অন্যান্য ধারার মধ্যে তাঁর ভালো লেগেছিল ফরাসি ধারা, যা লাবণ্যময় ও চমকপ্রদ, আর সেই ধারায় তিনি আন্নার প্রতিকৃতি আঁকলেন ইতালীয় পোশাকে। ছবিটা তাঁর কাছে, আর যারা সেটা দেখেছিল তাদের কাছে মনে হয়েছিল অতি সাৰ্থক।
নয়
পুরানো অবেহিলত পালাৎসোটার উঁচু সিলিং ঢালাই করা, দেয়ালে ফ্রেস্কো, মোজেয়িক করা মেঝে, লম্বা লম্বা জানালায় হলদে রঙের ভারী ভারী পর্দা, কুলুঙ্গিতে আর ফায়ার-প্লেসের ওপর ফুলদানি, ক্ষোদাই কাঠের দরজা,
ছবি টাঙ্গানো বিষণ্ণ হলঘর—ওঁরা এখানে উঠে আসার পর এই পালাৎসো তার বাহ্যিক চেহারাতেই ভ্রন্স্কির মনে মনোরম এই একটা বিভ্রম জাগাল যে তিনি রুশী জমিদার ও অবসর নেওয়া ঘোড়সওয়ার অফিসার একটা নন, বরং শিল্পের সুধী অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক, নিজেও একটু আধটু এঁকে থাকেন, প্রিয়তমা নারীর জন্য যিনি ত্যাগ করেছেন সমাজ, যোগাযোগ, উচ্চাভিলাষ।
পালাৎসোতে এসে ভ্রন্স্কি যে ভূমিকাটা বেছে নিয়েছিলেন সেটা খুবই উৎরে গিয়েছিল, গোলেনিশ্যেভ মারফত চিত্তাকর্ষক কয়েকটি লোকের সাথে আলাপ করে প্রথম দিকটা বেশ স্বচ্ছন্দ ছিলেন। জনৈক ইতালীয় প্রফেসরের পরিচালনায় তিনি প্রকৃতির স্থিরচিত্র আঁকতেন এবং চর্চা করতেন মধ্যযুগীয় ইতালীয় চিত্রকলা নিয়ে। মধ্যযুগীয় ইতালীয় চিত্রকলা ভ্রন্স্কিকে ইদানীং এতই মুগ্ধ করেছিল যে মধ্যযুগের কায়দায় টুপি পরতে আর কাঁধের ওপর কম্বল চাপাতে শুরু করেছেন, সেটা তাঁকে খুবই মানাতো।
গোলেনিশ্যেভ একদিন সকালে তাঁর কাছে এলে ভ্রন্স্কি তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমরা দিন কাটিয়ে যাচ্ছি কিন্তু কিছুই জানি না। মিখাইলোভের ছবি দেখেছিস তুই?’ সত্য আসা রুশী পত্রিকাটা এগিয়ে দিয়ে এই শহরেই যে রুশী শিল্পী বাস করেন, যাঁর ছবি নিয়ে অনেকদিন জনশ্রুতি ছড়াচ্ছিল, আগে থেকেই কিনে নেওয়া সে ছবিটা তিনি শেষ করেছেন—তাঁকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটা দেখালেন। অসাধারণ এক শিল্পীকে উৎসাহ ও সাহায্য দেওয়া হয়নি বলে প্রবন্ধে ভর্ৎসনা করা হয়েছে সরকার ও শিল্প অকাদমিকে।
‘দেখেছি’, গোলেনিশ্যেভ বললেন, ‘বলা বাহুল্য তাঁর গুণ নেই এমন নয়, তবে একেবারে বাজে একটা ধারা অনুসরণ করছেন। খ্রিস্ট ও ধর্মীয় চিত্রকলা সম্পর্কে সেই একই ইভানোভ-স্ট্রাউস্-রেনান্ মার্কা দৃষ্টিভঙ্গি।
‘কি দেখানো হয়েছে ছবিতে?’ জিজ্ঞেস করলেন আন্না।
‘পিলাতের সামনে খ্রিস্ট। নব্য ধারার সমস্ত বাস্তবতা দিয়ে খ্রিস্টকে আঁকা হয়েছে ইহুদি করে।’
আর ছবির বিষয়বস্তুটা গোলেনিশ্যেভের অন্যতম একটা প্রিয় প্রসঙ্গ হওয়ায় তিনি বলতে শুরু করলেন : ‘এমন উৎকট ভুল ওঁরা কেমন করে করতে পারেন আমি ভেবে পাই না। মহান প্রাচীনদের শিল্পে একটা সুনির্দিষ্ট রূপ আছে খ্রিস্টের। ওঁরা যদি সৃষ্টিকর্তা নয়, বিপ্লবী কি প্রাজ্ঞকে আঁকতে চান, তাহলে ইতিহাস থেকে নিন-না সক্রেটিস কি ফ্র্যাঙ্কলিন, কিংবা শারলত্ কর্দেকে, কিন্তু খ্রিস্টকে নয়। ওঁরা এমন ব্যক্তিকে নিচ্ছেন যাকে শিল্পের জন্য নেওয়া চলে না আর তারপর…’
‘আচ্ছা, সত্য নাকি, এই মিখাইলোভ খুব দুরবস্থায় আছেন?’ ভ্রন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন এই ভেবে যে ছবি ভালো হোক, মন্দ হোক রুশী পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাঁর উচিত শিল্পীকে সাহায্য করা।
