‘বটে! আমি জানতামই না’ (যদিও জানতেন)–নির্বিকারভাবে জবাব দিলেন গোলেনিশ্যেভ, ‘কতদিন হল এসেছিল?’ যোগ দিলেন তিনি।
‘আমি? এই চার দিন’, আবার মন দিয়ে বন্ধুর মুখভাব নজর করে ভ্রন্স্কি বললেন।
‘না, ও সজ্জন লোক, ব্যাপারটাকে নিচ্ছে যেভাবে নেওয়া উচিত’, গোলেনিশ্যেভের মুখভাব এবং কথাবার্তার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেবার তাৎপর্য ধরতে পেরে ভ্রন্স্কি ভাবলেন মনে মনে, ‘আন্নার সাথে ওর পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, যা উচিত সেইভাবেই ও নিচ্ছে।’
আন্নার সাথে এই তিন মাস বিদেশে কাটাবার সময় যত নতুন নতুন লোকের সাথে ভ্রন্স্কির আলাপ হয়েছে, সব সময়ই তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, আন্নার সাথে তাঁর সম্পর্কটা কিভাবে নিচ্ছেন এই নতুন লোকটি এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যে যেমন উচিত তেমন একটা উপলব্ধি দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু যদি তাঁকে এবং উচিতমত বুঝতেন তাঁদের প্রশ্ন করা হত এই উপলব্ধিটা ঠিক কি, তাহলে তিনি এবং তাঁরা বড়ই মুশকিলে পড়তেন।
আসলে ভ্রন্স্কির ধারণা অনুসারে ‘যেমন উচিত’ সেভাবে যাঁরা বুঝছেন, তাঁরা মোটেই সেটা বুঝতেন না, চারিপাশের জীবনের সব দিক থেকে যত জটিল ও অসমাধিত প্রশ্ন ঘিরে ধরে, তাদের প্রসঙ্গে সুসভ্য লোকেরা যে মনোভাব নেন, সাধারণভাবে এঁরাও চলতেন সেভাবে—চলতেন ভদ্রভাবে, আভাস-ইঙ্গিত ও অশোভন প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন। তাঁরা ভাব করতেন যেন অবস্থাটার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তাঁরা পুরো বোঝেন, বলতে কি স্বীকার এবং অনুমোদনই করেন, তবে মনে করেন যে এ সব বোঝাতে যাওয়া অনুচিত ও অনাবশ্যক।
ভ্রন্স্কি তৎক্ষণাৎ অনুমান করে নিলেন যে গোলেনিশ্যেভ ওইরকম একজন লোক, সুতরাং তাঁকে পেয়ে তাঁর আনন্দ হল দ্বিগুণ। আর সত্যিই তাই। কারেনিনার কাছে যখন গোলেনিশ্যেভকে নিয়ে যাওয়া হল, তাঁর সাথে তিনি এমন ব্যবহার করতে লাগলেন যা ভ্রন্স্কির পক্ষে মাত্র আশা করাই সম্ভব। স্পষ্টতই, উনি অনায়াসে এমন সমস্ত আলাপই এড়িয়ে গেলেন যা অস্বস্তিকর হতে পারত।
আন্নাকে তিনি আগে দেখেননি, তাই তাঁর রূপে এবং আরো বেশি করে যেরকম সহজভাবে নিজের অবস্থাটা তিনি নিচ্ছেন, তাতে অভিভূত হলেন তিনি। ভ্রন্স্কি যখন গোলেনিশ্যেভকে নিয়ে আসেন, তখন রাঙা হয়ে ওঠেন আন্না, আর শিশুসুলভ এই যে লালিমাটা তাঁর খোলামেলা সুন্দর মুখখানায় ছড়িয়ে পড়েছিল, তা অসাধারণ ভালো লাগল গোলেনিশ্যেভের। বিশেষ করে তাঁর এটা ভালো লাগল যে বাইরের লোকের কাছে যাতে ভুল বোঝার অবকাশ না থাকে, সে জন্য ভ্রন্স্কিকে তিনি যেন ইচ্ছে করেই ডাকছিলেন ডাকনাম ধরে, আর বললেন যে ওঁর সাথে নতুন ভাড়া নেওয়া একটা বাড়িতে তাঁরা উঠে