প্রথমটায় ভ্রন্স্কির অস্বস্তি হচ্ছিল এই জন্য যে ‘দুই মূলনীতি’র প্রথম অংশের কথা তিনি জানতেন না অথচ লেখক তার উল্লেখ করছিলেন এমনভাবে যেন ওটা সকলের পড়া। কিন্তু পরে, গোলেনিশ্যেভ যখন তাঁর বক্তব্যগুলো রাখছিলেন এবং ভ্রন্স্কি তা অনুসরণ করতে পারছিলেন, তখন ‘দুই মূলনীতি’ না জেনেও তিনি তাঁর কথা শুনছিলেন বিনা আগ্রহে নয়, কেননা গোলেনিশ্যেভ কথা বলছিলেন ভালো। কিন্তু যে ক্ষিপ্ত সুরে গোলেনিশ্যেভ তাঁর বিষয়বস্তুর আলোচনা করছিলেন সেটায় ভ্রন্স্কির বিস্ময় ও বিরক্তি বোধ হল। গোলেনিশ্যেভ যত বলে যাচ্ছিলেন ততই ধকধক করতে লাগল তাঁর চোখ, কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে আপত্তিকে দেখা যাচ্ছিল ততই তাড়া, মুখভাব হয়ে উঠছিল ততই শংকাবহ ও ক্ষুব্ধ। কোরে গোলেনিশ্যেভকে একটি রোগা প্রাণবন্ত সহৃদয় ও উদার ছেলে বলে ভ্রন্স্কির মনে আছে, সব সময়ই সে ছিল পয়লা নম্বরের ছাত্র, তাই এ উষ্মার কারণ ভ্রন্স্কি বুঝতে পারছিলেন না, বিরূপ বোধ করছিলেন তিনি।বিশেষ করে এটা তাঁর পছন্দ হচ্ছিল না যে বড় ঘরের ছেলে হয়েও গোলেনিশ্যেভ নিজেকে এক পঙ্ক্তিতে ফেলছেন কি-সব লিখিয়েদের সাথে, যারা তাঁকে চটাচ্ছে এবং তিনি ওদের ওপর রাগছেন। এর কি কোন মানে হয়? এটা ভ্রন্স্কির ভালো লাগছিল না, কিন্তু তা সত্ত্বেও উনি টের পাচ্ছিলেন যে গোলেনিশ্যেভ দুঃখী, তাই কষ্ট হচ্ছিল ওঁর জন্য। উনি যখন আন্নার প্রবেশ পর্যন্ত লক্ষ না করে অধৈর্য ও উত্তেজিত হয়ে নিজের ভাবনাগুলো বলে যাচ্ছিলেন তখন তাঁর চঞ্চল এবং যথেষ্ট সুন্দর মুখে সে দুঃখটা দেখা যাচ্ছিল যা পড়ে প্রায় উন্মত্ততার মত।
আন্না যখন টুপি আর ক্যাপ পরে সুন্দর হাতে দ্রুত ছাতা নাড়াচাড়া করতে করতে ভ্রন্স্কির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর ওপরে স্থিরনিবদ্ধ গোলেনিশ্যেভের কাতর দৃষ্টি থেকে চোখ সরিয়ে ভ্রন্স্কি বাঁচলেন, প্রাণচুর্য ও আনন্দে ভরপুর তাঁর অপরূপ বান্ধবীর দিকে চাইলেন নতুন একটা প্রেমাকুল দৃষ্টিতে। সহজে সচেতন হয়ে উঠতে পারছিলেন না গোলেনিশ্যেভ, প্রথম দিকে তিনি হয়ে রইলেন বিষণ্ণ, মনমরা। কিন্তু সবার প্রতি সুপ্রসন্ন আন্না (সে সময় তিনি যা ছিলেন) নিজের সহজ ও হাসি-খুশি ভাবভঙ্গিতে অচিরেই চাঙ্গা করে তুললেন তাঁকে। কথোপকথনের নানা প্রসঙ্গ তোলার চেষ্টা করে আন্না তাঁকে নিয়ে এলেন চিত্রকলার কথায়। এ বিষয়ে খুবই ভালো বলছিলেন তিনি, আন্নাও শুনছিলেন মন দিয়ে। পায়ে হেঁটে গিয়ে ভাড়া করা বাড়িটা তাঁরা দেখলেন।
ওঁরা যখন ফিরে এলেন, গোলেনিশ্যেভকে আন্না বললেন, ‘একটা জিনিসে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। ভালো একটা স্টুডিও হবে আলেক্সেইয়ের। অবশ্য-অবশ্যই তুমি এই ঘরখানা নেবে’, ভ্রন্স্কিকে তিনি বললেন রুশীতে আর ‘তুমি’ বললেন কেননা আন্না বুঝেছিলেন যে তাঁদের নিঃসঙ্গতায় গোলেনিশ্যেভ হয়ে দাঁড়াবেন ঘনিষ্ঠ লোক, তাঁর কাছ থেকে কিছু লুকোবার প্রয়োজন নেই।