‘তেমন বড় একটা মনে হয় না। উনি প্রতিকৃতি আঁকেন চমৎকার। ওঁর আঁকা ভাসিল্চিকভার প্রতিকৃতিটা দেখেছিস? তবে মনে হয় উনি যেন আর পোর্ট্রেট আঁকতে চাইছেন না। সেক্ষেত্রে অভাবেই পড়েছেন হয়ত। আমি বলছিলাম যে…’
‘আন্না আর্কাদিয়েভনার একটা পোর্ট্রেট আঁকতে ওঁকে বলা যায় না কি?’ ভ্ৰন্স্কি বললেন।
আন্না বললেন, ‘আমার আবার কেন? তোমার ছবিটার পর আমি আর কারো পোর্ট্রেট চাই না। বরং আনিকে আঁকুন’ (নিজের মেয়েটাকে তিনি এই নামে ডাকতেন) ‘ওই তো সে’, যোগ দিলেন আন্না। সুন্দরী ইতালিয়ান স্তন্যদাত্রী বাগানে নিয়ে এসেছিল মেয়েটাকে। জানালা দিয়ে তার দিকে তাকিয়েই আন্না তখনই অলক্ষ্যে চাইলেন ভ্রন্স্কির দিকে। সুন্দরী স্তন্যদাত্রীর মুখ ছবিতে এঁকেছিলেন ভ্রন্স্কি। আন্নার জীবনে ওই মেয়েটাই তাঁর একমাত্র গোপন দুঃখ। ভ্রন্স্কি তার ছবি আঁকতে গিয়ে তার সৌন্দর্য আর মধ্যযুগীয়তায় মুগ্ধ হতেন, আর আন্না যে স্তন্যদাত্রীটিকে ঈর্ষা করতে ভয় পাচ্ছেন সেটা নিজের কাছেও স্বীকার করার সাহস হত না এবং সেই কারণেই তাকে আর তার ছোট ছেলেটির ওপর বিশেষ করে আদর ও স্নেহ বর্ষণ করতেন।
ভ্রন্স্কিও জানালায় আর আন্নার চোখের দিকে তাকালেন, তারপর তখনই গোলেনিশ্যেভের দিকে ফিলে বললেন, ‘কিন্তু তুই এই মিখাইলোভকে চিনিস?’
‘দেখা হয়েছিল। পাগলাটে আর একেবারে অশিক্ষিত। মানে ওই যেসব বুনো নয়া লোকদের আজকাল সচরাচর দেখা যায় তাদেরই একজন; মানে ওই যেসব স্বাধীনচিন্তাকরা নিমিষে নাস্তিকতা নেতি আর বস্তুবাদের শিক্ষা পেয়ে থাকে।’ আন্না আর ভ্রন্স্কি দুজনেই যে কথা বলতে চাইছেন সেটা লক্ষ না করে অথবা লক্ষ করতে না চেয়ে গোলেনিশ্যেভ বলে গেলেন, ‘আগে স্বাধীনচিন্তকরা হতেন এমন ব্যক্তি যাঁরা ধর্ম, আইন, নৈতিকতার শিক্ষায় বেড়ে উঠতেন, তারপর নিজে সংগ্রাম আর কষ্ট করে পৌঁছতেন স্বাধীন চিন্তায়। কিন্তু এখন একধরনের আঁকাড়া স্বাধীনচিন্তকের আবির্ভাব ঘটছে যারা বেড়ে উঠছে এমন কি এ কথাটা পর্যন্ত না জেনেই যে আইন, নৈতিকতা, ধর্ম বলে কিছু-একটা ছিল, আছে প্রামাণ্য ব্যক্তি, এরা সব কিছু উড়িয়ে দেবার মনোবৃত্তিতে লালিত অর্থাৎ বুনো। উনিও তেমনি। যতদূর ধারণা উনি মস্কোর এক আর্দালির ছেলে, কোন শিক্ষা পাননি। শিল্প একাডেমিতে ঢুকে যখন নাম করেন, নেহাৎ নির্বোধ নন বলে শিক্ষালাভ করতে চেয়েছিলেন। এবং তাঁর কাছে যা মনে হয়েছিল শিক্ষার উৎস, অর্থাৎ পত্রপত্রিকা, তাকেই অবলম্বন করেন। আগের কালে লোকে, ধরা যাক, একজন ফরাসি শিক্ষালাভ করতে চাইলে কি করত, সমস্ত চিরায়ত লেখকদের রচনা অধ্যয়ন করত : অধ্যাত্মবাদী, ট্রাজেডি-কার, ঐতিহাসিক, দার্শনিকদের লেখা, মানে মনীষার সব কিছু যা তার প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের এখানে লোকে সোজাসুজি গিয়ে পড়ে নেতিবাচক সাহিত্যে, দ্রুত আয়ত্ত করে নেতি বিদ্যার সমগ্র সারার্থ—ব্যস, হয়ে গেল! শুধু তাই নয়, বিশ বছর আগে সে এ সাহিত্যে পেতে পারত প্রামাণিকের বিরুদ্ধে, চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সংগ্রামের লক্ষণ, এ সংগ্রাম থেকে সে বুঝতে পারত যে অন্য কিছু-একটাও ছিল; কিন্তু এখন সে সোজা গিয়ে পড়ে পারত যে অন্য কিছু-একটাও ছিল; কিন্তু এখন সে সোজা গিয়ে পড়ে এমন একটা ভাবনায় যা পুরানো দৃষ্টিভঙ্গির সাথে লড়তে গা পর্যন্ত করে না, স্রেফ বলে দেয় : কিছুই নেই, আছে বিবর্তন, স্বাভাবিক নির্বাচন, অস্তিত্বের সংগ্রাম—ব্যস, হয়ে গেল। আমার প্রবন্ধে আমি…’
