে ঠিক হল একটা গাড়ি নিতে হবে।
এক ঘণ্টা বাদে গোলেনিশ্যেভের পাশে বসা আন্না আর সামনের সীটে বসা ভ্রন্স্কিকে নিয়ে গাড়ি এসে থামল দূরের পাড়ায় সুন্দর একটি নতুন বাড়ির সামনে। জমাদারের বৌ তাঁদের কাছে আসতে জানা গেল মিখাইলোভ তাঁর স্টুডিওতে লোকদের আসতে দেন, কিন্তু এখন তিনি দু’পা দূরে তাঁর বাসায়। তাই নিজেদের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে মেয়েটাকে তাঁর কাছে পাঠানো হল এই অনুরোধ জানিয়ে যে তাঁর ছবি দেখতে তিনি যেন অনুমতি দেন।
আন্না কারেনিনা – ৫.১০
দশ
কাউন্ট ভ্রন্স্কি আর গোলেনিশ্যেভের কার্ড যখন নিয়ে আসা হয় বরাবরের মত শিল্পী শিখাইলোভ তখন কাজে বসেছিলেন। বড় একটা ছবি নিয়ে সকালে তিনি কাজ করেছিলেন স্টুডিওতে। বাড়ি এসে তিনি স্ত্রীর ওপর চটে ওঠেন কারণ বাড়িউলী টাকা চাইতে এসেছিল কিন্তু স্ত্রী তাঁকে এড়িয়ে যেতে পারেননি।
‘বিশ বার তোমাকে বলেছি যে কৈফিয়ৎ দিতে যাবে না কখনো। এমনিতেই তুমি হাঁদা, আর ইতালিয়ান ভাষায় বোঝাতে শুরু করলে হাঁদা হয়ে পড়ো তিনগুণ’, দীর্ঘ কলহের পর স্ত্রীকে বলেছিলেন মিখাইলোভ।
‘ভাড়া ফেলে রেখো না তাহলে, দোষ তো আমার নয়। আমার টাকা থাকলে…’
‘দোহাই, শান্তিতে থাকতে দাও আমাকে!’ অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে মিখাইলোভ চেঁচিয়ে উঠেছিলেন এবং কানে আঙুল দিয়ে পার্টিশনের ওপাশে তাঁর কাজের ঘরে চলে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। মনে মনে বলেন, ‘নির্বোধ!’ তারপর টেবিলের সামনে বসে ফাইল খুলে শুরু করা কাজটার পেছনে লাগেন রোখের মাথায়।
অবস্থা যখন খারাপ এবং বিশেষ করে যখন ঝগড়া হয় স্ত্রীর সাথে, তখন ছাড়া এত রোখ আর সার্থকতায় তিনি কাজ করেননি কখনো। কাজ চালাতে চালাতে তিনি ভাবলেন, ‘আহ্! কোথাও উধাও হয়ে যেতে পারলে বাঁচতাম! ‘ রোষকশায়িত একটি মানুষের মূর্তি আঁকছিলেন তিনি। আঁকাটা আগেই হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সন্তুষ্ট হতে তিনি পারছিলেন না। ‘না, ওটা ছিল বরং ভালো…কোথায় সেটা?’ চোখ-মুখ কুঁচকে তিনি গেলেন স্ত্রীর কাছে কিন্তু তাঁর দিকে না তাকিয়ে বড় মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন যে কাগজটা তিনি তাদের দিয়েছিলেন, সেটা কোথায়। স্কেচ আঁকা পরিত্যক্ত কাগজটা পাওয়া গেল, কিন্তু ময়লা, তাতে স্টিয়ারিনের দাগ লেগে আছে। তাহলেও নিলেন ছবিটা, নিজের ঘরে গিয়ে টেবিলের ওপর সেটা রেখে খানিক পিছিয়ে এসে চোখ কুঁচকে দেখতে থাকলেন। হঠাৎ হেসে উঠে হাত দোলালেন তিনি।
‘বটে, বটে!’ এই বলে তখনই দ্রুত আঁকতে লেগে গেলেন পেনসিল নিয়ে। স্টিয়ারিনের দাগটায় মানুষটার একটা নতুন ভঙ্গি ফুটেছিল।
