আরোগ্য লাভের ফলে জীবনের বর্ধিত চাহিদা ছিল এত প্রবল এবং পরিস্থিতি ছিল এত নতুন আর ভালো যে আন্না অনুভব করতেন তিনি অমার্জনীয় রকমের সুখী। ভ্রন্স্কিকে তিনি যত বেশি করে জানছিলেন, ততই বেশি ভালোবাসছিলেন তাঁকে। ভালোবাসছিলেন তাঁর নিজের জন্যও এবং আন্নার প্রতি তাঁর ভালোবাসার জন্যও। তাঁর ওপর আন্নার পরিপূর্ণ আধিপত্য ছিল তাঁর কাছে নিয়ত একটা আনন্দ। ভ্রন্স্কির সান্নিধ্য সব সময়ই ছিল মনোরম। ভ্রন্স্কির স্বভাবের যতগুলো দিক তিনি ক্রমেই বেশি করে জানছিলেন ততই তা হয়ে উঠছিল তাঁর কাছে অনির্বচনীয় মধুর। বেসামরিক পোশাকে তাঁর বাইরের যে চেহারা বদলে গিয়েছিল, সেটা আন্নার কাছে তেমনি আকর্ষণীয় হয়ে উঠল যা হয়ে থাকে তরুণী প্রেমিকার ক্ষেত্রে। ভ্রন্স্কি যা-কিছু বলতেন, ভাবতেন, করতেন—সবেতেই আন্না দেখতে পেতেন উন্নত, মহনীয় কিছু-একটা। ভ্রন্স্কিকে নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাসে নিজেই তিনি ভয় পেয়ে যেতেন প্রায়ই : আন্না খুঁজেছেন কিন্তু অসুন্দর কিছু পাননি তাঁর মধ্যে। ওঁর কাছে নিজের নগণ্যতা প্রকাশ করার সাহস হত না তাঁর। তাঁর মনে হয়েছিল ভ্রন্স্কি এটা জেনে ফেললে শিগগিরই আর ভালোবাসবেন না তাঁকে; আর এখন তাঁর ভালোবাসা হারাবার ভয়টা ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়, যদিও তার কোন কারণ ছিল না। কিন্তু তাঁর প্রতি ভ্রন্স্কির মনোভাবে কৃতজ্ঞতা বোধ না করে আর সেটাকে তিনি কতটা কদর করছেন তা প্রকাশ না করে তিনি পারেননি। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকলাপে ভ্রন্স্কির একটা যোগ্যতা ছিল এবং তাতে বিশিষ্ট একটা ভূমিকা তিনি নিতে পারতেন, কিন্তু আন্নার জন্য নিজের উচ্চাশা তিনি বিসর্জন দিয়েছেন আর সে জন্য সামান্যতম খেদ করেননি কখনো। আগের চেয়েও ভ্রন্স্কি এখন আন্নার প্রতি অনুরাগী ও ভক্ত, আর আন্না যাতে তাঁর অবস্থার অস্বস্তিকরতা কখনো না অনুভব করেন, অনুক্ষণ এই উদ্বেগ বোধ করতেন ভ্রন্স্কি। অমন পুরুষালী একটা মানুষ, অথচ আন্নার সাথে সম্পর্কে কদাচ তাঁর বিরুদ্ধতা তো করেনইনি, বরং নিজের ইচ্ছাশক্তিই তাঁর থাকত না, মনে হত না করে পারেনি যদিও তাঁর প্রতি ভ্রন্স্কির মনোযোগের এই তীব্রতাটাই, যত্নের যে পরিবেশে তিনি তাঁকে ঘিরে রাখছেন সেটাই মাঝে মাঝে পীড়া দিতো তাঁকে 1
অন্য দিকে, দীর্ঘ দিন ধরে যা কামনা করে এসেছেন তা পুরোপুরি সফল হলেও ভ্রন্স্কি সুখী হননি পুরোপুরি। অচিরেই তিনি অনুভব করলেন যে সুখের যে পর্বত তিনি আশা করেছিলেন তার একটিমাত্র কণিকা তাঁকে দিয়েছে তাঁর কামনার চরিতার্থতা। এই চরিতার্থতা তাঁর কাছে দেখিয়ে দিল তেমন একটা বরাবরের ভুল যা লোকে করে বসে কামনার সিদ্ধিটাকেই সুখ বলে ভেবে। আন্নার সাথে এক হবার পর যখন তিনি বেসামরিক পোশাক গায়ে চাপান, তখন প্রথম প্রথম সাধারণভাবে স্বাধীনতার