‘তুই ছবি আঁকিস নাকি?’ দ্রুত ভ্রন্স্কির দিকে ফিরে বললেন গোলেনিশ্যেভ 1
লাল হয়ে উঠে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, অনেক আগে চর্চা করতাম, এখন অল্পস্বল্প শুরু করেছি।’
পুলকিত হাসিমুখে আন্না বললেন,’খুবই গুণ আছে ওর। আমি অবশ্য বিচারক নই। তবে সমঝদাররাও বলেছেন ঐ একই কথা।’
আট
নিজের মুক্তি ও দ্রুত স্বাস্থ্যোদ্ধারের এই সময়টায় আন্না নিজেকে অমার্জনীয় রকমের সুখী ও জীবনানন্দে ভরপুরে বলে অনুভব করছিলেন। স্বামীর দুঃখের কথা স্মরণ করে সুখ তাঁর মাটি হচ্ছিল না। সে স্মৃতিটা একদিক থেকে এতই ভয়ংকর যে তার কথা ভাবাই যায় না। অন্যদিকে স্বামীর দুঃখ তাঁকে এত বেশি সুখ দিয়েছে যে আসেই না অনুতাপের কোন কথা। তাঁর পীড়ার পর যা যা ঘটেছিল : স্বামীর সাথে মিটমাট, বিচ্ছেদ, ভ্রন্স্কির জখম হবার খবর, তাঁর আবির্ভাব, বিবাবিচ্ছেদের আয়োজন, স্বামীগৃহ ত্যাগ, পুত্রের কাছ থেকে বিদায়—এ সব স্মৃতি তাঁর কাছে মনে হত বিকারগ্রস্ত একটা স্বপ্ন যা থেকে তিনি জেগে উঠেছেন কেবল বিদেশে, ভ্রন্স্কির সাথে। স্বামীর যে অনিষ্ট তিনি করেছেন, তার স্মৃতিটায় বিতৃষ্ণার মত একটা অনুভূতি হত তাঁর, আরেকটা লোক আঁকড়ে ধরায় যে লোকটা ডুবতে বসেছে সে যখন লোকটার হাত ছাড়িয়ে ভেসে ওঠে, তখন তার যা অনুভূতি হত, এটা অনেকটা তাই। ও লোকটা ডুবল। বলাই বাহুল্য, কাজটা খারাপ কিন্তু নিজে বাঁচার ওহাই ছিল একমাত্র উপায়, ওই ভয়ংকর ঘটনাটার কথা বরং না ভাবাই ভালো।
শান্ত হবার মত একটা মাত্র যুক্তি তিনি পেয়েছিলেন, তখন বিচ্ছেদের প্রথম মুহূর্তে এবং এখন, যা ঘটেছে তা সব যখন মনে পড়ত তাঁর, তখন তিনি স্মরণ করতেন সেই একমাত্র যুক্তিটা। ভাবতেন, ‘ওই মানুষটাকে অসুখী করা ছিল আমার পক্ষে অপরিহার্য, কিন্তু আমি সে দুঃখটা থেকে নিজে লাভবান হতে চাই না; আমিও তো কষ্ট ভুগছি এবং বুগে যাব, যা ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান তা আমি হারিয়েছি—হারিয়েছি সুনাম আর ছেলেকে। আমি খারাপ কাজ করেছি, তাই সুখ আমি চাই না, বিচ্ছেদ চাই না আমি, কলংক আর ছেলের সাথে বিচ্ছেদের জন্য কষ্ট সয়ে যাব।’ কিন্তু কষ্ট সইবার যত আন্তরিক ইচ্ছাই আন্নার থাক, কষ্ট তাঁর হচ্ছিল না। লজ্জার ব্যাপারও কিছু হয়নি। তাঁদের দুজনের মধ্যেই যে কাণ্ডজ্ঞান ছিল প্রভূত পরিমাণে তাতে বিদেশে রুশী মহিলাদের তাঁরা এড়িয়ে যেতেন, বিছছিরি অবস্থায় তাঁরা পড়তে দেননি নিজেদের, এবং সর্বত্র এমন লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন যাঁরা ভান করতেন যে ওঁদের পারস্পরিক সম্পর্কটা তাঁরা পুরোপুরি বোঝেন, এমন কি তাঁরা নিজেরা যা বোঝেন তার চেয়েও ভাল। যে ছেলেটিকে তিনি ভালোবাসতেন তার সাথে বিচ্ছেদটাতেও প্রথম দিকে কষ্ট হত না তাঁর। মেয়েটা, ওঁর সন্তান এত মিষ্টি আর আন্নার এত ন্যাওটা যে কেবল এই মেয়েটাই যেদিন থেকে তাঁর আছে, ছেলের কথা আন্নার মনে পড়ত কদাচিৎ।