যাচ্ছেন, এখানে যাকে বলে পালাৎসো। নিজের অবস্থা সম্পর্কে এই সোজাসুজি, খোলাখুলি মনোভাব গোলেনিশ্যেভের ভালো লাগল। আন্নার দিল-খোলা হাসিখুশি প্রাণবন্ত হাবভাব দেখে এবং কারেনিন ও ভ্রন্স্কি দুজনকেই চিনতেন বলে গোলেনিশ্যেভের মনে হল তিনি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন আন্নাকে। তাঁর মনে হল আন্না যেটা কখনোই বুঝতে পারেননি সেটা তিনি বুঝতে পারছেন, যথা : স্বামীকে অসুখী করে, তাঁকে ও পুত্রকে ছেড়ে এসে, নিজের সুনাম হারিয়ে কি করে তিনি নিজেকে প্রাণবন্ত, হাসিখুশি, সুখী বলে অনুভব করতে পারেন।
‘গাইড-বইয়ে ওটার কথা আছে’, ভ্রন্স্কি যে পালাৎসোটা ভাড়া নিচ্ছেন, সে প্রসঙ্গে বললেন গোলেনিশ্যেভ, ‘একটা তিনতোরেত্তোও আছে সেখানে। তাঁর শেষ জীবনের কাজ।’
‘শুনুন বলি-কি, চমৎকার আবহাওয়া, ওখানে যাওয়া যাক। আরেকবার বাড়িটা দেখে আসি’, ভ্রন্স্কি বললেন আন্নাকে।
‘খুব ভালো, এখনই আমি টুপি পরে নিচ্ছি। বলছেন, গরম?’ দরজার কাছে থেমে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ভ্রন্স্কির দিকে চেয়ে আন্না বললেন। আবার জ্বলজ্বলে রঙ ছড়িয়ে পড়ল তাঁর মুখে।
তাঁর চাউনি থেকে ভ্রন্স্কি টের পেলেন যে আন্না বুঝতে পারছেন না গোলেনিশ্যেভের সাথে ভ্রন্স্কি কিরকম সম্পর্ক পাতাতে চান, এবং ভ্রন্স্কি যা চাইছিলেন সেভাবে চলেছেন কিনা ভেবে ভয় পাচ্ছেন আন্না।
আন্নার দিকে দীর্ঘ কমনীয় দৃষ্টিপাত করলেন তিনি।
বললেন, ‘না, তেমন গরম নয়।’
এবং আন্নার মনে হল তিনি সব বুঝতে পেরেছেন, প্রধান ব্যাপারটা হল এই যে আন্নার ব্যবহারে তিনি খুশি। তাঁর দিকে হেসে দ্রুত চলনে আন্না বেরিয়ে গেলেন।
দুই বন্ধু মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন, দুজনের মুখেই একটা বিব্রত ভাব। স্পষ্টতই, আন্নাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গোলেনিশ্যেভ তাঁর সম্পর্কে কি-একটা যেন বলতে চাইছিলেন কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলেন না সেটা কি, আর ভ্রন্স্কি সেটা জানতেও চাইছিলেন, ভয় ও পাচ্ছিলেন।
কিছু-একটা আলাপ চালাবার জন্য ভ্রন্স্কি শুরু করলেন, ‘তাহলে এই ব্যাপার। তাহলে তুই এখানেই বাসা বেঁধেছিস? ওই একই কাজ নিয়ে আছিস? ভ্রন্স্কি শুনেছিলেন যে গোলেনিশ্যেভ কি-একটা যেন লিখছিলেন, সেটা স্মরণ হওয়ায় কথা চালিয়ে গেলেন তিনি।
‘হ্যাঁ, ‘দুই মূলনীতি’র দ্বিতীয় অংশ লিখছি আমি’, এ জিজ্ঞাসায় পরিতোষ লাভ করায় উত্তেজিত হয়ে গোলেনিশ্যেভ বলে উঠলেন, ‘মানে, সঠিক বলল, এখনো লিখতে শুরু করিনি, তবে মালমসলা জোগাড় করছি। প্রথম অংশটার চেয়ে একটা হবে অনেক বিস্তারিত, প্রায় সমস্ত প্রশ্নই আলোচিত হবে তাতে। আমাদের রাশিয়ায় লোকে বুঝতে চায় না যে আমরা বাইজান্টিয়ামের উত্তরাধিকারী’, এই বলে একটা লম্বা চওড়া উত্তেজিত ব্যাখ্যা তিনি শুরু করলেন।