এই নতুন ভঙ্গিটা আঁকতে আঁকতে হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল প্রকাণ্ড থুতনি-ওয়ালা দোকানদারের সতেজ মুখখানার কথা, যার কাছ থেকে তিনি চুরুট কিনেছিলেন। সেই মুখ, সেই তুখনি তিনি আঁকলেন মনুষ্যমূর্তিটায়। আনন্দে হাসলেন তিনি। নিষ্প্রাণ কল্পনা থেকে মূর্তিটা হঠাৎ হয়ে উঠল জীবন্ত এবং এমন যে তা আর বদলানো যায় না। সে মূর্তি সজীব, সুস্পষ্ট এবং নিঃসন্দেহে সুনির্দিষ্ট। এ মূর্তির দাবির সাথে মিল রেখে তাতে কিছু অদলবদল করা চলে, পা দুটো রাখা যায় এবং উচিত অন্যভাবে, একেবারে বদলে দিতে হবে বাঁ হাতের অবস্থান, চুল পেছনে ঠেলে দিতে হবে। কিন্তু এই সংশোধনগুলো করতে গিয়ে তিনি বদলাচ্ছিলেন না মূর্তিটাকে, শুধু মূর্তিটা যাতে ঢাকা পড়ছিল সেগুলো ফেলে দিচ্ছিলেন। যেন মূর্তিটার পুরোটা যাতে দেখা যাচ্ছিল না, সে আবরণ খুলে ফেলছিলেন তিনি; স্টিয়ারিনের দাগ পড়ায় হঠাৎ যে বলিষ্ঠতায় মূর্তিটা দেখা দিয়েছিল প্রতিটি নতুন আঁচড়ে তা পুরো ফুটে উঠছিল। যখন তিনি ছবিটা সযত্নে শেষ করছেন, কার্ড দুটো আনা হল তাঁর কাছে।
‘এখনই, এখনই আসছি!’
স্ত্রীর কাছে গেলেন তিনি।
‘নাও হয়েছে, রাগ করো না’ সাশা’, তিনি বললেন ভীরু ভীরু গলায়, নরম হেসে, ‘তোমারও দোষ। আমারও দোষ। আমি সব ঠিকঠাক করে নেব’, এবং স্ত্রীর সাথে মিটমাট করে নিয়ে মখমলের কলার দেওয়া জলপাই রঙের ওভারকোট আর টুপিটা পরে তিনি গেলেন স্টুডিওতে। উৎরে যাওয়া মূর্তিটার কথা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। হোমরা- চোমরা এই রুশীরা যে গাড়ি করে তাঁর স্টুডিওতে এসেছেন, তাতে তিনি আনন্দ আর উত্তেজনা বোধ করছিলেন।
নিজের যে ছবিটা এখন তাঁর ইজেলে, সেটা সম্পর্কে তাঁর মনের গভীরে ছিল একটা ধারণাই—এমন ছবি কেউ কখনো আঁকেনি। এ কথা তিনি ভাবতেন না যে ছবিটা রাফায়েলের সমস্ত ছবির চেয়ে সেরা, কিন্তু তিনি জানতেন যে ছবিটায় তিনি যা দেখাতে চেয়েছিলেন এবং দেখিয়েছেন, তা কেউ দেখায়নি কখনো। এটা তাঁর সুনিশ্চিত জানা ছিল এবং জানা আছে অনেকদিন ধরেই, ছবিটা আঁকতে শুরু করার সময় থেকে; তাহলেও লোকের মতামত, সেগুলো যাই হোক, তাঁর কাছে ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং আমূল আলোড়িত করে তুলত তাঁকে। সব কিছু মন্তব্য, এমন কি যা নেহাৎ অকিঞ্চিৎকর, যাতে বোঝা যেত যে ছবিটায় তিনি যা দেখেছেন, বিচারক দেখছে তার মাত্র সামান্য একটু অংশই, তাও আমূল আলোড়িত করত তাঁকে। তাঁর নিজের যে বোধ ছিল, তার চেয়ে সব সময়ই বেশি প্রগাঢ় একটা বোধ তাঁর বিচারকদের আছে বলে তিনি ধরে নিতেন এবং সব সময় তাদের কাছে থেকে এমন একটা কিছু আশা করতেন যা তিনি নিজে দেখতে পাননি তাঁর চিত্রে। আর দর্শকদের মন্তব্যে সেটা তিনি পেলেন বলে তাঁর মনে হত প্রায়ই।