যে মাধুর্য আগে তিনি জানতেন না, সেটা ও ভালবাসার স্বাধীনতা অনুভব করে তুষ্ট ছিলেন, তবে বেশি দিন নয়। শিগগিরই তিনি টের পেলেন যে তাঁর প্রাণের মধ্যে জেগে উঠছে বাসনার বাসনা, মন-পোড়ানি। নিজের ইচ্ছা নির্বিশেষেই তিনি প্রতিটি ক্ষণিক খেয়ালকে আঁকড়ে ধরতেন, ভাবতেন সেটাই তাঁর কামনা ও লক্ষ্য। দিনের ষোলটা ঘণ্টা কিছু না কিছু নিয়ে থাকতে হত, কেননা পিটার্সবুর্গে সমাজ-জীবনের যা পরিস্থিতি ছিল তাতে অনেকটা সময়ই কেটে যেত, সে মহলের বাইরে বিদেশে তাঁরা ছিলেন অবাধ স্বাধীনতায়। আগেকার বিদেশ ভ্রমণগুলোয় অবিবাহিত জীবনের যেসব তৃপ্তি নিয়ে ভ্রন্স্কি মেতে থাকতেন, তার কথা এখন ভাবাই চলে না, কেননা এই ধরনের একটা ঘটনা, পরিচিতদের সাথে বেশি রাত করে রাতের খাবার আন্নাকে অপ্রত্যাশিত ও অনুচিত রকমে বিমর্ষ করে তুলেছিল। তাঁদের সম্পর্কের অনির্দিষ্টতায় স্থানীয় ও রুশী সমাজের সাথে মেশাও চলে না। দর্শনীয় স্থান এমনিতেই যে সব দেখা হয়ে গেছে, সে কথা না বললেও ওটা একজন ইংরেজের কাছে যে দুর্বোধ্য তাৎপর্য ধরে, তাঁর কাছে, একজন রুশী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাছে সে তাৎপর্য ধরে না।
ক্ষুধার্ত পশু যেমন সামনে যা-কিছু পায় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খাদ্য পাবার আশায়, ভ্রন্স্কিও তেমনি একেবারে অজ্ঞাতসারে মেতে উঠছিলেন কখনো রাজনীতি, কখনো নতুন একটা বই, কখনো ছবি নিয়ে।
তারুণ্যে যেহেতু তাঁর ছবি আঁকায় হাত ছিল আর টাকাগুলো নিয়ে কি করবেন ভেবে না পেয়ে যেহেতু এনগ্রেভিং সংগ্রহে লেগেছিলেন, তাই এখন চিত্রকলাতেই এসে থামলেন, চর্চা করতে লাগলেন তার, এবং তাঁর যে অনিয়োজিত বাসনা পরিতৃপ্তি চাইছিল, সেটা নিয়োগ করলেন তাতে।
একটা শিল্পবোধ তাঁর ছিল, সঠিকভাবে এবং সুরুচির সাথে ছবি নকল করতে পারতেন, তাই তিনি ভাবলেন যে শিল্পী হবার জন্য যা দরকার সেটা তাঁর আছে, এবং ধর্মীয়, ঐতিহাসিক অথবা বাস্তববাদী—কোন ধরনের চিত্রকলা তিনি অবলম্বন করবেন এই নিয়ে কিছুটা দোলায়মানতার পর ছবি আঁকতে লাগলেন। সব ধরনের চিত্রকলাই তিনি বুঝতেন, তার যে কোনটাতেই অনুপ্রাণিত হতে পারতেন; কিন্তু এটা তিনি ভাবতে পারতেন না যে কোন কোন ধারার চিত্রকলা আছে তা আদৌ না জেনে, যা আঁকছেন সেটা সুপরিচিত কোন ধারার মধ্যে পড়বে কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে প্রাণের মাঝে যা আছে তাতেই অনুপ্রাণিত হওয়া যায় সরাসরি। যেহেতু এটা তিনি জানতেন না এবং সরাসরি জীবন থেকে নয়, শিল্পে ইতিমধ্যেই রূপ পেয়েছে যে জীবন তার মাধ্যমে অনুপ্রেরণা লাভ করতেন, তাই তিনি অনুপ্রাণিত হতেন অতি দ্রুত এবং অনায়াসে, আর তেমনি দ্রুত এবং অনায়াসে তিনি এই ফললাভ করলেন যে তিনি যেটা এঁকেছেন সেটা যে ধারার ছবি তিনি অনুকরণ করতে চাইছিলেন, হয়েছে প্রায় তার মতই।
